pranab mukherjee in rss headoffice
দেবারুণ রায়

নাগপুরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সদর দফতরে উপস্থিত হয়ে ওই সংগঠনের প্রশিক্ষণ শিবিরের সমাপ্তি অনুষ্ঠানে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের বক্তৃতা করার ঘটনা সারা দেশে আলোড়ন তুলেছে। বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশে এই ধরনের আলোড়ন ও বিতর্ক অবশ্যই স্বাস্থ্যকর। ঢেউ ছাড়া সমুদ্র, স্রোত ছাড়া নদীর কথা কল্পনা করা যায় না। যে সমাজ-অর্থনীতি-রাজনীতিতে বিতর্ক নেই তা অবশ্যই প্রাণহীন। দিল্লির যমুনা বা কলকাতার আদিগঙ্গা যেমন বর্জ্য বহন করে করে মজে গিয়েছে, তেমন স্বৈরশাসক নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রে ও সমাজে জো-হুজুর সংস্কৃতির দৃষ্টান্ত তো আছেই কিছু দেশে। কিন্তু ‘মন্বন্তরে মরিনি আমরা মারি নিয়ে ঘর করি’…। তাই গোটা দেশ যখন প্রণববাবুর ছবিতে টুপি পরিয়ে ওঁর ছবিকে ‘নমস্তে সদাবৎসলে…’ মুদ্রায় সাজিয়ে ফেসবুকবাজিতে ব্যস্ত তখন কিন্তু বাংলায় অল্পবিস্তর চর্চা চলেছে মতাদর্শ নিয়ে।

প্রথম দফায় বামপন্থীরা কিন্তু ততটা খড়গহস্ত নন। তাঁরা শুধু বলেছেন, “নাগপুরের মঞ্চে প্রণববাবুর উপস্থিতিতে আরএসএসের উপকার হয়েছে।” অনেকটাই সংযত মন্তব্য। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের চোরাস্রোতে বারবার কংগ্রেসের নৌকাডুবি হয়েছে, সেই উপসর্গই প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির অবস্থানের অপব্যাখ্যায় উৎসাহী। বাংলার ডুবন্ত নৌকা এই দুর্বিপাকের আবহে আরও টালমাটাল। কারণ সারা দেশেই চলছে তীব্র মেরুকরণের প্রক্রিয়া। মেরুকরণ যত না ধর্মীয়, তার চেয়ে বেশি সাম্প্রদায়িক ও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক। এই মেরুকরণের মুখে কংগ্রেসের মতো মধ্যপন্থী দলের পক্ষে টিকে থাকার লড়াই ভয়ংকর কঠিন। একেবারেই অসম প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বাইরের প্রতিপক্ষকে তো চেনা যায়। কিন্তু ঘরশত্রু? বিজেপির প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে যারা তাদের অনুকরণ করতে চেয়েছে এবং ভূতের মুখে রামনাম শুনে মানুষ তাদের বর্জন করেছে সেই তারাই এখন উচ্চকিত প্রণববাবুর বিরুদ্ধে। যাঁর রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজনীতি নেহরুবাদী ধারায় সময়োচিত রূপ এবং জনসমর্থনের কষ্টিপাথরে যাচাই করার পাশাপাশি কংগ্রেসের মতাদর্শের মন্থন।

daughter sharmistha disapproved father's nagpur visit
বাবার নাগপুর যাওয়া নিয়ে আপত্তি করলেন মেয়ে শর্মিষ্ঠা।

