রবীন্দ্রনাথের এই বিরল ছবিটি মংপুর রবীন্দ্র ভবনে সংরক্ষিত। নিজস্ব চিত্র।
pankaj
পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

দীর্ঘদিন ধরে ভুগছিলেন বয়সজনিত জরাব্যাধির নানান দুর্বিপাকে। চিকিৎসকরা বলেছিলেন, ‘ইউরিমিয়া’- কিডনির অসুখ। ১৯৪০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর কবিগুরু ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লেন কালিম্পঙে। তাঁকে পাহাড় থেকে নামিয়ে নিয়ে আসা হল কলকাতার জোড়াসাঁকোয়। শুরু হল চিকিৎসা। ডাঃ নীলরতন সরকার, ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় প্রমুখের তত্ত্বাবধানে শহরের বিখ্যাত ডাক্তাররা কবিগুরুর চিকিৎসায় যুক্ত ছিলেন। ডাক্তাররাই সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিলেন একটা ছোটো অপারেশন করার। কবিগুরুকে রাজি করানো হল এবং ১৯৪১-এর ৩০ জুলাই অপারেশনটি সফল ভাবে করা হল। প্রথম ক’দিন ভালোই ছিলেন। ডাক্তাররা বিশ্বকবির শারীরিক অবস্থার দিকে সতর্ক দৃষ্টিও রেখেছিলেন। হঠাৎ গুরুদেবের শরীরটা একটু খারাপ হতে লাগল। শরীর খারাপ নিয়েও ক’দিনে চারটি কবিতা লিখলেন — ‘রূপনারানের কূলে’, ‘প্রথম দিনের সূর্য’, ‘দুঃখের আঁধার রাত্রি’, ‘তোমার সৃষ্টির পথ’।

শরীরটা খুব খারাপ হতে শুরু করল ২১শে শ্রাবণ সকাল থেকে। কবিগুরু প্রায় অচৈতন্য। কিছুই খাচ্ছেন না। জল খাওয়ানোর চেষ্টা হল, কিছুটা পেটে গেল আর বাকিটা গড়িয়ে পড়ল। শয্যার পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন অন্যদের সঙ্গে ডাঃ সরকার, ডাঃ রায় প্রমুখ। বিশ্বকবিকে বিরক্ত করতে বারণ করে অশ্রুসজল চোখে কবির শায়িত অবস্থার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন কবির বহু দিনের বন্ধু ডাঃ সরকার। ২১শে শ্রাবণের রাত কাটল এক রাশ উৎকণ্ঠায়।

আরও পড়ুন রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর জন্য‌ কি দায়ী বিধানচন্দ্র

২২শে শ্রাবণ ভোর থেকেই শুরু হল কবিগুরুর সৃষ্টি – ব্রহ্মসঙ্গীত। সমস্ত ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ প্রার্থনারত কবির জন্য। অশ্রুসিক্ত নয়নে লক্ষ লক্ষ মানুষ জোড়াসাঁকোর বাড়িতে, কলকাতার রাস্তায়। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ উৎকণ্ঠিত – তাঁরা বারবার শুনছেন আকাশবাণীর বুলেটিন। রেডিও স্টেশনে আর সংবাদসংস্থা ও সংবাদপত্রের দফতরে অহরহ ফোন আসছে কবির শারীরিক অবস্থার বিষয়টি জানতে। শ্রাবণের আকাশে বিষণ্ণতার মেঘ। মাঝে মাঝে আকাশের কান্না বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ছে মাটির ধরাতলে। শুধু ধ্যানমগ্ন শায়িত ঋষিকবি মাঝেমাঝে তাঁর দুটি চোখ মেলে তাকাচ্ছেন যেন অসীমের উদ্দেশে। বেলা ৯টায় তাঁকে অক্সিজেন দেওয়া হল। কবির অবস্থা ধীরে ধীরে খুবই খারাপের দিকে যাচ্ছে। ঘড়িতে তখন কাঁটায় কাঁটায় ১২টা ১৩ মিনিট – কবিগুরুর ডানহাতখানা কাঁপতে কাঁপতে কপালে নমস্কারের মতো ঠেকিয়েই পড়ে গেল – স্তব্ধ হয়ে গেল হৃৎস্পন্দন। পথ হল অবসান। তিনি চলে গেলেন ‘জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে’ ‘অশ্রুনদীর সুদূর পারে…’। শান্তসমাহিত বিশ্বকবির মুখশ্রীতে কোনো যন্ত্রণা বা কষ্টের চিহ্নমাত্র আর নেই। ২২শে শ্রাবণের দ্বিপ্রহরে বাঙালির-ভারতের-বিশ্বের ‘রবি’ চলে গেল অস্তাচলে। কান্নায়, বেদনায়, বিদুরতায় নিমগ্ন সবাই।

অসুস্থ রবীন্দ্রনাথ। শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতার পথে। ছবি সংগৃহীত।

বেশ কয়েক ঘণ্টার হতবাক অবস্থা কাটার পর বেলা সাড়ে তিনটেতে বিশ্বকবির অন্তিমযাত্রা শুরু হল। চার দিক থেকে ফুলের মালা, ফুলের স্তবক, ফুলের পাপড়ি, গোলাপজল, তাঁর উদ্দেশে প্রণামের মতো নিবেদিত হতে লাগল। পথের দু’পাশে বাড়ির বারান্দা, ছাদ, প্রভৃতি জায়গা থেকে পুষ্পবৃষ্টি হতে লাগল। সকলের চোখের কোণে জল, অন্তরে অব্যক্ত বুকফাটা আর্তনাদ – রবিহীন হয়ে গেছে এ বিশ্বজগৎ। কলকাতার বিভিন্ন পথ এবং প্রতিষ্ঠান পরিভ্রমণের পর যখন ২২শে শ্রাবণের সূর্য বসলেন পাটে, তখন লক্ষ লক্ষ মানুষের কাঁধে কাঁধে বাহিত হয়ে কবিগুরুর অন্তিম শয্যাখানি এসে পৌঁছোল নিমতলা মহাশ্মশানে। রবীন্দ্রনাথের নশ্বর শরীরে অগ্নিসংস্কারের প্রক্রিয়া শুরু হল। আকাশবাণীতে প্রচারিত সে দিনের দুঃখস্নাতা ২২শে শ্রাবণের অশ্রুধারায় সিক্ত ধারাভাষ্যের অভিব্যক্তি সমস্ত মানুষের কান্না হয়ে আকাশে বাতাসে ভেসে বেড়াতে লাগল।

আরও পড়ুন সে দিন ব্রাহ্মসমাজের উৎসবে মুখোমুখি হয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ ও রবীন্দ্রনাথ

আজও ২২শে শ্রাবণের অপর নাম, কান্নাভেজা আকাশ বাতাস মাটি ও মন। আর আজও ২২শে শ্রাবণ যেন বলে যায়, “আমি মৃত্যুর চেয়ে বড়ো এই কথা বলে –যাব আমি চলে”। “মোর নাম এই বলেই খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক”। “তবু মনে রেখো, যদি দূরে যাই চলে, তবু মনে রেখো”।

 

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন