united opposition in karnatakaa
দেবারুণ রায়

হিন্দি বলয়ের মুখ উত্তরপ্রদেশ-বিহারের উপনির্বাচনী ফলাফল যে বদলের সংকেত দিচ্ছে তা কিন্তু নতুন কোনো ঘটনা নয়। বিহার তো বটেই, উত্তরপ্রদেশও এই বাস্তবতাকেই বুকে নিয়ে স্বাতন্ত্র্য ঘোষণা করেছে বার বার। কিন্তু বিহার যা পেরেছে, বৃহত্তম রাজ্য তা পারেনি। কারণ এই দুই রাজ্যের বাস্তব পরিস্থিতি সব সময় এক রকম ছিল না। উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যাতেই বিজেপির মতাদর্শের বীজ প্রথম অঙ্কুরিত হয়ে চারাগাছ থেকে মহীরুহের আকার নিয়েছে। সারা দেশের ২৩টি রাজ্যে শাখাপ্রশাখা ছড়িয়েছে। যদিও রামমন্দির আন্দোলনের উষালগ্নে অযোধ্যার লোকসভা কেন্দ্র ফৈজাবাদ থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন হিন্দি বলয়ের একরত্তি দল সিপিআইয়ের মিত্রসেন যাদব। বাম দিয়ে কিন্তু রামকে রোখা যায়নি। মণ্ডল রাজনীতিই তখন রুখেছিল কমণ্ডলকে। এবং সেই বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিয়েছিল বিজেপি। তারা রাজনৈতিক বা গণআন্দোলন পরিচালনায় মতাদর্শকে মাস্তুল করে চললেও নির্বাচনী লড়াইয়ের রণনীতি ছকেছিল মণ্ডল রাজনীতির সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংকে ভিত্তি করে – রাজনীতির মোক্ষম চাল ‘মারি অরি পারি যে কৌশলে’। এ জন্যই ব্রাহ্মণ মুরলীমনোহর (জোশী), কলরাজ (মিশ্র) বা কেশরীনাথরা (ত্রিপাঠী) এবং ঠাকুর রাজনাথ (সিংহ) ও বৈশ্য লালজিরা (ট্যান্ডন) নেতৃত্বে থাকলেও উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী করা হল অনগ্রসর লোধ রাজপুত সম্প্রদায়ের কল্যাণ সিংকে। সংঘ থেকে বিজেপিতে আসা কে এন গোবিন্দাচার্য ছিলেন এই রণনীতির মূলে। যার রূপায়ণ হল তখন দলের সর্বোচ্চ নেতা লালকৃষ্ণ আডবাণীর হাতে।

আগাগোড়া হিন্দি বলয়টাই তখন বদলে যাওয়া ভারতের রাজনীতির পরিবর্তিত সমীকরণের কথা বলছে। সেই আলোড়নপর্বে বৃহত্তম দল কংগ্রেসকে হিন্দি হৃদয় থেকে মুছে দিয়ে এক ধরনের শ্রেণিভিত্তিক মেরুকরণকেই প্রতিষ্ঠিত করল ভারতের জাগ্রত জনতা। এই মেরুকরণের রংটা অনেকটাই ধর্মীয় বলে মনে হলেও আসলে তার ভিতরে নিহিত ছিল শ্রেণি। যাকে ‘জাতপাত’ বলে নাক সিঁটকোলেন আগমার্কা বামপন্থী ও কংগ্রেসিরা। সেই সঙ্গে মতাদর্শগত ভাবে যাঁরা হিন্দুত্ববাদী তাঁরা বললেন, হিন্দু জাতীয়তাবাদের স্বার্থে এই দলিত-অনগ্রসর-সংখালঘুদের তৃতীয় শিবিরকে রুখতে হবে। দরকারে ওদের অস্ত্রেই ওদের ঠেকাতে হবে। না হলে হিন্দুদের মধ্যে জাতপাতের বিভাজনে হিন্দুরাষ্ট্র গড়ার কাজ আরও অনন্তকাল পিছিয়ে যাবে। বিজেপি নেতারা এ দিকে তাকিয়েই ভারতে দ্বিদলীয় শাসনব্যবস্থার সুপারিশ করলেন। যাতে মেরুকরণ স্পষ্ট হল। তৃতীয় শক্তি থাকলেই মানুষের ম্যানডেট অস্পষ্ট হয়, আইনসভার আকৃতি হয় ত্রিশঙ্কু। যদিও দলে মতান্তর থাকলই। কারণ, কংগ্রেস অতীতে ৩৫% ভোট পেয়েও দেশ শাসন করেছে দেশে দ্বিদলীয় শাসনব্যবস্থার না থাকার দরুন। এবং তখন বিজেপিরও কেউ কেউ বলেছিলেন, “ভবিষ্যতে আমরাও যখন কেন্দ্রে শাসন করব তখন তৃতীয় শক্তি আমাদেরও কাজে লাগতে পারে কঠিন রাজ্যগুলিতে।” এ বারে কর্নাটকের ফলাফল এ ভাবেই বিজেপির সুরাহা করেছিল। কিন্তু বিরোধীদের বোধোদয়ের ফলে, বিশেষ করে কংগ্রেস অহমিকা বিসর্জন দেওয়ায় দেবগৌড়ার ভারত শাসনপর্বের ইতিহাস ফিরে এল কর্নাটকে।

