সায়ন্তনী অধিকারী

ভারতে শিক্ষার গৈরিকীকরণ নিয়ে বর্তমানে বিভিন্ন বিতর্ক চলছে। এক দিকে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রোমিলা থাপার, ইরফান হাবিব, ডি এন ঝা প্রভৃতিকে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে বামপন্থী তথা দেশবিরোধী হিসাবে, অপর দিকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সুযোগ ক্রমশই কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার এই সংকট শুধুমাত্র উচ্চশিক্ষার স্তরে তা নয়, একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে যে স্কুলস্তরের পাঠ্যপুস্তকগুলিও বারে বারেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসছে। পাঠ্যপুস্তকগুলি রচিত হয় মূলত শিশু ও কিশোর ছাত্রছাত্রীদের জন্য এবং তাদের মানসিক গঠনে এই পাঠ্যপুস্তকের অবদান খুবই গুরুত্বপুর্ণ হয়ে ওঠে। তাই স্কুলস্তরের পাঠ্যপুস্তক রচনার সময় সংবেদনশীল এবং সতর্ক থাকা খুবই প্রয়োজন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে বর্তমান কালে, বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তকে এমন কিছু বক্তব্য প্রকাশ  পাচ্ছে, যা চূড়ান্ত পশ্চাদ্গামী এবং শিশু ও কিশোর মনে কুপ্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম। কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

কিছু দিন আগে মহারাষ্ট্রের রাজ্য শিক্ষা পর্ষদের দ্বাদশ শ্রেণির জন্য লিখিত সমাজবিজ্ঞান বইতে লেখা হয়েছে যে যখন কোনো মেয়েকে কুৎসিত দেখতে হয়, তখন তাঁর পিতামাতাকে তাঁর বিবাহের জন্য পণ দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে শারীরিক সৌন্দর্য্যের একটি বিশেষ মাপকাঠিকে সামাজিক ভাবে গ্রহণ করা হচ্ছে এবং একই সঙ্গে পণপ্রথার মতো একটি কুপ্রথাকে মান্যতা দেওয়া হচ্ছে। একই ভাবে সিবিএসই-র দ্বাদশ শ্রেণির শারীরশিক্ষার পাঠ্যপুস্তকে লেখা হয়েছে যে কোনো মেয়ের জন্য আদর্শ শারীরিক মাপ হল ৩৬-২৪-৩৬। এই পাঠ্যপুস্তকগুলি মেয়েদের শারীরিক সৌন্দর্য্যের একটি ধারণাকে অল্পবয়স্ক ছাত্রছাত্রীদের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে, যা মেয়েদের উপর এক ধরনের সামাজিক চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম  হচ্ছে এবং এর ফলস্বরূপ অনেক সময়েই অল্পবয়স্ক মেয়েদের মধ্যে নানা শারীরিক বা মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। এ ছাড়াও কোনো পাঠ্যপুস্তকে সুন্দরী মেয়ের উদাহরণ হিসাবে কোনো গৌরবর্ণা স্বর্ণকেশীর ছবি এবং কুৎসিত বলতে কৃষ্ণবর্ণের ভারতীয় চেহারার নারীর ছবি দেওয়া হলে, তা আরও এক বার সমাজের বর্ণবিদ্বেষী চেহারাটিই শুধু ফুটিয়ে তোলে তা নয়, শিশু ও কিশোর মানসে সেই বর্ণবিদ্বেষকেই মুদ্রিত করে দেয়, পরবর্তীকালে যার ভয়াবহ ফল দেখা যায়।

সিবিএসই-রই ষষ্ঠ শ্রেণির একটি পাঠ্যবইয়ে বলা হয়েছে, যে সব মানুষ মাংসাশী তাঁদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বেশি থাকে, তাঁরা সহজেই মিথ্যা বলা, ঠকানো এবং অন্যান্য অপরাধে লিপ্ত হতে পারেন। অর্থাৎ শিশুকাল থেকেই এই ভাবে আমিষাশী ও নিরামিষাশীর মধ্যে একটি নীতিগত পার্থক্য তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে এবং আমিষাশীদের নৈতিক ভাবে অধঃপতিত বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

