lalkrishna advani
লালকৃষ্ণ আডবাণী। ছবি সৌজন্যে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
debarun roy
দেবারুণ রায়

লোকসভা ভোটের সময় যত কাছাকাছি আসছে ততই রামনাম জপের আগ্রহ বাড়ছে সংঘ পরিবারের তাবৎ শাখা প্রশাখায় ছড়িয়ে থাকা নেতাদের। বারে বাড়ছে জপ। দশ থেকে একশো, একশো থেকে হাজার, হাজার থেকে লাখের দিকে এগোচ্ছেন নেতারা। ভোটের ভয় অবশ্যই ভুতের ভয়ের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। অগত্যা  রামনাম। মন্দির ওঁহি বনায়েঙ্গে। জনগণ জানে এ মন্দির সে মন্দির নয়। এ যেন এক মনমন্দির। মনে মনে মন্দির তো আছেই। বিপৎকালে শুধু বলে যাও। তাতেই মুক্তি ! ‘৯২-এর ৬ ডিসেম্বর থেকেই শুরু হয়েছে এই জপমালা নিয়ে কাড়াকাড়ি। ভাগবত মশাই সূচনা করেছেন এই নব পর্যায়ে রামনাম। আর একটা নির্দিষ্ট তফাতও দিব‍্যি লক্ষ‍ করা যায়। জাতির জনক যে ভাবে রামনাম করতেন, যে ভাবে গাইতেন রঘুপতি রাঘব, সেই ধুন অথবা তাঁর অন্তিম উচ্চারণ হে রাম, তার সঙ্গে আকাশ পাতাল তফাত এই রামভক্তির। অযোধ্যায় মন্দিরই হোক কিংবা মূর্তি,  বক্তব্যগুলো যেন হুমকির সুরে। তার মধ্যে প্রখর রাজনীতি, ভোটনীতি থাকলেও রামনামের সেই বার্তা কোথায়? যেখানে অন্য ধর্মের প্রতি বৈরিতাই মূল সুর। ভারতাত্মার সঙ্গে তার মিল নেই।

আরও পড়ুন মায়াজাল চন্দ্রবাবুর : সায় মমতার, জোটে এ বার মায়াবতী?

শুধু কি রাম? রামের সঙ্গে সঙ্গে রামভক্ত হনুমানেরও রেহাই নেই। খোদ উত্তরপ্রদেশের মুখ‍্যমন্ত্রীর মুখেই শোনা যাচ্ছে হনুমানের নতুন পরিচয়। একে সন্ন্যাসী, যোগী, তার ওপর মঠের মহন্ত, দীর্ঘদিনের জনপ্রতিনিধি এবং সংবিধানের নামে শপথ নেওয়া সাংবিধানিক পদাধিকারী। প্রাজ্ঞ আদিত‍্যনাথের সব পরিচয় ছাপিয়ে গেল তাঁর নেতা’ সত্তাটি। তিনি বললেন, হনুমান নিপীড়িত, দলিত। বহু ভোট-রণে সফল সৈনিক যোগী ঈশ্বরপ্রেমিকও। রণে, প্রেমে যে সবই চলে। নীতির প্রশ্ন নেই। হয়তো তাই পৈতেধারী পরম ব্রাহ্মণকে দলিত বানালেন সংঘের রাজনৈতিক সূত্র মেনে। ব্রাহ্মণ‍্যবাদের রক্ষক ও বাহকরা দলিত নিগ্রহের তাবৎ ঘটনায় জল ঢেলে দিতে হনুমানকে দলিত সাজাতে চান। তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে যোগীর মন্তব্যের। শঙ্করাচার্য গর্জেছেন প্রতিবাদে। যোগীকে তিন দিনের ভেতর মন্তব্য প্রত‍্যাহার করার কথা বলেছেন কেউ কেউ। কিন্তু যোগী অনড়।

আর অযোধ্যা থেকে কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ডের হোতা ছিলেন যাঁরা, তাঁরা এই উন্মাদনার পর্বে কেন নীরব, কেন কোণঠাসা? কোথায় লালকৃষ্ণ আডবাণী, মুরলীমনোহর জোশি, উমা ভারতী? যাঁদের নাম এখনও বহাল বাবরি মসজিদ ভাঙার চার্জশিটে। প্রয়াত অশোক সিংঘল। অযোধ্যা কাণ্ডের নাম্বার টু বললে অত‍্যুক্তি হবে না। অযোধ‍্যায় রথী মহারথীদের এত সমাবেশ হয়ে চলেছে, কিন্তু আন্দোলনের হোতারা আজকের নেতাদের বিস্মৃতির অতলে ঠেলে দিয়েছেন। তাঁরা এ ভাবেই‍ আগামী প্রজন্মের কাছে দাম পাবেন। বিজেপির ইতিহাস সে কথাই বলছে। ভারতের গেরুয়া শিবির দেশের অতীতের‌‌ সুলতান, ‌মোগল, পাঠান শাসকদের সময়কেও বিদেশি শাস‌নকাল হিসেবে ধরে। এই শাসকদের মধ্যে কেউ কেউ সিংহাসন কবজা বা রাজত্ব নিষ্কণ্টক করতে বাবা বা বড়ো ভাইকে পর্দার অন্তরালে পাঠিয়ে ইতিহাসের কলঙ্কিত নায়ক হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে। এদের মধ্যে সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য নাম আওরঙ্গজেব। হিন্দুত্ব প্রচারক বিজেপিতে বিগত বা বিদায়ী প্রজন্মের নেতাদের হাল কোন রাজত্বের সঙ্গে তুলনীয়?

