ক্যান আই টক টু রিনা ব্রাউন? আজও কানে বাজে ‘গোঁড়া ব্রাহ্মণের’ সেই কণ্ঠস্বর

0
838
পাপিয়া মিত্র

২০১৭, তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রের বয়স ৮১ ও নাটকের বয়স ৭৯ বছর। তাঁর বয়স ১১৭ (মতান্তরে ১১৫ বছর)। ২৫৯টি ছবিতে ও ৩৯টি নাটকে অভিনয় তাঁর। তিনি আপাতগম্ভীর, খ্যাতির আলোকে প্রতিষ্ঠিত, প্রণম্য ব্যক্তিত্ব, রাজা শশাঙ্কদেবের উত্তরপুরুষ, তিনি শচীন্দ্রনাথ দে বিশ্বাস বা ছবি বিশ্বাস। ধ্রুপদী গাম্ভীর্যের ব্লু-ব্লাডেড এই অভিনেতার আজ, ১২ জুলাই (মতান্তরে ১৩ জুলাই) জন্মদিন।

…ক্যান আই টক টু রিনা ব্রাউন? ছবির আবহ ঘুরে যায়। আভিজাত্যের অহং ঝরে পড়ছে গোঁড়া ব্রাহ্মণের কণ্ঠে, কৃষ্ণেন্দুর বাবার। ‘সপ্তপদী’ ছায়াচিত্র শেষ হয়ে যায়। মন জুড়ে ঘুরতে থাকে সেই কণ্ঠস্বর। রাশভারী, তেজস্বী, অসম্ভব ব্যক্তিত্বপূর্ণ এক জন মানুষ, যিনি শুধুমাত্র অভিনয়ের জোরেই এক চরিত্র থেকে অন্য চরিত্রে চলে গিয়েছেন অবলীলায়। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে শোনা গিয়েছে, রোল দিতে না পারলেও শুধু মুণ্ডুটা দেখানোর সুজোগ দিলে সবাই কাত হয়ে যাবে। ইনি সেই ‘জলসাঘর’-এর বিশ্বম্ভর বা ‘কাবুলিওয়ালা’র রহমত, অভিনেতা ছবি বিশ্বাস।

‘জলসাঘর’-এ বিশ্বম্ভর রায়।

১৯৩৬-এর ১৩ জুন, উত্তরা সিনেমাহলে ‘অন্নপূর্ণার মন্দির’ মুক্তি পেয়েছে। বেশ হইচই। চলচ্চিত্রে ‘বিশু’ চরিত্রে নতুন নায়কের নাম নিয়ে তুমুল কৌতূহল। ছবি তো মেয়েদের নাম, সুদর্শন তরুণের নাম কেন ছবি হল। যাই হোক বেশ আত্মগরিমায় ছবি বিশ্বাস ভাবলেন, এ বার ছবির বান ডেকে যাবে। প্রযোজক-পরিচালকরা দরজায় এসে লাইন দেবে। কিন্তু কোথায় কী? খানিক হতাশ হয়েই তিনি প্রযোজক-পরিচালকদের কাছে হাজির হতে লাগলেন। এই ভাবে ঘুরতে ঘুরতে এক দিন আবিষ্কার করলেন, এক ভদ্রলোক নাকি অভিনয় নিয়ে তাঁর নামে দুর্নাম করে চলেছেন। সন্ধান চলল তাঁকে খুঁজে বের করার। এক দিন কালী ফিল্মস স্টুডিও থেকে বেরিয়ে আসছেন, এক জন দেখিয়ে দিলেন সেই দুর্নাম রটানোর মানুষটিকে। প্রায় ছ’ফুট লম্বা, রোগা, আজানুলম্বিত বাহু, কথা বলার সময় বকের মত গলা এগিয়ে-পিছিয়ে যায়। এই লিকলিকে কমেডিয়ানটির এত ক্ষমতা? প্রায় মিনিট তিরিশ কথা বলার পরে ‘অন্নপূর্ণার মন্দির’-এ ছবিবাবুর অভিনয়ের ত্রুটি বুঝিয়ে দিলেন তিনি। সেই সামান্য কমেডিয়ানের অসামান্য পাণ্ডিত্য দেখে তাঁর হাত দু’টি জড়িয়ে ধরে বলে উঠেছিলেন ছবি বিশ্বাস, “আপনাকে আগে চিনতে পারিনি প্রভু, আজ থেকে আপনি আমার ফ্রেন্ড-ফিলজফার অ্যান্ড গাইড”। সে দিন অকৃত্রিম আন্তরিকতা দেখানোর মানুষটি ছিলেন বিখ্যাত কমেডিয়ান নৃপতি চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু এই শিক্ষার কি প্রয়োজন ছিল? নৃপতি চাটুজ্যে হেসে বলেছিলেন, “ওর শিক্ষা, ওর আভিজাত্য, ওই সুদর্শন চেহারা — গোটা দুই-তিন ছবিতে চান্স পাবে ঠিকই, তার পরে অসৎসঙ্গে পড়ে ওর সর্বনাশ হয়ে যাবে। ফিল্মলাইনে এর উদাহরণ কিছু কম তো নেই”! সে দিন সেই ট্রিটমেন্ট করেছিলেন বলে সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ এই ছবি বিশ্বাসকে পেয়েছে। এই আন্তরিকতা, এই ভালোবাসা আজ কোথায়?

