brigade show
ব্রিগেডের মঞ্চে বিরোধী নেতারা। ছবি রাজীব বসু।
debarun roy
দেবারুণ রায়

শনিবারের বেলা কিন্তু মোদীভাইয়ের জন্যে বারবেলাই হয়ে উঠল। বারবেলায় ব্রিগেডে আসেননি রাহুল গান্ধী। ওঁর দিক থেকে তার যুক্তি ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক শোভনতা রক্ষা করেছেন। বিজেপির হর্ষবর্ধন করেননি। ধর্মনিরপেক্ষ রামধনু জোটের লাজরক্ষার পাশাপাশি রাজনীতির রস অর্থাৎ কূটনীতিক কলার স্বাক্ষরও রেখেছেন কংগ্রেসের সভাপতি এবং ভবিষ্যত প্রধানমন্ত্রীর মৌল হিসেবে। প্রতিনিধি মল্লিকার্জুন খড়্গে কোনো ফ‍্যালনা নেতা নন। সংখ্যার অভাবে কংগ্রেস লোকসভায় বিরোধী দলনেতা পদের দাবিদার ছিল না বলেই রাহুলকে ওই দায়িত্ব দেয়নি হাইকম‍্যান্ড। সংখ্যার কারণেই অগত্যা মল্লিকার্জুন। পদাধিকার বলে খড়্গে বিভিন্ন সরকারি ও সাংবিধানিক কমিটিতেও কংগ্রেসের মূল প্রতিনিধি। যেমন সিবিআই অধিকর্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে। এ ছাড়া, সমাবেশের আগের দিন উদ্যোক্তা মুখ‍্যমন্ত্রীকে সৌজন্যের চিঠিও লিখেছেন। সমাবেশের সাফল্য কামনায়। এর ওপর কংগ্রেসের  ও বিরোধীদের সর্বজনশ্রদ্ধেয়া জননেত্রী সনিয়া গান্ধী খড়্গের হাতে তুলে দিয়েছেন ব্রিগেডের বিপুল সমাবেশের উদ্দেশে তাঁর আহ্বান, যাতে বিজেপির বিকল্প মহাজোটকে স্থির লক্ষ্যে এগিয়ে চলার কথা বলা হয়েছে। উল্লেখ্য, বিগত দিনে সংসদভবনে কংগ্রেসের ডাকা বৈঠকে মমতা বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ও প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন। এবং তাতে কিন্তু মহাভারত অশুদ্ধ হয়নি। এটা মোর্চা রাজনীতির পরিচিত পথ ও অঙ্গসঞ্চালন। এতে যে আখেরে সমস্যা হয় না তার প্রমাণও দিচ্ছে ইতিহাস।

আরও পড়ুন ব্রিগেডের মেগা-শো: ‘অনেক হয়েছে অচ্ছে দিন, বিজেপিকে বাদ দিন’

