পাপিয়া মিত্র:

বাঙালির ক্যালেন্ডারের পাতা শেষ বার্তা দেয় উষা এসে পূর্ব দুয়ার খোলার। এ দুয়ার নতুন বছরের, ১৪২৪-এর। কয়েক দিনের প্রখর তাপে মানবমন যখন ফুটিফাটা তখন শেষ চৈতালি দিন উপহার দিয়ে গেল এক শুভ্রদিনের। শুচিতা তোমার দেহমনে, শুচিতা তোমার পরশনে, হে বৈশাখ এসো।

এসো বৈশাখ করুণাধারায় এসো, স্নিগ্ধমাধুরী নিয়ে এসো, শান্ত চরণে এসো। এসো আমাদের মতো আশাবাদী মানুষের মনে আশার বাণী দিতে। নিয়ম ভাঙার প্রবল ঢেউয়ের স্বচ্ছ ফেনায় রেখো কিছু শুভকর্মের সূচি। তাই আজ সকালে এক সুরে গাই ‘শুভ কর্মপথে ধর নির্ভয় গান’। মনে পড়ে বাড়িতে বা পাড়ায় এক আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপন হত নববর্ষ। প্রভাতফেরি দিয়ে শুরু হত দিন। সাতসকালে এ-পাড়া ও-পাড়া ঘুরে ঘুরে ছড়িয়ে যেত ‘দারুণ অগ্নিবাণে রে’, ‘বৈশাখের এই ভোরের হাওয়া’, ‘হৃদয় আমার, ওই বুঝি তোর বৈশাখী ঝড় আসে’ কত কত গান। আর যেখানেই যাও ‘এসো হে বৈশাখ’ তো আছেই। লালপাড় শাড়ি, কপালে চন্দনের ফোঁটা, আগের রাতের আলতা-পরা পা, হাতে-গলায় মালা নিয়ে নাচতে নাচতে যাওয়া। আর কাকিমা-দিদিরা মাথাখোলা গাড়িতে গান গাইতেন। বাজত মন্দিরা, খোল আর হারমোনিয়াম। সে কী উল্লাস, উদ্দীপনা! বাড়ি ফিরে শোনা যেত সুচিত্রা-হেমন্ত-কণিকা-সাগর সেন- চিন্ময়-দ্বিজেনের গলায় রবিঠাকুরের গান। এবং তা কেবলই রেডিও থেকে।

পাড়ার দোকানে বা বাড়িতে মাটির ঘটে নতুন কচি আমপাতা সমেত স্বস্তিকা আঁকা হত। দরজার মাথায় আটকানো হত আমপাতার মালা। সাদামাটা নতুন বস্ত্র উঠত প্রায় সকলের গায়ে। কুলদেবতাকে প্রণাম করে গুরুজনদের প্রণাম করা একটা অঘোষিত রীতি ছিল। এর আয়োজনের গন্ধে বোঝা যেত নতুন বছর আসছে। এখন তো বোঝা যায় প্রায় দিন পনেরো আগে থেকে মিডিয়ার দৌলতে। সেখানে ঝলমলে পোশাকে নানা গানে-আড্ডায়, নানা শিল্পীর সমাগমে প্রভাতী বা বৈকালিক বৈঠক এক অন্যমাত্রা পায় ঠিকই কিন্তু শেষ হলেই সব শেষ। ফেলে আসা নববর্ষ সেই রেশ টেনে রাখত দুপুরের কবজি ডুবিয়ে খাওয়ায়, বইপাড়ার বর্ণে, সন্ধের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের রঙে। আজ সে এল, সে নিয়ে এল সারা দিনের ব্যস্ততাকে সঙ্গে নিয়ে। বাংলার বর্ষবরণ উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠান সাজানো হয়েছে নানা প্রান্তে। চলছে বইবরণ-বর্ষবরণ উৎসবও কলেজ স্কোয়ারে।