প্রথমত, প্রণববাবুর মেয়ে শর্মিষ্ঠাকে দিয়েই শুরু হল বিতর্কের স্বস্তিবাচন। অবশ্য তাঁর মেয়ে হিসেবে এবং অন্যদের তুলনায় দলের প্রকৃত কনিষ্ঠ এক জন কর্মী হিসেবে শর্মিষ্ঠা যে আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছিলেন, তা তাঁর নিজস্ব অবস্থান হিসেবে মানতে সমস্যা নেই এবং কংগ্রেসি রাজনীতিতে প্রণববাবুর মতো ষাটটি প্রখর গ্রীষ্ম, বর্ষা বা বসন্ত উত্তীর্ণ প্রাজ্ঞ রাষ্ট্রনায়কদের সিদ্ধান্তের ওপর তার ছায়া পড়েনি। পরে যখন তাঁর বাবার মাথায় কালো টুপি দিয়ে ডান হাত স্বয়ংসেবকের মতো ভাঁজ করে নবকলেবর তৈরি হল ফেসবুকে, তখন শর্মিষ্ঠা বললেন, তিনি এই ডার্টি ট্রিক্সের কথাই আগাম বলেছিলেন। তৎসত্ত্বেও ফেসবুকের ‘বেসলেস’ কথাকে প্রণব যদি গুরুত্বের অযোগ্য বলে মনে করেন, তা হলে তাঁকে দায়ী করা যায় না। দেখা গেল, আগে চিদম্বরম ও আহমেদ পটেল এবং পরে মণীশ তেওয়ারির মতো কেউ কেউ নাগপুরের ব্যাপারে অনেকটাই ছুঁৎমার্গ মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি কোনো জবাব দেননি। যা মনস্থ করেছেন তা-ই করেছেন।

আরও দু’ জন প্রবীণ কংগ্রেসি একই বিষয়ে মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছেন – সুশীল কুমার শিন্ডে এবং বীরভদ্র সিং। এঁরা আগাগোড়াই ভরসা রেখেছেন প্রণবের সিদ্ধান্ত এবং বক্তব্যের ওপর। কিছু দিন বিদেশ মন্ত্রকে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে সলমন খুরশিদও পরিমিত কথায় আস্থা জানিয়েছেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির কাজের ওপর। সনিয়া বা রাহুল গান্ধী কিন্তু কিছু বলেননি। বলার কথাও নয়। তবু খবর লেখা হল, প্রণবের ভুমিকায় সনিয়া ক্ষুব্ধ। বিশেষ করে রাহুল যখন আরএসএসের বিরুদ্ধে অল আউট যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন তখন কেন প্রণব নাগপুরে গেলেন। এমনকি কল্পনার ঘোড়সওয়ার হয়ে কেউ কেউ লাগাম ছেড়ে দিলেন লেখনীর। লেখা হল, ‘অদূর ভবিষ্যতে বিজেপি সংসদে গরিষ্ঠতা না পেলে প্রণবের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন করতে পারে। তারই জমি নাকি তৈরি হচ্ছে’। এটা হলুদ না সবুজ কী রঙের লেখা তা বলবে ২০১৯,  যা আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে।

lalkrishna advani
প্রণববাবুর নাগপুর সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ বললেন আডবাণী।