তবে ব্রিগেডে সশরীরে না থেকেও রাহুল যে পুরো মাত্রায় হাজির ছিলেন ইস‍্যুতে, তার বেশ জোরালো প্রমাণ মিলল। তাঁর দেওয়া “চৌকিদার চোর হ‍্যায়” স্লোগানটি যে এ বারের নির্বাচনের মূল ইস‍্যু ও স্লোগান হিসেবে ক্লিক করেছে, তার প্রমাণ দিলেন একে একে হার্দিক পটেল, শত্রুঘ্ন সিনহা, তেজস্বী যাদব এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় – সম্ভাব্য মহাজোটের সব চেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ চার সদস্য, যাঁরা না থাকলে এই জোট অনেকটাই নখদন্তহীন। তা ছাড়া রাফালের কথা তুলেছেন প্রায় প্রত‍্যেকেই – কংগ্রেসের খড়্গে থেকে খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিশেষ করে নেতার সুরে সুর মিলিয়ে রাফালের টানে টানে আম্বানি- আদানিদের ধুয়ে দিয়েছেন খড়্গে, তাতে মনমোহনী কংগ্রেসের ঘরানা বদলের সংকেত স্পষ্ট। উলটো দিকে, যে “পার্টি উইথ আ ডিফারেন্স”-এর সোনার পাথরবাটির গল্প শুনিয়েছিলেন আডবাণী, সেই গল্প শোনানোর মতোও কেউ নেই মোদীশাহী বিজেপিতে। আরেক দিক থেকেও রাহুল গান্ধীর ডায়াগনোসিস কিন্তু যথার্থ প্রমাণিত। এক কথায় চমৎকার নির্ণয়। মাত্র দিন কয়েক আগেই রাহুল বলেছেন, “ওরা ভয় পেয়েছে। ক্ষমতা হারানোর ভয়।” আজ সে কথাই কি মালুম হল দেশবাসীর? কারণ, ব্রিগেড প‍্যারেড গ্রাউন্ডের সমাবেশ শেষ হতে না হতেই সমস্ত সংবাদসংস্থা, পোর্টাল, চ‍্যানেলের খবরে ভেসে উঠলেন স্বয়ং মোদী। অথচ এই সাড়ে চার বছর সাক্ষী, কাকে কান নিয়ে গেল – এমন কথা শুনে মোদী কিন্তু কাকের পেছনে ছোটার বান্দা নন। কানে হাত দিয়ে দেখে নিতেই অভ‍্যস্ত। তা ছাড়া কে না জানে, পাগলে কী না বলে, ছাগলে কী না খায়? – এই ঘটনাবহুল সাড়ে চার বছরে কোনো বিষয় নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া কদাচ দেননি প্রধানমন্ত্রী। তাঁর পাত্র-মিত্র-অমাত্যরাও বেশ রয়ে সয়ে হেক্কার দিয়েছেন। এক কথায় বলা যায়, মোদী মোটেই প্রতিক্রিয়াশীল নন। গুজরাতে থাকাকালীন নিউটনের তৃতীয় সূত্র বা কুকুর চাপা পড়ার মতো ঐতিহাসিক দু’একটি উক্তি করেছেন। কিন্তু দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দে প্রবেশের পর থেকে তিনি মূলত উত্তরে থাকেন মৌন। সংসদে বিশেষ করে। সাংবাদিক বৈঠক কদাচ করেন না। প্রয়োজনে দল বললে। কিন্তু আজ দেশবাসী কার মুখ দেখে উঠেছেন কে জানে?  কারণ, দুপুর গড়াতে না গড়াতেই টিভির পর্দায় হাজির প্রধানমন্ত্রীর জমকালো অবয়ব। দিউয়ের জনজাতি এলাকার মঞ্চে দাঁড়িয়ে ঝালর দেওয়া টুপি পরে বলছেন, “ওই মহাগঠবন্ধন শুধু মোদী নয়, দেশের মানুষকেও টার্গেট করেছে। নিজেদের ভাই-ভাতিজাদের উন্নতির স্বার্থে যারা একজোট হয়েছে, তাদের নিজেদের কুকর্ম থেকে মুক্তি নেই।” সম্ভবত এত দ্রুত প্রতিক্রিয়া মোদী এই প্রথম দিলেন। এবং তার পরই লাইন দিয়ে আসতে থাকলেন তাঁর দলের মেজো, সেজো, ছোটো বাবুরা। এলেন রবিশংকর প্রসাদ, রাজীবপ্রতাপ রুডি, এবং বঙ্গব্রিগেডিয়ার দিলীপ ঘোষ থেকে শুরু করে বাবুল সুপ্রিয় হয়ে অন্য রাহুল (সিনহা) পর্যন্ত  পারিষদবৃন্দ। প্রত‍্যেকেই ফ্রি-স্টাইল মুদ্রায় রদ্দা মেরেছেন বিরোধী নেতাদের ছায়ার উদ্দেশে। ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধু করে গাত্রে ব‍্যথা হলেও যুদ্ধ চালিয়ে যেতেই হবে। শাহী ফরমান সে রকমই। চিরকাল শাসনে আসীন কংগ্রেসকে “চামচা পার্টি” বা “মনমোহনের টু জি, সনিয়া জি, রাহুল জি” বলে অপদস্থ করে এসেছে বিজেপি। এখন মোদীশাহীর “সলতনৎ” কি মোদী কথিত কংগ্রেসি “সলতনৎ”-এর চেয়ে আলাদা মনে হয আদৌ? কংগ্রেসি পূর্বপুরুষদের নানা কীর্তির ছায়া অবলম্বনে বিজেপির সাকুল্যে সাড়ে দশ বছরের সত্তাভোগ। শুধু জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অর্জিত সম্পদের ভাগ বাকিরা সবাই নিলেও সে রসে বঞ্চিত বিজেপি। এবং একটা কথা দিলীপ ঘোষকে না বললেই নয় – আপনার দলের তিনজন বিধায়ক যে বিধানসভায় আছেন, তা মোদী জানেন কি? না হলে এক এমএলএ কা পার্টি নে নিঁদ হারাম কর দিয়া, বললেন কেন? এ ভ্রান্তি মোদীর বেমানান। এ সবই টেনশনের লক্ষ্মণ। ওঁর এ হেন প্রমাদ বেশ প্রমোদ জুগিয়েছে বিরোধী শিবিরে। দিদি কিন্তু ভুল ধরিয়ে দিয়েছেন।