uma, advani, joshi
উমা, আডবাণী ও জোশি। ছবি সৌজন্যে দ্য ওয়্যার।

সংঘ পরিবারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর অনুসৃত নীতিগুলির ও সরকার পরিচালনার পদ্ধতির সঙ্গে মোদী জমানার কত তফাত তা তুলনামূলক বিচার করলেই স্পষ্ট হবে। হিমশৈলের চূড়াটুকুই তার চূড়ান্ত প্রমাণ। অটল-জমানায় সংবাদপত্র বা সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতাকে সরকার কতটা গুরুত্ব দিত তার প্রমাণ ছিল গণমাধ্যমের প্রতি সরকারের মনোভাব। প্রধানমন্ত্রী যে কোনো বিশেষ উপলক্ষ্য ছাড়াও সাংবাদিক বৈঠক ডাকতেন, বিরোধীদের সঙ্গে নিয়মিত সম্বাদ চলত। গোপনীয়তার ঘেরাটোপ না রেখে জননেতা সুলভ স্বচ্ছতা বজায় রাখতেন। যে কোনো অস্বস্তিকর প্রশ্নেরও জবাব দিতেন। উত্তরদায়ী থাকতেন প্রতি মুহূর্তে। এ জমানায় একেবারেই বিপরীত চিত্র‌। গণমাধ্যমকে দূরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে প্রথম দিন থেকে। সম্পর্ক বলতে সংবাদ নয়, বিজ্ঞাপন। মোদী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কোনো সাংবাদিক বৈঠক কখনও ডাকেননি।

আরও পড়ুন আসরে চন্দ্রবাবু, অশনিসংকেত বিজেপির

প্রসঙ্গের শুরুতে ছিল মন্দির। বিজেপির আ্যজেন্ডায় অযোধ্যাকে আনেন আডবাণী। দলের সভাপতি হিসেবে হিমাচলের পালানপুরে জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের অযোধ্যা আন্দোলনকে সমর্থন করে প্রস্তাব নেন। সেই পালানপুর প্রস্তাবই বিজেপির অগ্রগতির গ্রাফ বদলে দেয়। এক সংখ্যার বিজেপি সংসদে তিন সংখ‍্যায় পৌঁছোয়। এবং কংগ্রেসের বিকল্প হয়ে ওঠে। জোশি সভাপতি হয়ে লংমার্চ করেন কাশ্মীর পর্যন্ত। তখন কেন্দ্রের শাসনে কংগ্রেস। জোশি শ্রীনগরের লালচকে তেরঙ্গা তোলেন স্বাধীনতা দিবসে। মোদীর মেন্টর ছিলেন আডবাণী। গুজরাতে তাঁকে মুখ‍্যমন্ত্রী করা ও তিনটি মেয়াদ রেখে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল আভবাণীর সিদ্ধান্তে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর পদপ্রার্থী হওয়ার পর থেকেই মোদী দলের ভেতরে তাঁর প্রতিপত্তির রথ চালাতে শুরু করেন। কামরাজ প্ল‍্যানের নকশায় বাঘা বাঘা নেতাদের বাণপ্রস্থে পাঠান। মার্গদর্শকমণ্ডলী গঠন করে দলের প্রতিষ্ঠাতাদের তার সদস‍্য করেন এবং নীতি-নির্ধারক সব পদ থেকে সরিয়ে দেন। আজ পর্যন্ত মোদী জমানায় মার্গদর্শকমণ্ডলীর কোনো বৈঠক হয়নি। প্রয়াত অটল ওই মণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। কিন্তু কোনো বৈঠক দেখে যেতে পারলেন না। এরই বিপরীতে মোদী জমানায় দলে ও সরকারে কা্রা দণ্ডমুণ্ডের কর্তা তা সবাই জানেন।

মোদীর মেয়াদ শেষের মুখে রামনাম নিচ্ছেন দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা। অথচ এই কোলাহলে রামরথের রথী একাকী নী্রবে প্রহর গুনছেন। ক্ষোভে মুখর হলে নিমেষে টলিয়ে দিতে পারেন অহংকারের সিংহাসন। প্রমাণ করে দিতে পারেন কে আসল নেতা। কিন্তু সহস্তে যে সংগঠনের ভিত গড়েছেন, এক এক করে সাজিয়েছেন এক একটা ইট, মিটিয়েছেন ক্ষুধা, তৃষ্ণা, অক্সিজেনের অভাব, তার বিরুদ্ধে মুখ খোলার রাজনীতি একদা ‘রুথলেস’ আডবাণীর অজানা।

advani and vajpayee
আডবাণী ও বাজপেয়ী। ছবি সৌজন্যে নিউজ১৮.কম।

অথচ সংসদে আইন করে অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণের প্রথম পথপ্রদর্শক ছিলেন আডবাণীই। প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি হিসেবেও এই পরিকল্পনা তাঁর পকেটেই ছিল। কিন্তু সায় দেননি অটল। মন্দির-সহ কোর ইস‍্যুগুলো মুলতবি রাখার মুচলেকা দিয়ে শরিকদের সঙ্গে পেয়েছিল বিজেপি। সেই কথার খেলাপ হোক চাননি বাজপেয়ী। এবং সারা জীবন বিরোধিতার পর শেষ পর্যন্ত অটলের পথকেই সঠিক ভারতীয়তার পথ বলে মানেন। এটাই তাঁর দীর্ঘ জীবনের সারাংশ।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here