১১৬তম জন্মবার্ষিকীতে স্মরণ করি ‘টিনের কৌটোয় প্যাক করা রসগোল্লা’কে

0
723
পাপিয়া মিত্র

পূর্ণিমার আলোয় যখন আকাশ উথলে পড়ছে, ফুলের গন্ধে বাতাস মাতাল হয়ে উঠছে। তখন কি কাজের কথা বলার উপযুক্ত সময়? শান্তিনিকেতনের সেই আনন্দময় দৃশ্য যাঁরা না দেখেছেন তাঁরা দেখেননি শান্তিনিকেতনকে।

শান্তিনিকেতন আশ্রম তখনও স্কুলের স্বীকৃতি পায়নি। তাই প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করলেন। এবং সেই স্নেহাসক্ত ছাত্রটিকে আশ্রমেই থেকে যেতে বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এ-ও বলেছিলেন, কলেজে এমন কী শেখাবে, যা আমরা এখানে শেখাতে পারিনে। কবির সেই স্নেহধন্য পুত্রসম ছাত্রটি প্রমথনাথ বিশী।

১৯০১-র ১১ জুন, বাংলা ১৩০৮, ২৮ জ্যৈষ্ঠ প্রমথনাথ বিশীর জন্ম। অখণ্ড বাংলার রাজশাহী জেলার নাটোর মহকুমার চলনবিল অঞ্চলের জোয়াড়ি গ্রাম। প্রায় আড়াইশো বছর আগে বড়াল নদীতীরে এই জোয়াড়ি গ্রামে কান্যকুব্জের ব্রাহ্মণ পিপরিয়া ওঝার বংশধরেরা বাস করতে এসেছিলেন। দিল্লির সম্রাট তাঁদের বিশখানা গ্রামের জায়গির দেন। সম্ভবত এর থেকে ‘বিশী’ উপাধির উদ্ভব। কৌলিক পদবি লাহিড়ী। প্রমথনাথের পিতামহ কেশবনাথ বিশী বংশের ৩৭তম পুরুষ ছিলেন।

আষাঢ়ের সন্ধ্যা, পিতা নলিনীনাথ সাত বছরের প্রফুল্ল ও ন’বছরের প্রমথনাথকে নিয়ে শান্তিনিকেতন পৌঁছোলেন। উপাধিটা অদ্ভুত বলে প্রমথনাথকে বিশী বলে ডাকতেন সকলে। আর তার সঙ্গে মিলিয়ে ভাইকে ডাকতেন শিশি নামে। এখান থেকেই রসবোধের শুরু। এ বারের লেখায় প্রমথনাথের রসবোধ নিয়ে খানিক কথকতা।

ছাত্রজীবন শুরু হল। মাষ্টারমশাইরা একবাক্যে জেনেছিলেন বিশী অত্যন্ত মনযোগী ছাত্র কেবল অঙ্কের ক্লাশ ছাড়া। তাঁর শৈশবের শিক্ষক সুধাকান্ত চৌধুরী জানিয়েছেন, এক দিন অঙ্কের ক্লাশের শিক্ষক জগদানন্দ রায় বিশীকে অমনযোগী দেখে কাঁধে একটা থাপ্পড় দিয়ে শায়েস্তা করছিলেন, সেই সময় যাচ্ছিলেন বড়োবাবু দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ব্যাপারটি নজরে পড়তে তৎক্ষণাৎ ভৃত্য ডেকে চিরকুট পাঠালেন জগদানন্দের কাছে, ‘শুন হে জগদানন্দ দাদা/গাধারে পিটিলে হয় না অশ্ব/অশ্বে পিটিলে হয় যে গাধা’। বিব্রত জগদানন্দ বিশীকে ছড়াটা শুনিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, সে কোন শ্রেণিভুক্ত? বিশী সগর্বে জবাব দিয়েছিলেন ‘আমি অশ্ব’। অঙ্কের ভয় তাঁকে কী রকম দুঃসাহসী করে তুলেছিল শিক্ষক সুধাকান্ত তার বিবরণ দিয়েছিলেন – বছর বারো বয়স। অঙ্কের পরীক্ষার খাতায় বিশী ক’ছত্র কবিতা লিখে ফেললেন, ‘হে হরি, হে দয়াময়/,কিছু মার্ক দিও আমায়/তোমার শরণাগত/নহি সতত/শুধু এই পরীক্ষার সময়’। বিষয়টি জানাজানি হতে রবীন্দ্রনাথ পরোক্ষে প্রমথনাথের পক্ষেই সওয়াল করেন। বলেন, অঙ্কের প্রশ্নের উত্তরে কবিতা লিখে ঠিক কাজ করেনি বিশী, তবে অঙ্ক করতে না পারার জন্য ঈশ্বরের কাছে দয়া ভিক্ষা করেছে।

প্রমথনাথ বিশী।

চটজলদি জবাবে বিশীর জুড়ি ছিল না। এক বার দমদমবাসী এক ভদ্রলোক প্রমথনাথকে বলেছিলেন, এত দিন শান্তিনিকেতনে থেকে গান গাইতে পারলেন না? উত্তরে বিশী বললেন, আপনি আরও বেশি দিন দমদমে থেকে উড়তে পারলেন না তো দেখছি। উত্তর শুনে কবি খুব খুশি। বললেন, আচ্ছা জব্দ করেছিস তো! কিন্তু গুরু যখন শিষ্যের কাছে জব্দ হন! সে দিন কী হল জানা যাক। এক দিন বিশীর সামনে কবি কাউকে ‘নিমাই নিমাই’ বলে ডাকছেন। যে এল বিশী জানেন তার নাম নিমাই নয়। তবু কবি তার বিশদ ব্যাখ্যা দিয়ে বললেন দেখছিস না ওর হাতে নিমের ডাল! উত্তর শুনে নিরীহ বিশীর জিজ্ঞাসা কারওর হাতে জামের ডাল থাকলে যে সে জামাই হবে তা আর বলার অপেক্ষা রইল না। এমনই রসের ওস্তাদি ছিল বিশীর মধ্যে।

