rubina-chowdhuryটরোন্টোয় ‘ভায়োলেন্স এগেনস্ট উইমেন’-এর সক্রিয় কর্মী রুবিনা চৌধুরী। বর্ণবাদ নিয়ে ধারাবাহিক লিখছেন খবরঅনলাইনে।


ছুটতে হল অন্য স্বপ্নে অন্যত্র; যেমন জীবিকার জন্য ছোটে, আমি ছুটলাম এ দেশীয় সার্টিফিকেটের জন্যে, ছোটোখাটো যা-ই পাওয়া যায় মন্দ কী! উদ্দেশ্যে তো সেই একই, অন্ন জুটোনোর পালা। এ দেশের সার্টিফিকেট থাকলে সাদা কলারের চাকরি জুটবে, না থাকলে সেই হাড়ভাঙা খাটুনির নীল কলারের চাকরি করে জীবনধারণ।

পা দিলাম নতুন শহরে। জর্জ হ্যামিলটন নামের এক স্কটিশ রাজনীতিবিদের প্রতিষ্ঠিত, লেক ওন্টারিওর শেষ প্রান্তে গড়ে ওঠা, প্রদেশের বন্দরনগরী হ্যামিলটনে। নায়াগ্রা বা অন্য কোনও অঞ্চলে আসা-যাওয়ার পথে হেমন্তে রানির মতো দেখাত হ্যামিলটন, ওন্টারিও প্রদেশের তৃতীয় বৃহত্তর শহর।

হ্যামিলটনের মোহাক কলেজে ভর্তি হলাম সোস্যাল সার্ভিসে ডিপ্লোমা করার জন্য। এ ক্ষেত্রে এই শহরের একটি পরিচিতি আছে। এক সময়কার কারখানা অধ্যুষিত শহর এটি, এসেছিল নানা দেশ থেকে কর্মীরা।কালে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এটি এখন এই প্রদেশের দরিদ্রতম শহর। সুতরাং সেবাসংস্থানও এই শহরে জোরদার। প্রথম যে দিন ভর্তির জন্য গিয়েছিলাম, প্রশান্তিতে হেঁটেছিলাম টানা বারো বছর গুয়েল্ফে আবদ্ধ থাকার পর। ধনতান্ত্রিক দেশগুলোর সজ্জার নিয়ম আমাদের দেশের চাইতে ভিন্ন। কয়েকটি বড় শহরে গমগম করবে বিজাতীয় মৌমাছিরা ডলার-মধুর খোঁজে, ঠিক তার পাশেই সাজানো গোছানো ছিমছাম নিরিবিলি শহর থাকবে একটি করে, মালিকশ্রেণির বসবাসের জন্য, সেখানকার শিক্ষাব্যবস্থা হবে উচ্চমানের। যেমন হ্যামিলটনের পাশে গড়ে ওঠা মধ্য এবং উচ্চবিত্তের শহর বার্লিংটন এবং কিচেনার, ব্রেডফোর্ড, কেমব্রিজ শহরের পাশে তেমন গুয়েল্ফ। বলা বাহুল্য, এ সব শহরের অধিকাংশ বাসিন্দা মধ্যবিত্ত অ্যাংলোস্যাক্সন সম্প্রদায়। এগুলো ধনতন্ত্রের শৃঙ্খলাবদ্ধ নির্যাতন; যা চোখে দেখা যায়, অনুভব করা যায়, বলা যায় না। গুয়েল্ফে তা-ও কিছু রঙিন মানুষ চোখে পড়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কারণে। অনেকেই পড়তে যায় ওই শহরে। আমার পরিবারও ১৯৯৮ থেকে সেই উদ্দেশ্যের বেড়াজালে আটকে পড়েছিল।

এই নতুন শহরে পা রেখে মনে হল আমার মুক্তিস্থান। প্রথম দিন রাস্তায় নেমেই নানা ভাষা কানে এল, কলেজে পা রেখেই প্রথম যার সাথে দেখা হল, সে এক জন শারীরিক প্রতিবন্ধী এবং কলেজের কর্মী। সারা শহরে গ্রীষ্মে সাজানো হয়েছে ফুলের সাথে সাথে নানা সবজিতে, গৃহহীন মানুষদের জন্য। জেনে গেলাম, এই আমার চাওয়া, সঠিক পথে পা রেখেছি বহু দিন নিজেকে হারিয়ে ফেলা গোলকধাঁধা থেকে বের হয়ে।