yogi adityanathতারও আগে বিরোধীদের বোধোদয়ের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে বিজেপির গোরখপুর দুর্গের উপনির্বাচনে (লোকসভার) যেখানে মোহন্ত আদিত্যনাথের পরম্পরাগত একাধিপত্যকে রুখে দিয়েছিল সপা-বসপার অঘোষিত সমঝোতা। পাশাপাশিই ছিল একদা কংগ্রেসের পরম্পরাগত প্রভাবের কেন্দ্র ফুলপুর। যেখান থেকে নেহরু জিততেন লোকসভায়। অবশ্য ফুলপুর গোরখপুরের মতো দুর্গ নয়। সেখানে সমাজবাদীরা আগেও বার বার জিতেছে। কিন্তু ২০১৪-য় যে দল উত্তরপ্রদেশের ৭৩টি আসন জিতেছিল মোদী-শাহের নবনির্মাণে, সেই দলেরই উত্তরপ্রদেশের মুখ, আগামী দিনের সমগ্র ভারতে হিন্দুদের নেতা হিসাবে তুলে আনা যুবক সন্ন্যাসী তাঁরই নিজের পাঁচবার জেতা লোকসভা কেন্দ্রে হেরে গেলেন রাজনীতিতে কার্যত সর্বহারা সপা-বসপার কাছে। তা ছাড়া যখন গোরখপুরে আদিত্যনাথের মনোনীত প্রার্থী হারলেন তখন আদিত্যনাথই উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী। এবং ২০১৪-য় বিজেপির ৭৩-এর পাশে সপার সংখ্যা ছিল ৫ এবং বসপার শূন্য। শূন্য থেকে পূর্ণ হয়ে ওঠার কারণ ছিল বিরোধী ঐক্যের মূল কাঁটা মুলায়মের নখদন্তহীন হয়ে যাওয়া ও যদুবংশ স্বহস্তে ধ্বংস করে বিজেপিকে ক্ষমতায় ফেরানোর শেষ অস্ত্রটি নিঃশেষ করে ফেলা। মুলায়মের হাতে আর কোনো অস্ত্র নেই। এমন পরিস্থিতিতে অখিলেশ ও মায়াবতী অস্তিত্বের সংকটকালে অহংকার বিসর্জন দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।

nitish kumarবিহার বিরোধীদের পথ দেখিয়েছে অনেক আগেই। সেখানে তৃতীয় শক্তিই হয়ে উঠেছে প্রথম শক্তি। যা অবশ্যই লালুপ্রসাদের একঘরে হয়ে পড়ার লগ্নে। কংগ্রেসের রাহুল মায়ের লাইন বিসর্জন দিয়ে উচ্চবর্ণের রাজনীতিতে বিজেপির সঙ্গে পাল্লা দিতে চান। লোকসভায় সনিয়ার পথনির্দেশে আসা মনমোহনের বিল ছিঁড়ে ফেলে ক’দিন মিডিয়ায় হাততালি কুড়োন। কিন্তু কালে কালে বোঝেন, ওই হাততালিতেও বিহারে তাঁর হাত ধরতে নারাজ ব্রাহ্মণ, ভূমিহার কায়স্থ বা রাজপুত। সেই সঙ্গে যাদব-মুসলমান তো ‘হাত’কে কার্যত অস্পৃশ্যই ঘোষণা করেছে। আর যার সঙ্গে এরাই নেই, সেই দুর্বলের হাত’ ধরে দলিত কী করবে? সুতরাং চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ার খেলাশেষে রাহুল তখনকার পরিবর্তিত নীতীশের পিছু পিছু লাইন দেন লালুর বৈঠকখানায়। ফলে অঙ্কটা এমনই জম্পেশ দাঁড়ায় যে সারা ভারতে এমনকি উত্তরপ্রদেশেও মোদী-শাহর রথ অবাধে রামরাজ্যের লক্ষ্যে এগোলেও বিহারে নিরঙ্কুশ হওয়ার সাধ পূর্ণ হল না। লালু বিপাকে পড়ে বুঝেছিলেন, অহংকার ত্যাগ না করলে ধর্মত্যাগও করতে হবে এবং নির্বাসনও রোখা যাবে না। সুতরাং স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়। রাবড়ী বা তেজস্বীকে নয়, নেতা মানলেন নীতীশকেই। তাতে লাভ হল একটাই যে, যখন নীতীশ অনিবার্য ভাবে লালুকে ছেড়ে বিহারের মোদীর (সুশীল) হাত ধরছেন তখন মানুষের কাছে বার্তাও পৌছোল তীব্র মেরুকরণের। নীতীশকে কেন্দ্র করে উচ্চবর্ণ এবং নিম্নবর্ণ ও সংখ্যালঘুদের মেরুকরণ সম্পূর্ণ হল। নুনের কাজ করল কংগ্রেস। কিছু উচ্চবর্ণ ও বুদ্ধিজীবী গোত্রের মানুষ থাকলেন আগামীর জোটে। বিহারে বিজেপির স্বপ্ন আরও অধরা হয়ে যাওয়ায় মেরুকরণের ভূত দেখতে শুরু করেছেন তাদের নেতা নীতীশ। কিন্তু এখন বিজেপির কাছেও তাঁর খুব একটা দাম নেই। কারণ তিনি সংখ্যালঘু আর মুসলমান সমর্থন হারিয়ে উচ্চবর্ণের আশীর্বাদেই টিকে আছেন। এটুকু বাঁচিয়ে রাখতে তাঁর বিজেপিকেই চাই। (চলবে)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here