পাপিয়া মিত্র

যখন যেমন মনে করি তাই হতে পাই যদি,/ আমি তবে এক্ষনি হই ইচ্ছামতী নদী।/ কবিতাটি প্রথম যখন পাঠ করি তখন থেকে কবির সঙ্গে আমার আজন্মের বন্ধন তৈরি হয়ে গিয়েছে। আজও এমন ভাব আমি কারওর সঙ্গে জমাতে পারিনি। আজ থেকে ৯৬ বছর আগে (২৩ আশ্বিন, ১৩২৮) ‘ইচ্ছামতী’ কবিতাটি মনে হয় আমার জন্য লেখা হয়েছিল।

অথচ তখন আমি কোথায়? ‘আমি হেথায় আছি শুধু গাইতে তোমার গান’। সেই গান আমি আজও গেয়ে চলেছি। ছোটো খুকু তখন কথা কয় না। আকাশের মেঘ গুড়গুড় করলে কেবল কান্নাকান্না ভাব। না হলে শান্ত হয়ে বাটি নিয়ে বসে থাকে, কখন বাড়ির বড় বৌ ভাত দেবে। বড় বৌ, আমার মা। মায়ের নানা কাজ সারার মধ্যে খুকুর বড় হয়ে ওঠা। জেলে ডিঙি চলে বেয়ে, গান গেয়ে। সেই গান শুনতে পাই আজও কারণ বাড়ির গা দিয়ে বয়ে গেছে গঙ্গা। এক দিন দেখেছিলাম নদীর ঘাটের কাছে যে নৌকা বাঁধা ছিল, আজ সকালে গিয়ে দেখি তা নেই। অথচ রাত ফুরোতেই ভয় কেটে গেল, চারদিক ঝিকমিক। কাল অসময়ে ইচ্ছে হচ্ছিল আমার ভাবনা এক দিন যে ডানা মেলে উড়ে যেত, সে কখনও ঘোড়া, কখনও পাখি, কখনও বা প্রদীপের আলো হয়, তাতে সওয়ারি হই। দেখে আসি আমার নৌকা কেমন ঢেউয়ের তালে তালে নাচছে। কিন্তু আজ গিয়ে দেখি সে অনেক দূরে। জোয়ারের টানে সে মাঝনদীতে, উদাসী মন নিয়ে চলেছে।

‘ইচ্ছামতী’ পড়তে গিয়ে বারবার সেই চটি বইটিকে মনে পড়ে যায়। ইচ্ছে অনুভব করার বোধ যে দিন থেকে বুঝেছি, সে দিন থেকে আজও সরল মনে আসন পেতে ফেলেছে সহজ পাঠ। আজও আত্মীয়স্বজন বাইরে কোথাও গেলে মন গুঞ্জরিয়া ওঠে, থাকি ঘরের কোণে, সাধ জাগে মোর মনে অমনি ক’রে যাই ভেসে ভাই নতুন নগর বনে? কী মাহাত্ম্য আছে নন্দলাল বসুর অলঙ্করণে সহজ পাঠ বইখানিতে যা বর্ণপরিচয়ের পরেই পড়তে হয়েছিল? চারটি পাঠের বই কিনেছিলাম কোনও এক বছরে কলকাতা পুস্তকমেলায়। প্রথম ভাগটি খুলে বসতেই ফুলে ভরে যায় আমার ডাল অথচ কাল পর্যন্ত সেটি খালিই ছিল।

ছিপছিপে বইটি শিখিয়ে দিয়েছে শালের রঙ লাল, জবাফুলের রঙ লাল, ফুল রাখার পাত্রটিকে সাজি বলে। বেলফুল সাদা। পুজোর সময় ধূপধুনো জ্বলবে, সঙ্গে ঢাকঢোলও বাজবে। অসাধারণ এক পুজোপ্রস্তুতির আয়োজন আছে ২৩ নম্বর পাতায়। ছোটো খোকা দোলা চড়ে দোল খেতে খেতে সেও এক সময় সুর করে বলে ওঠে নাম তার মোতিবিল, বহু দূর জল,/ হাঁসগুলি ভেসে ভেসে করে কোলাহল।/ পাঁকে চেয়ে থাকে বক, চিল উড়ে চলে,/ মাছরাঙা ঝুপ করে পড়ে এসে জলে।/ সবই ইচ্ছের তাগিদ। সময় গড়িয়ে যায়।