এখানে মনে রাখা প্রয়োজন ব্রিটিশ শাসনকালেও কিছু কিছু জাতিগোষ্ঠীকে অপরাধপ্রবণ বলে চিহ্নিত করা হত। এ ক্ষেত্রে কিছু ধর্মীয় শ্রেণি বা জাতিগোষ্ঠীকে মূলত তাঁদের খাদ্যাভ্যাসের উপর ভিত্তি করে অপরাধপ্রবণ বলে চিহ্নিত করা ও সামাজিক ভাবে একঘরে করে রাখার যে চেষ্টা চলছে, তারই ফল হিসাবে স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে এই জাতীয় লেখা ছাপানো হচ্ছে।

এ ছাড়াও বিভিন্ন বর্ণবিদ্বেষী ‘ঘটনা’কে বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তকের অংশ করা হচ্ছে। যেমন, দীননাথ বাত্রার রচিত প্রেরণাদীপ-৩ বইটিতে ড. রাধাকৃষ্ণন সম্পর্কে একটি গল্প রয়েছে, যেখানে কৃষ্ণবর্ণ আফ্রিকান-আমেরিকানদের পোড়া রুটির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। বলা বাহুল্য, দীননাথ বাত্রার বেশির ভাগ লেখার মতো এই ঘটনাটিও সত্য নয়, কিন্তু এই ধরনের তুলনার মাধ্যমে অল্পবয়স্ক মনে যে ধরনের বর্ণবিদ্বেষের জন্ম হচ্ছে, তার সঙ্গে ভারতে সাম্প্রতিক অতীতে ঘটে যাওয়া বর্ণবিদ্বেষী আক্রমণগুলির সম্পর্ক একটু ভাবলেই খুঁজে পাওয়া যায়। শিশুবয়স থেকেই এই বর্ণবিদ্বেষের বীজ বোপন করা হচ্ছে খুব সন্তর্পণে, যা পরে গিয়ে বিষবৃক্ষের রূপ নিচ্ছে।

পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটানোরও উদাহরণ কম নেই। রাজস্থানে বিজেপি সরকার যে ইতিহাস বই রচনার চেষ্টা করছে তাতে হলদিঘাটের যুদ্ধে রানা প্রতাপকে বিজয়ী বলে দাবি করা হয়েছে! মুঘল ইতিহাস মুছে ফেলার একটি প্রচেষ্টা চলছে, যার ফল এই ধরনের বিকৃত কিংবদন্তি যাকে ইতিহাসের নাম দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর কৃতিত্বকে নির্মূল করার জন্য, অষ্টম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তক থেকে তাঁকে সম্পূর্ণ ভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে ওই রাজ্যে। সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী সেকুলার ভারতের স্বপ্ন দেখা নেহরু স্বাভাবিক ভাবেই হিন্দুত্ববাদীদের একজন প্রধান শত্রু। তাই ইতিহাসের পাতা থেকে তাঁকে বাদ দেওয়া বিজেপি সরকারের পক্ষে খুবই স্বাভাবিক একটি পথ। পাশাপাশি হিটলার তথা নাজি পার্টির কৃতিত্বকে ফলাও করে পড়ানো হচ্ছে গুজরাতে। এই ভাবেই পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে শিশু ও কিশোর মনে কিছু ভ্রান্তিকর ও পশ্চাদ্গামী ধ্যানধারণা স্থাপন করা হচ্ছে। উচ্চশিক্ষার গৈরিকীকরণের পাশাপাশি পাঠ্যপুস্তকের এই আশঙ্কাজনক ধারাগুলিও ভবিষ্যতে সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে ছাপ ফেলবে এবং তাই এখন থেকেই এই ধারাগুলির বিরোধিতা করা অত্যন্ত প্রয়োজন।

(লেখক ইতিহাসের অধ্যাপক)  

তথ্যসূত্রঃ https://www.youthkiawaaz.com/2015/08/10-excerpts-from-indian-textbooks/

https://www.thehindu.com/news/national/gujarat-textbooks-never-far-from-controversy/article6261520.ece

https://yourstory.com/2017/04/women-cbse-textbook/

https://www.huffingtonpost.in/2017/02/09/maharana-pratap-won-the-battle-of-haldighati-how-bjps-bid-to-r/

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here