শিক্ষক সুধাকান্ত যে বাঘের মাংস খেতে চেয়েছিলেন সেটা ছিল সার্কাস থেকে পালিয়ে আসা এক রুগ্ন বাঘ। সেটি শিকার করে তবেই না তার মাংস আনা! শিকারের সময় বিশী ও তার সঙ্গী ভজু নিরাপদ আশ্রয়ে মাচার ওপরে ছিলেন। মনোবল তাঁর যত সবল হোক না কেন বাহুবলে তিনি ততোধিক দুর্বল ছিলেন। বিজয়ীদের উল্লাসধ্বনি শুনে বিশী গিয়ে দেখেন ভজু বাঘের গাড়িতে চড়ে বসেছে। তিনিও পিছিয়ে যাওয়ার পাত্র নন। বিদ্রূপের হাসি হেসে বললেন, ‘এ তো দেখছি বাঘসি’। সকলে অবাক। বিশী ব্যাখ্যা দিলেন, আম শুকিয়ে আমসি হয়, বাঘ শুকিয়ে বাঘসি। এতে বীরত্বের কী আছে?

ছাত্রজীবনে নাটকে নানা চরিত্রে অভিনয় করতেন বিশী। ‘বিসর্জন’ নাটকে তিনি একাধিকবার রঘুপতি, জয়সিংহ ও নক্ষত্র রায় হয়েছিলেন। শান্তিনিকেতনে থাকলে রবীন্দ্রনাথ এই সব অভিনয় দেখতে হাজির হতেন। এক বার ছোটোখাটো চেহারার বিশী জয়সিংহ ও দিনু ঠাকুর রঘুপতি সেজেছিলেন। অভিনয় শেষে দেখা করতে গেলে রবীন্দ্রনাথ সহাস্যে বিশীকে বলেছিলেন, ‘তুই যখন বুকে ছোরা মেরে পড়লি আর তারপরে দিনু যখন তোর ঘাড়ে পড়ল, আমি ভাবলাম তোর মরতে কিছু বাকি থাকলে ওতেই তা সম্পূর্ণ হয়ে যাবে’। এমন রসিকতায় ছেলের দল হেসে কুটোপাটি। গুরু-শিষ্যের রসবোধ ছিল বিধিদত্ত। রসগ্রহণ ও বিতরণে দু’জনেরই ছিল অনায়াস অধিকার।

খদ্দরের ধুতি-পাঞ্জাবি, পায়ে পাম্পশু, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। পকেটে কলম কিংবা হাতঘড়ি কোনওটাই থাকত না। প্রয়োজনে কলম চেয়ে নিতেন। সামনে কেউ থাকলে তার কাছ থেকে সময়টা জেনে নিতেন। বই কেনা ছাড়া আর কোনও শৌখিনতা ছিল না। তবে বেড়াতে ভালোবাসতেন। তাঁর বেড়ানোর শখের কথা জানিয়েছেন বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়। প্রমথনাথ ছিলেন নিতান্তই আরামকেদারায় বসা ভ্রমণকারী! মাঝে মাঝে উৎসাহভরে এক একটা লম্বা সফরের কথা তুলে ঘুরে আসার আয়োজনে আরও হাত-পা গুটিয়ে আরামকেদারাটিতে গুছিয়ে বসতেন। কিন্তু সে ছিল তাঁর স্বপ্ন অভিযান।

মহর্ষির আদেশে বালক রবীন্দ্রনাথ ডালহৌসি পাহাড়ে যে বরফগলা জলে প্রাতঃস্নান করতেন তা তিনি আজীবন বজায় রেখেছিলেন। অনুগত ছাত্র তা চেষ্টা করেও পারেননি। বিশী-কন্যা চিরশ্রী জানিয়েছেন, বাবা একটু শীতকাতুরে ছিলেন। কলকাতায় শীতের ভয়াবহতা না থাকলেও একটু শীতের হাওয়া বইলেই তিনি গরম জামা পরতে শুরু করতেন। আর শীত বাড়লে পরনের জামার সংখ্যাও বাড়ত। ছাত্রদের হাত তুলে পড়ানোর সময় আস্তিনের মধ্যে দিয়ে স্তরে স্তরে নানা বর্ণের গরম জামা দেখা যেত।

কমলাকান্ত শর্মা ছদ্মনামে তিনি রম্যরচনা লিখতেন। তিনি বুঝতেন সংসারে হাসির বড়ো প্রয়োজন। জীবনের আহার্যে হাসির লবণটুকু না পড়লে সবই যে স্বাদহীন হয়ে যায়। নিজের চেহারার জন্য তাই এক গাম্ভীর্যকে বহন করে নিয়ে যেতেন। সাধারণ পোশাকে পিছনে হাতদু’টি  জড়ো করে গম্ভীর মুখে যখন পায়চারি করতেন তা দেখে  যে কোনও মানুষের সমীহ ও সম্ভ্রম দুই জাগবে। সেই জন্য বন্ধু সজনীকান্ত দাশ তাঁকে টিনের কৌটোয় প্যাক করা রসগোল্লার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here