এ দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বর্ষ শুরু হয় সেপ্টেম্বর মাস থেকে। প্রথম দিন ক্লাসে গেলাম। এই বয়সে আমাদের দেশে তো কেউ পড়তে যায় না। তা ছাড়া আমি বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ পার হয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আর ওই মুখো হব না। দেখলাম, আমার মতো বয়সের, এমনকি আমার চাইতে আরও বয়স্ক এবং তারা এ দেশেরই, এক এক করে ঢুকছে। পাশেই এসে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বসল একটা কমবয়সি কালো মেয়ে, এর পর কাছেই বসল এক কালো, আমার বয়সের কাছাকাছি একজন এবং এক মার্জিত কালো পুরুষকেও দেখতে পেলাম। এই প্রথম কালো সম্প্রদায়ের সাথে পথ চলা আমার।

প্রতি দিন এর পর থেকে হাতেকলমে নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রশিক্ষণের পালা। আলোচনা চলেছে, উঠেছে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা। দীর্ঘ বারো বছরে আমাকেও তো কম সহ্য করতে হয়নি! বিশেষ করে যে শহরে বাস করতে হয়েছে। জানলাম এ দেশের মিডিয়া, পুলিশি এবং সবার উপরে প্রশাসনিক বর্ণবাদ। বলতে তো আর বাকি থাকে না যে কানাডার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের প্রসঙ্গ অনেক ক্ষেত্রেই উঠে আসে।

আকস্মিক এক ঘটনা ঘটল। আমার অত্যন্ত প্রিয় এক সহপাঠিনীর দুঃসংবাদ পেলাম এক সন্ধ্যায়। ক্লাসের একটি পেজ ছিল ফেসবুকে (এখনও আছে)। সেখানেই জানতে পারলাম, তার ছোট ভাই স্কুলে যাওয়ার পথে রাস্তার গোলাগুলিতে মারা গেছে। সকালে ক্লাসে সবার মন খারাপ। গত মাসেও কথা হল ওর সাথে, এখনও মামলা চলছে। গত ছয় বছরেও কোনও বিচার পেল না একটি কালো পরিবার। আসামি তিন জন সাদা চামড়ার। এক জন কালো স্কুল বালক আর তার পরিবারের কীই-বা মূল্য থাকতে পারে! কিছু দিন পর থেকে ও নিয়মিত ক্লাসে আসত, কিন্তু সেই হাসিটা মিলিয়ে গিয়েছিল।
এ বার সেই মিষ্টি সুন্দরী মেয়েটির গল্প বলি। ক্লাসে সবাইকে বলা ওর মুখের ভাষ্য, ওর বাবা কালো, মা সাদা। ও দুইয়ের মিশ্রণ যতটা পেয়েছে, ওর ভাই ততটা নয়। সে নাকি বাবার অংশ বেশি পেয়েছে। সতেরো বছরের তরুণ নতুন ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়ে মায়ের গাড়ি নিয়ে বাইরে গিয়েছিল। পুলিশ ওকে দাঁড় করায়, লাইসেন্স দেখতে চাওয়ায়, দেখায় (সদ্য প্রাপ্ত, উৎসাহের সাথেই দেখায়), গাড়ির কাগজপত্র দেখতে চাইলে দেখাতে পারেনি, কারণ ও খুঁজে পায়নি। ওকে নাকি গ্রেফতার করা হয়। মাকে ফোন করে জানায় পুলিশ, ওদের মা হাজিরা দেয়, জানতে চায় ওকে কেন দাঁড় করানো হয়েছিল, স্পিড যদি বেশি না থাকে আর ও যখন ওর লাইসেন্স দেখাতে পেরেছে তা হলে কোন যুক্তিতে ওকে অ্যারেস্ট করা হল! কোনও উত্তর নাকি ছিল না পুলিস কর্মকর্তার কাছে, ক্ষমাও চেয়েছে ওর মায়ের কাছে। শুধু কী তা-ই? প্রথম দেখেই নাকি হাই হ্যালো পর্ব সেরে জানতে চেয়েছে অবাক ভঙ্গিতে ‘ও তোমার ছেলে?’ যেন, কালো বর্ণ মানেই হলো অপরাধের দলিলনামা। যা খুশি করতে পারে প্রশাসন।

এ সব শুনে মনে হতো, তা হলে কি প্রতিটি কালো পরিবারেই এমন কোনও নির্যাতনের গল্প লেখা হয়? বাৎসরিক নিয়মে নির্ধারিত? (চলবে)

ছবি: সৌজন্যে গুগুল

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here