অবশেষে আসরে এলেন আডবাণী, যিনি জিন্না নিয়ে জট পাকিয়ে ফেলে মার্গদর্শক হওয়ার পর বিরল বিষয়ে মুখ খুলে প্রণবের তারিফ করেছেন। রাজনীতির ক্ষুরধার যুক্তিবুদ্ধি ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতা আডবাণী জীবনে একটিও উদ্দেশ্যবিহীন কথা বলেননি। এমন কিছু বলেননি বা করেননি যা নিয়ে পরে ‘বলিনি’ বা ‘করিনি’ বলে রিজয়েন্ডার (প্রতিবাদ) দিতে হয়েছে। এমন এক জন মানুষ, যিনি নব্বই বছর বয়সেও প্রখর মস্তিষ্ক নিয়ে রাজনীতির অনুধ্যান করেন। সু-সংলগ্ন থাকেন আজীবন-লালিত মতাদর্শ ও রাজনৈতিক অবস্থানে। তাই এখনও উদ্দেশ্যপ্রবণ। জাতীয় জীবনের বহু বিতর্কে ইদানীং মৌন থাকলেও নাগপুরের গুরুগৃহে প্রণবের উপস্থিতি নিয়ে একটি দ্ব্যর্থহীন বিবৃতি দিয়েছেন। দলের হালফিল রাজনীতিতে তাঁর মতামতের কোনো মূল্য নেই। নীতিনির্ধারক কোনো কমিটির তিনি সদস্যও নন। কিন্তু প্রণব মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে তাঁর বিবৃতিটি দলের মিডিয়া সেলই প্রচার করে। বিবৃতিতে প্রণববাবুকে রাষ্ট্রনায়ক বলার পাশাপাশি তাঁকে ও মোহন ভাগবতকে দুই ‘জাতীয় নেতা’ উল্লেখ করে নাগপুরের প্রশিক্ষণ শিবিরে তাঁদের ভাষণকে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে তুলে ধরেছেন আডবাণী। বোঝা যায়, সরসংঘচালক ভাগবত যেখানে থেমেছেন সেই বিন্দু থেকেই শুরু করেছেন সংঘ পরিবারের সব চেয়ে সফল সংগঠক এই নবতিপর নেতা। অতীতে বারবারই তিনি বিরোধী বেঞ্চ থেকে ট্রেজারি বেঞ্চের প্রথম সারিতে বসা প্রণববাবুর সদর্থক মূল্যায়ন করেছেন। কখনও শাসকদল কংগ্রেসকে তীক্ষ্ণ তিরে বিদ্ধ করে বলেছেন, “ওঁদের মধ্যে শুধু প্রণব জানেন।” আক্রমণ সুগারকোটেড বুঝেও প্রণববাবু কুশলী ঔদার্যের আবরণে নির্বিকার থেকেছেন। আডবাণীর তির তাঁর বর্ম ভেদ করতে পারেনি।

ইউপিএ সরকারের বরিষ্ঠ মন্ত্রী, মনমোহন মন্ত্রিসভার নম্বর টু ও লোকসভার নেতা হিসেবে প্রণব মুখোপাধ্যায় প্রতিরক্ষা, বিদেশ ও অর্থ মন্ত্রকের দায়িত্বে থেকেছেন একের পর এক। সাউথ ব্লকের দু’টি মন্ত্রকের দায়িত্ব সামলানোর পর রাজপথ পেরিয়ে পৌঁছেছেন মুখোমুখি নর্থ ব্লকে। এবং সাউথ ব্লকের বিজয় চক ঘেঁষা কোণের ঘরে (প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দফতর) বেশ কিছু দিন কাটালেও রাষ্ট্রপতি ভবন ঘেঁষা কোণের ঘরের মূল কক্ষে (প্রধানমন্ত্রীর চেম্বার) তাঁর বসা হয়নি হাইকমান্ড অর্থাৎ গান্ধী পরিবারের বিশেষ সিদ্ধান্তে। কিন্তু কংগ্রেসের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে গুরুত্বের আসনেই থেকেছেন। কেন্দ্রের মন্ত্রী থাকাকালীনই কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য এবং পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছেন। লোকসভার নেতাই প্রধানমন্ত্রী হয়ে থাকেন। কিন্তু মনমোহন রাজ্যসভা থেকে এসেছিলেন বলে তাঁকে লোকসভার নেতা করা যায়নি। এ ক্ষেত্রে মনমোহনকে লোকসভায় জিতিয়ে আনার তাড়নাও অনুভব করেননি সভানেত্রী সনিয়া গান্ধী। কারণ তিনি জানতেন লোকসভার নেতার পদে আছেন দলের সব চেয়ে যোগ্য নেতা ও দক্ষ প্রশাসক, যিনি তাঁর শাশুড়ি ইন্দিরার মন্ত্রিসভারও নম্বর টু এবং ইউপিএ সরকারে ওই জমানার একমাত্র মন্ত্রী। pranab and manmohanকেন্দ্রের অর্থসচিব ও রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর-সহ বিভিন্ন দায়িত্বে থাকাকালীন ড. মনমোহন সিং ইন্দিরা সরকারের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়কে ‘স্যর’-ই সম্বোধন করতেন। এই পুরোনো অভ্যাসটি মনমোহন কিন্তু বদলাননি। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরেও। প্রণব আগাগোড়াই তাঁকে ‘ডক্টর-সাব’ বলে এসেছেন। ইউপিএ জমানাতেও তা-ই বলেছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তাঁর মন্ত্রিসভার নাম্বার টু-কে ‘স্যর’ বলে সম্বোধন করছেন, এটা শেষ পর্যন্ত মানতে নারাজ হলেন প্রণব। এক দিন সংসদের দফতরে বলেই বসলেন, ডক্টর সাব, আপনি এখন প্রধানমন্ত্রী। পদমর্যাদার খাতিরে অন্তত এই সম্বোধনটা বদলান। বাধ্য অগ্রজ অনেকটাই অপ্রস্তুত। তার পর থেকে সনিয়া গান্ধীর মতো তাঁকে ‘প্রণবজি’ ডাকা শুরু করেন। এবং ইউপিএ-র দু’টি পর্বেই মনমোহন যথেষ্ট সফল ভাবেই সরকারের এবং দেশের নেতা হয়েছিলেন। কখনও রাজনৈতিক নেতা বা দলনেতা না হয়েও সেটা সম্ভব হয়েছিল এক দিকে দলনেত্রীর সমর্থন ও অন্য দিকে প্রণববাবুর মতো নির্ভরযোগ্য নাম্বার টু-র একনিষ্ঠ সহযোগিতার ফলেই। না হলে পরমাণু চুক্তি নিয়ে বামেদের তোলা বিতর্কের চৌকাঠেই মুখ থুবড়ে পড়ত সরকার। লাগাতার দশ বছরের সরকারে প্রথমে বাম ও পরে তৃণমূলের দু’টি বিপরীতমুখী প্রবাহের সঙ্গে পা মিলিয়ে চলার সুকঠিন কাজটি অনায়াসে করেছেন প্রণববাবু।