বিনিপিসি, বামি আর দিদি ঘাটে যায়। রানীদিদি যায় না। কেন যায় না? তার কারণ তার তিন দিন জ্বর। এই সহজপাঠ্য থেকে প্রশ্নের মায়াজালে জড়িয়ে আছে উত্তর। কবি, লেখক, গীতিকার নাকি তিনি আমার প্রাণের দেবতা? তাঁর ইচ্ছেখুশির সুরে এক একটি ফুল দিয়ে সুরের মালা গেঁথে গিয়েছেন তিনি। এইবার আমি বাড়ি যাই। তুমি এসো পিছে পিছে। পাখি খাবে, দেখো এসে। দীনু টিয়া পাখি পোষে, তার পায়ে বেড়ি, ও ওড়ে না। এ কষ্ট লেখকের নিজের। তিনি ইচ্ছেমতো বেরিয়ে পড়তে পারেন না। ভৃত্যমহলে বড়ো হওয়ার ব্যথা তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন সহজ পাঠের পাতায়। তাই তিনি ছুটির অনাবিল আনন্দ খুঁজে পেয়েছেন প্রকৃতির মাঝে।

হরিমুদি শিখিয়েছে তার দোকানে কী কী থাকে। শিশুকালের চোখ তা বিস্ময়ে গিলে খেয়ে আজও মনে রেখেছে। বিশ্বভারতীর বুধবার ছুটি, তাই বালককবি নুটু খুব খুশি। চড়িভাতি হবে, মুড়ি আর নুন নিতে হবে। কুলবন থেকে কুল পেড়ে বাড়ি নিয়ে যেতে হবে। শিক্ষণীয়, যারা চড়িভাতিতে আসতে পারেনি, তাদের জন্য কিছু নিয়ে যাওয়া। ছায়ার ঘোমটা মুখে টেনে যে পাড়া ঘুমিয়েছিল আমার মতো, হঠাৎ কোলাহলে সে মেতে ওঠে। মেতে ওঠে কারণ আষাঢের প্রবল বেগে ধাবমান আমাদের ছোটো নদী। আমাদের সকল ভালোবাসা যেন এমন ভাবেই ধেয়ে যায় এক মন থেকে অন্য জনে।

এই একলা বসে থাকা সকালে খেলার মাঠও শুধিয়ে গেল শচী সেন, মণি সেন, বংশী সেনদের মনে আছে কিনা। আরও বলল, মধু শেঠ, খেতু শেঠকে চিনি কিনা। বললাম, আছে আছে, সব মনে আছে, কিন্তু আমার তো বল নেই। মাঠ বলল, দূর বোকা এই নিয়ে মন খারাপ করতে আছে নাকি? ঢেলা দিয়ে গাছ থেকে বেল পেড়ে নেব। ওঠ ওঠ, খেলা শেষে লেখা বাকি আছে।

এ দিকে দেখ দেখি পায়ে পায়ে শরত এসে হাজির। ভোরের ঘাস মুচকি হেসে বলল ওই দেখ, দূরের বনে পুজোর রোদ ঝিলিক দিচ্ছে, কিরণ ছড়িয়ে পড়েছে ভরা দিঘির বুকে। জলে হাসির রোল তুলে বৈঠা বেয়ে শৈল আসছে। ওর আজ পৈতে, সেই উপলক্ষে বেণি বৈরাগীর গান শোনা যাবে। নানা রঙ দিয়ে স্বপ্ন আঁকি মনে মনে। দিনের সঙ্গে রাতের কোনো মিল খুঁজে পাই না। আমার সেই ইচ্ছেমতী আমার মনশরীর জুড়ে। আজ আমি বাতাস, আজ আমি মেঘ, আজ আমি সাগর, আজ আমি বিছানায় শুয়ে।

সৌরিদিদি আমার বড়ো ইচ্ছে করছে মৌরলা মাছ দিয়ে ভাত খেতে। কিন্তু ওই যে ঘরের কোণে থাকতে হয়। মধু কাঁচা আম নিয়ে হেঁকে যায়। আমি শুনতে পাচ্ছি, কাছে যেতে পারছি না। বাঁশগাছে বাঁদর, ভয় করছে। আমার ইচ্ছামতী, আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে চল ‘নাম জানি নে, গ্রাম জানি নে, অদ্ভুতের এক-শেষ’-এ।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here