গত কয়েক দিন গৃহস্থ ভীষণ ব্যস্ত হয়ে বিরাটি থেকে বজবজ, শ্যামবাজার থেকে শেওড়াফুলি, গড়িয়াহাট থেকে হাতিবাগান চলাচল করেছে নতুন কিছুর জন্য। গৃহী ঘরে সেই নতুনের আলপনা দিয়েছে সকাল সকাল। তাই তো সোনামুগ ডাল থেকে শুরু করে নারকেল, মিষ্টির প্যাকেট, আলতা, সিঁদুর, শাঁখাপলা, লক্ষ্মীগণেশ, লাল শালুতে মোড়া খেরোর খাতা সহ ধামা চলেছে মন্দিরপানে। গত বছরের গ্লানি মুছিয়ে, জরা ঘুচিয়ে মঙ্গলময়ীর কৃপালাভের আশায় বৈশাখের বন্দনা। বাংলার এই শুভ দিনে এমন করেই আহ্বান জানানো হয় – এসো, এসো, এসো হে বৈশাখকে।

আমাদের সময়ে বৈশাখ আসত বেঞ্চে, কাঠের চেয়ারে, আলতা পায়ে, নতুন ফ্রকের ঘেরে, ধুতির মোড়কে, সরবতের গ্লাসে চুমুক দিয়ে, একে অপরের কুশল জেনে, গোটা পাড়া নিয়ে। একলা বৈশাখ না হয়ে গলির বাঁক থেকে কান পর্যন্ত হাসি ছড়িয়ে আত্মীয়স্বজন নিয়ে হাজির হত। বইপাড়ায় তখন কেউ কেউ পদ্মনিমকিতে কামড় বসিয়েছেন, কেউ বা ডাবের জলে চুমুক। প্রকাশক, লেখকদের হার্দিক মিলনে বৈশাখ ঢেলে দিচ্ছে তপ্ত হাওয়া। এখন সেই দাপাদাপি অনেকখানি ম্লান হয়েছে। তার প্রধান কারণ বইমেলা। একটা সময় এই নববর্ষ আর অক্ষয় তৃতীয়াতে বই প্রকাশ পেত। সেই ধারাটি বজায় রেখেছেন বিখ্যাত কয়েকটি প্রকাশক। পরবর্তী কালে সেই স্মৃতি দু’মলাটে প্রকাশ করা হয়েছে। এখানেই শেষ নয়। নারকেল ফাটিয়ে শুরু হত ফুটবল পুজো ক্লাবে ক্লাবে। তার পরেই ম্যাচ শুরু। সব খেলার সেরা বাঙালির ফুটবল তখন গোলপোস্ট ছেড়ে মুক্ত আকাশে। আর ওইখানে অপেক্ষা করছে সেই মলিন জামাপ্যান্টের কিশোরটি, যে এক দৌড়ে বলটা এনে দেবে। এখন উপলক্ষই ভরসা। তাই চার দিকে বস্ত্রদান, রক্তদান, চশমাদান সারা দিন চলতেই থাকে। আর সন্ধের আকাশে নবীন মেঘের সুর বাজতে থাকে।

গত কাল রাত পর্যন্ত মহড়া চলেছিল ‘চৈত্রের চিতাভস্ম উড়ায়ে কালবৈশাখী আসে/হোক সে ভীষণ, তবু তারে হেরি অদ্ভুত উল্লাসে…’। পাশ থেকে ফুট কেটেছিল আরও এক জন ‘শিখর হইতে শিখরে ছুটিব,/ ভূধর হইতে ভূধরে লুটিব,/ হেসে খলখল গেয়ে কলকল তালে তালে দিব তালি…।’ আজ তারাই জড়ো হবে সদনকক্ষে, কিংবা মাঠে অথবা বাড়ির ছাদে। সন্ধের আকাশকে সাক্ষী রেখে শুরু হবে বর্ষবরণের আরও এক অনুষ্ঠান। এই আসরে রবিঠাকুর নায়ক। তাই সদ্য ফেলে আসা আস্ত এক বছরের যা কিছু দীনতা ‘ভুলে যাওয়া গীতি’ হয়ে তার ‘অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক’ এই নিগূঢ় আবেদন মনে রইল।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here