পাপিয়া মিত্র

ছোটোবেলায় বাড়িতে দেওয়া ব্রত-আলপনা কেমন করে যেন মন জুড়ে ফেলল। অদ্ভুত একটা টান অনুভব করতেন। সেই টান নিয়ে এল একবারে কবির থানে, শান্তিনিকেতনে। আর সেই চোখ জুড়োনো মন ভোলানো আলপনা জড়িয়ে রইল সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের পুরো কর্মজীবনটাই।

সময় ১৯৭৫, ন্যাশনাল স্কলারশিপ নিয়ে প্রথম পা দেওয়া শান্তিনিকেতনের কলাভবনে। ছাতিমতলায় দেওয়া সেই আলপনার আকর্ষণ থেকে আর সরে আসতে পারলেন না সুধীরঞ্জন।

সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায়।

মাটিতে দেওয়া ব্রত-আলপনা যা পুজোপাব্বনে মা-দিদিরা দিতেন, সেই আঙুল ঘুরিয়ে, চালগুঁড়োতে তুলো ডুবিয়ে নকশা-তোলা বালককে টেনে নিয়ে গিয়েছিল চন্দননগরের কুমোরপাড়ায়। সেখানে জগদ্ধাত্রী পুজোর কাপড়ের কাজ, শোলার গয়নার নানা কৌশল মনকে ডুবিয়ে রাখত সারাক্ষণ। আর পাঁচ জন বালকের মতো লেখাপড়ার পাশাপাশি আঁকার স্কুলে ভর্তি হওয়া ও মনের ইচ্ছেয় এঁকে যাওয়া চলল। প্রতিমার গয়নার নানা নকশা আর আলপনার ফুল-লতা-পাতায় হরেক বৈচিত্র্য খুঁজে বেড়ানোর চাবিকাঠি পাওয়া গেল শান্তিনিকেতনে পড়তে এসে। সেই সব কল্কা যেন মিশেছিল বিশ্বভারতীর হাওয়ায়।

শান্তিনিকেতনের কলাভবন মানে নন্দলাল বসু। আধুনিক ভারতের প্রাচীরচিত্র পুনরুজ্জীবনে নেতৃত্ব দেন নন্দলাল বসু। এবং নিজেও কিছু স্থানে প্রাচীরচিত্র অঙ্কন করেন। তিনি ছিলেন এক জন বড় অনুপ্রেরণাদায়ক শিক্ষক। ভারতের সমকালীন শিল্পজগতে তিনি সর্বজনগ্রাহ্য মাস্টারমশাই নামে খ্যাতি লাভ করেন। ওঁর মেয়ে গৌরীদি (গৌরী ভঞ্জ) খুব ভালো আলপনা দিতেন। সঙ্গে থাকতেন যমুনা সেন, ওঁদের কাজ ছিল হৃদয়স্পর্শী। এই দু’জন শিল্পী সেই সময়ে আলপনা, বাটিক, ফুলের সাজে শান্তিনিকেতনী ধারাকে অনেকখানি এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।

আলপনা, সুধীরঞ্জনের সৃষ্টি।

নন্দলাল বসুর আগে ক্ষিতিমোহন সেনের স্ত্রী কিরণবালাদেবী প্রথম আলপনা দেন শান্তিনিকেতনে। তাঁর কথা শুনে সুকুমারী ভট্টাচার্য নামে এক গ্রামীণ মহিলাকে রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আসেন আলপনা দেওয়ার জন্য। শান্তিনিকেতনে ছিল নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনার রীতি। লোকজ লতা-পাতা-পদ্মফুলের দৃশ্যপট পালটে যেতে লাগল। শান্তিনিকেতনের নিজস্ব ভাবনায় টান গড়িয়ে চলল। নন্দলাল বসুর সময় থেকে আলপনায় দ্রুত পরিবর্তন এল। কারণ তিনি ছিলেন মননে-শিক্ষায় শিল্পী। সেখানে প্রকৃতি দু’ভাগ হয়ে গেল।

“শান্তিনিকেতনে শিক্ষক হিসেবে পাই দিনকর কৌশিক মশাইকে। উনি ছিলেন নন্দলাল বসুর ছাত্র। ওঁর কাছে কোনো ডিজাইন শিক্ষা করিনি, কিন্তু উনি আমাকে খুব ভালো করে প্রকৃতিকে চিনিয়েছিলেন। নন্দলাল বসুর পোস্টকার্ডে আঁকা ছবি দেখিয়ে উৎসাহ দিতেন তিনি” — বলছিলেন সুধীরঞ্জন।

কাঠঠোকরা, সুধীরঞ্জনের সৃষ্টি।

পেন্টিং-এর ছাত্র হিসেবে খুব সাধারণ ভাবে পাশ্চাত্যের দিকে একটা ঝোঁক ছিল। নানা দেশের কাজ, তাদের শিল্পকর্ম ইত্যাদি বিষয়ে জানার আগ্রহ গড়ে উঠছিল। সিলেবাসের বোঝা শেষ করে রবীন্দ্রভারতী থেকে মাস্টার ডিগ্রি নিয়ে আবার ফিরে আসা শান্তিনিকেতনে। কর্মস্থান হল বিশ্বভারতীর শিক্ষাসত্র ও পাঠভবনের অঙ্কনশিক্ষক হিসেবে।

দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তাই তিনি আলপনাকে ভালোবেসে ফেলেছেন। বর্ষশেষে অঙ্কিত হয় সাদা আলপনা, বর্ষবরণের আলপনায় থাকে রঙের বর্ণাঢ্য। এখানেও কিছু প্রচলিত ধারা আছে। যেমন বাংলা বর্ষশেষের অনুষ্ঠান সন্ধেবেলায় শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আলপনা রঙিন হয়ে ওঠে পরের দিন নববর্ষ বা বর্ষবরণের জন্য। এ ছাড়া মহর্ষি দিবস, ২২শে শ্রাব্ণ, ৮ই পৌষ উপলক্ষে খৃস্টমেলা উপাসনা মন্দিরে, পৌষমেলার জন্য আম্রকুঞ্জে, ও নানা উৎসবে ছাতিমতলায়, আলপনা দেওয়ার রীতি আছে।

তবে একটা সময় ছিল যখন বসন্তোৎসবে একটি বড়ো বৃত্তাকারের মধ্যে কবিগুরু বসে আছেন, সেখানে আলপনা, সামনে রঙের নৈবেদ্য, তুলসীমঞ্চ, পলাশের ডাল, পলাশ ফুল রাখা। সেই সব ঘিরে চলেছে নাচ আর গান। এখন লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগমে তা আজ কেবল স্মৃতি।

এর মধ্যে সুধীরঞ্জনের কাজ মর্যাদা পেয়েছে গীতাঞ্জলির শতবর্ষের মঞ্চসজ্জা, শৈবাল মিত্রের ‘শজারুর কাঁটা’র অঙ্কনসজ্জা, লন্ডনের রবীন্দ্রসঙ্গীত ও নাচের অনুষ্ঠানের মঞ্চসজ্জা, ‘উত্তরপাড়া জীবনস্মৃতি ডিজিট্যাল আর্কাইভ’-এর কর্মশালায়।

আলপনার কারিগর সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায় সম্প্রতি অবসর নিয়েছেন নিয়মমাফিক কর্মজীবন থেকে। প্রকৃত কর্মজীবন থেকে তো ছুটি হয় না। তাই তো কর্মশালা ও জীবন্ত অঙ্কনশৈলীর জন্য এ বার যাত্রা নিউজার্সি ও বস্টন।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here