প্রথম এনডিএ জমানায় গঙ্গা-যমুনার পাড়ে তো বটেই, এমনকি এক দিকে বিপাশা থেকে ঝিলম আর অন্য দিকে নর্মদা-কৃষ্ণা-কাবেরী-গোদাবরীর তীর পর্যন্ত ছড়িয়েছিল প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর জনপ্রিয়তা। তাঁর গ্রহণযোগ্যতা সংঘ পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে স্পর্শ করেছিল করুণানিধি, জয়ললিতা, চন্দ্রবাবু, এমনকি ফারুক আবদুল্লাকেও। বাজপেয়ী-লাইনে এসেই বিজেপি তাদের গতিপথ পরিবর্তন করে কোয়ালিশনের রাস্তা ধরেছিল। সেই রাস্তায় হেঁটেই ছ’ বছর সাউথ ব্লকে ছিলেন অটলবিহারী। বিগত শতকের শেষ দু’ বছর থেকে নতুন সহস্রাব্দের প্রথম চার বছর কংগ্রেস মগ্ন ছিল মন্থনে। সদ্য নেতৃত্বে এসেই সনিয়া পুরোনো ভাবনাচিন্তা সরিয়ে রেখে ধাপে ধাপে আত্মসমীক্ষা করা শুরু করেন। দলের প্রাচীন প্রহরীদের সবাইকেই সঙ্গে নিয়ে চলার প্রক্রিয়ায় প্রণবের পরামর্শকে বিশেষ স্থান দেন। রাজনৈতিক সচিব হিসেবে আহমেদ পটেল আসার পর প্রণববাবুর সঙ্গে সমন্বয় আরও পোক্ত হয়। কংগ্রেসের ভেতরে বাইরে দু’টি সমান্তরাল স্রোতের উৎস থেকে উৎসারিত অ্যাজেন্ডাকে অবলম্বন করে এগোতে থাকে ইউপিএ। কংগ্রেসের ভেতরের উৎসে ছিলেন অবশ্যই প্রণব। বাজপেয়ীর কোয়ালিশনের তত্ত্ব, বিশেষ করে বড়ো দলের হাতে নেতৃত্ব ধরে রাখার বিষয় ও রাজনীতির রসায়নে সরকারের স্থিতিশীলতা সুনিশ্চিত করার কৌশল পছন্দ ছিল প্রণববাবুর মতো বেশ কিছু কংগ্রেসি নেতার। সেই সঙ্গে প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর কেন্দ্রে একদলীয় সরকার চালানোর পর কংগ্রেস সমান্তরাল ধারার প্রভাবে জারিত হয়ে কোয়ালিশন ধর্ম গ্রহণ করল। নিজের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এ ভাবে নানা মোড় থেকেই নিত্যনতুন আহরণে সমৃদ্ধ হয়েছে প্রণববাবুর। উপকৃত হয়েছে তাঁর দল ও দলের রাজনীতি। পেছনে পড়ে থেকেছে আশির দশকের শেষ ভাগের রাজনৈতিক হারাকিরি।