‘দেবী’-তে কালীকিঙ্কর চৌধুরী।

১৯৩৬-১৯৪১, টানা নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করার পরে হঠাৎ ‘নর্তকী’ ছবির রোম্যান্টিক চরিত্র ছেড়ে ছবিবাবু স্বামীজির ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। ছবি মুক্তি পাওয়ার পরে তিনি ঘোষণা করলেন তিনি এ বার থেকে চরিত্রাভিনেতা। এ প্রসঙ্গে উত্তমকুমার বলেছেন, এ সিদ্ধান্ত কেবল ছবিদাই নিতে পারেন।

‘কাবুলিওয়ালা’ ছবি বিশ্বাস।

ভারতবর্ষের ‘বেস্ট স্ক্রিন অ্যাক্টর’ ছিলেন ছবি বিশ্বাস। অভিনয় জগতে তিনি ছিলেন একটা যুগ। আগেকার দিনে অভিনয়ে একটা থিয়েটারি ঢঙ ছিল। প্রমথেশ বড়ুয়া প্রথমে সেটিকে ভাঙেন। পরে ছবি বিশ্বাস। পোশাকে-চলনে-বলনে একটা পরিবর্তন আনলেন। স্যুট-বুট পরা সাহেবি চরিত্র তাঁর মতো কেউ করতে পারেননি। সাহেবের চরিত্রে অভিনয় করে প্রথম নাম করেন ‘প্রতিশ্রুতি’ ছবিতে। আবার এই মানুষটি যখন ‘হেডমাস্টার’ করলেন, তখন হাঁটাচলাই বদলে দিলেন। ‘সদানন্দের মেলা’-তে ছবিবাবু একটা অন্য রূপ আনলেন। আবার ‘লেকিন খোঁকি তুমি শ্বশুরবাড়ি যাবে না, হামাকে ছেড়ে কোত্থাও যাবে না’, ‘দাও ফিরিয়ে দাও, ফিরিয়ে দাও আমার সেই বারোটা বচ্ছর’, ‘সুদখোরের টাকায় আমার একমাত্র ছেলের উপনয়ন হতে পারে না তারাপ্রসন্ন’, ‘মনে রাখব? কেন মনে রাখব? ওর বিশেষত্বটা কী’? ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘সবার উপরে’, ‘জলসাঘর’, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’-সহ বহু চলচ্চিত্রের সংলাপ বাঙালির মনে স্পষ্ট হয়ে আছে শুধু ছবি বিশ্বাসের অভিনয়ের গুণে। ‘কাবুলিওয়ালা’ ছবিটি রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পাওয়ায় যখন ছবি বিশ্বাস ২৯ এপ্রিল, ১৯৫৭-য় রাষ্ট্রপতি ভবনে উপস্থিত ছিলেন, সঙ্গে ছিলেন ‘রূপমঞ্চ’ পত্রিকার সম্পাদক কালীশ মুখোপাধ্যায়। সে দিনের সেই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভি কে কৃষ্ণমেনন। উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলেছিলেন, ছবি বিশ্বাস ভারতের শ্রেষ্ঠ প্রতিভাসম্পন্ন শিল্পী। এ বছর ছবি বিশ্বাস অভিনীত ‘শেষ পরিচয়’, ‘পৃথিবী আমারে চায়’, ‘বড়দিদি’, ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’, ‘তাপসী’, ‘নীলাচলে মহাপ্রভু’, ‘খেলা ভাঙ্গার খেলা’, ‘পথে হল দেরী’ সহ ২৭টি ছায়াচিত্র ৬০ বর্ষ পূরণ করল।