আরও পড়ুন “মনের মিল না হলেও হাত ধরতেই হবে”, বিধানভবনে খাড়গের মন্তব্যে কংগ্রেসের একাংশে আশঙ্কা!

মহা গঠবন্ধনের সুর-তান-লয় কী ভাবে বাঁধতে হয়, শনিবারের ব্রিগেডে সেটা দেখিয়েছেন এ দিনের সূত্রধর মমতা। অবশ্যই দেবগৌড়া, ফারুক, পওয়ার, চন্দ্রবাবু আর যশবন্তের মতো প্রবীণ এবং তেজস্বী, হার্দিক, জিগনেশের মতো নবীনের কথার সূত্রগুলোকে এক সঙ্গে জুড়ে। জোট গড়ার ইতিহাসে জ‍্যোতিবাবু, অটলের কথাও উল্লেখ করেছেন দেবগৌড়া, ফারুক আর চন্দ্রবাবুর ছেড়ে যাওয়া অসম্পূর্ণ অর্থপূর্ণ বাক‍্যের পদপূরণ করে। ভারতে জোট রাজনীতির নায়ক বসু ও বাজপেয়ীর কথা স্মরণ করে তাঁদের দু’জনেরই ধারার মরুপথে শুকিয়ে যাওয়ার কথা সঠিক ভাবে জোট গড়ায় প্রাসঙ্গিক। বামেরা ঐতিহাসিক ভুলের কবজায় স্বেচ্ছানির্বাসনে আর বিজেপি মেরুকরণের পাকদণ্ডী বেয়ে একচ্ছত্র। অতীতের কংগ্রেসের মতোই কোয়ালিশন ধর্মের বিরোধী। যদিও এখনও এনডিএর খাতিরেই তারা সরকারে। ২৭২-এর নীচে নেমেছে বিজেপির সংখ্যা। জোটের প্রাসঙ্গিকতা, নীতি ও কর্মসূচিই যে মূল, প্রধানমন্ত্রী মনোনয়ন যে ভোটের পরের ধাপ সে কথা বলে মমতা সংবিধানের প্রতি এবং সংসদীয় ব‍্যবস্থার ওপরেও আলো ফেললেন। বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে আগাম প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করে যে সাংবিধানিক ধারাকে বিকৃত করেছে তার প্রতিকার করলেন। উদ্বেগ শুনিয়েছিলেন যাঁরা, হিটলারের জার্মানির কথা তুলে বলেছিলেন, সংবিধান বদলে দেবে ওরা এ বার ক্ষমতায় ফিরলে, সেই বার্তাকেও জুড়ে নিলেন শেষ বক্তা মমতা তাঁর সারাংশে। বললেন, হিটলার মুসোলিনি চাই না। মাঠ ময়দানের রাজনীতি বিগত চল্লিশ বছরে তাঁকে আজকের জননেত্রীর প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। একই সময়রেখায় সমকালীন রাজনীতিতে কেউ “মরা” বলতে বলতে রাম বলেছেন আর কেউ বা তলিয়ে গিয়েছেন ভিন্ন মেরুর চোরাবালিতে। শনিবারের বারবেলাই মোদীশাহীর জন্যে কালবেলা হয়ে ওঠার সংকেত। এবং  কলকাতার আকাশে রামধনু রঙের আলো। শেষ পর্যন্ত রেশ রেখে যাবে মল্লিকার্জুন খড়্গের বলা আজকের শ্রেষ্ঠ আবেদন – “দিল মিলে না মিলে হাত তো মিলাইয়ে।”

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here