rajiv gandhi and pranab mukhopadhyay
প্রণববাবুর সিঙ্গে রাজীব গান্ধী।

আজ যাঁরা প্রণববাবুর ভুল ধরছেন তাঁরা কিন্তু সে দিন আরএসএসকে নিয়ে ছুঁৎমার্গের প্রসঙ্গ তোলেননি। ইন্দিরা জমানার কথা ছেড়ে দিলেও তার পরবর্তী সময়েও সংঘের সঙ্গে যোগাযোগ যথেষ্টই ছিল সরকারের উচ্চতম স্তরের। ভাওরাও দেওরসের সঙ্গে খোদ প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীই যোগাযোগ রেখে চলতেন। ইন্দিরার মৃত্যুর পর ৪১০টি আসন নিয়ে রাজীব যখন কেন্দ্রে সরকার গড়লেন তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ স্মরণ করলেই বোঝা যাবে কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী ও সভাপতির সর্বময় কর্তৃত্বের আসনে বসে তিনি কী কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই নয়া জমানায় প্রণব মুখোপাধ্যায় বা গনিখান চৌধুরীদের মতো ইন্দিরা-অনুগতরা ছিলেন কোণঠাসা। শেষ পর্যন্ত প্রণববাবুকে বহিষ্কৃতও হতে হয়েছিল দল থেকে। যদিও রাজীব জমানাতেই প্রণববাবুর কংগ্রেসে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসনের সূচনা হয়েছিল। কিন্তু তার আগেই অযোধ্যার বিতর্কিত ইমারতের তালা খোলা ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের উদ্যোগে রামমন্দিরের শিলান্যাসে সরকারের অনুমোদনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। শিলান্যাসস্থলে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বুটা সিংকে হাজির রাখা হয়েছিল কংগ্রেস ও তার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারকে ‘রামভক্ত’ প্রমাণ করতে। হিন্দি বলয়ের নবদিগন্তে সেই প্রথম সংঘের নেতৃত্বে বিজেপির সংগঠনের বিস্তার শুরু। আডবাণীর সিউডো-সেকুলারিজম বা ছদ্ম-ধর্মনিরপেক্ষতার তত্ত্ব কংগ্রেসকে বেকায়দায় ফেলছে। সে সময়েই শিলান্যাস নিয়ে দলের ভেতরে আলোড়ন সৃষ্টি হল। বফর্স আর ফেয়ারফ্যাক্স নিয়ে তার আগে থেকেই কালো মেঘের ঘনঘটা ছিল কংগ্রেসের আকাশে। ৪১০-এর সরকার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল ’৮৯-এর নির্বাচনে। কংগ্রেসের বিদ্রোহী বিশ্বনাথপ্রতাপ প্রধানমন্ত্রী হলেন বিচিত্র সমীকরণে। সরকারের দু’টি স্তম্ভের একটি ছিল বিজেপি ও অন্যটি বামেরা। রামরথযাত্রা কার্যকর করে বিজেপি প্রত্যাহার করল সরকারকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত। এবং সেই সরকার ফেলতে রাজীব কিন্তু বিজেপিকে অচ্ছুৎ মনে করেননি।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here