‘দাদাঠাকুর’ ছবি বিশ্বাস।

নাটকের ক্ষেত্রে গিরিশ-যুগের অভিনয়ের ধারাটি শিশির ভাদুড়ি, অহীন্দ্র চৌধুরীর সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছবিবাবু এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। একই ধারায়, একই মঞ্চে তাঁদের সঙ্গে অভিনয় করলেও প্রতি মুহূর্তে স্বকীয়তা বজায় রেখে গিয়েছেন। ১৯৩৮-এর ১৭ ডিসেম্বর মন্মথ রায়ের ‘মীরকাশিম’ নাটকে (নাট্যনিকেতন মঞ্চে, অধুনা বিশ্বরূপা) নামভূমিকায় অভিনয় করে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন। এক দিকে মঞ্চ, এক দিকে ছবি। ছবি থেকে আবার মঞ্চ। দাপটে চালিয়ে গিয়েছেন নিজের অভিনয় জীবন। তাই ‘সাঁওতাল বিদ্রোহ’ নাটকটির উৎসর্গপত্রে তাঁকে ‘নটসম্রাট’ নামে অভিহিত করেছেন মন্মথ রায়। যদিও জ্যোতি বাচস্পতি রচিত ‘সমাজ’ নাটকে পেশাদার শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ। পরে ‘পথের দাবী’, ‘পরিণীতা’ ও ‘ভারতবর্ষ’ করে নাট্যনিকেতন ছেড়ে নাট্যভারতীতে চলে আসেন। সেখানে তারাশঙ্করের ‘দুই পুরুষ’-এ নুটুবিহারীর চরিত্রে অসামান্য অভিনয় শিল্পীকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিল। ৭৫ বর্ষে পদার্পণ এই নাটকের। এ ছাড়া ‘ধাত্রীপান্না’, ‘দেবদাস’, ‘কাশীনাথ’, ‘চাঁদ সদাগর’, ‘চন্দ্রনাথ’, ‘বিজয়া’ সহ ৩৯টি নাটকে অভিনয় করেছেন। অভিনয় করেছেন মিনার্ভা, স্টার, শ্রীরঙ্গম ও সুন্দরম-এ। ‘স্বামী’ নাটকটি সুন্দরমকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল। পাশাপাশি নাট্যশিক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছিলেন ছবি বিশ্বাস। এবং তিনি বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে নাটকে প্রম্পটারের কোনো স্থান নেই।

খুব ভালো আবৃত্তিকার ছিলেন। বেতারে তাঁর নাটক ‘চাণক্য’, ‘চন্দ্রগুপ্ত’ সম্প্রচারিত হয়েছিল। ১৯৩৬ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত বাংলা-হিন্দি মিলিয়ে মোট মুক্তিপ্রাপ্ত ছবির সংখ্যা ২৫৯টি। ‘জলসাঘর’ ছবি প্রসঙ্গে পরিচালক সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, ছবিবাবু না থাকলে বিশ্বম্ভর রায়ের মতো এক দিকে দম্ভ ও অবিমৃষ্যকারিতা, অন্য দিকে তাঁর পুত্রবাৎসল্য ও সঙ্গীতপ্রিয়তা এবং শেষে তাঁর পতনের ট্র্যাজেডি -এতগুলি অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলা সম্ভব ছিল প্রানা। হিংসা-কূটনীতি অবলম্বন করে নিজের প্রতিষ্ঠা বজায় রাখতে কোনো দিন চাননি। তিনি নিজেই ছিলেন একটা প্রতিষ্ঠান।

তাঁর জীবনের শেষের সেই দিনটা? ১১ জুন, ১৯৬২। যাচ্ছিলেন জাগুলিয়ায়। পথে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান। তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের নির্দেশে তাঁর দেহের ময়নাতদন্ত হয়নি। তিনি বলেছিলেন, সবাই জানে এটা দুর্ঘটনা। আর শিল্পীর দেহে কাটাছেঁড়া চলে না। ছবিবাবুর মৃতদেহ কলকাতার সমস্ত নাট্যাঙ্গনগুলি ঘুরিয়ে টালিগঞ্জের বাড়ি হয়ে কেওড়াতলা শ্মশানে দাহ করা হয়েছিল। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর মৃত্যুর পর মন্তব্য করেছিলেন, ছবিদা চলে গেলেন। এ বার থেকে ব্যারিস্টারের চরিত্রগুলো কেটে মোক্তারের চরিত্র করতে হবে।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here