ছোটন দত্ত গুপ্ত

ফিজিক্স পড়ার ফলে কি ছবির ফর্মে তার প্রভাব পড়েছে? ছবিগুলোর বিষয় যদিও সামাজিক সমস্যাকে মান্যতা দিয়েই। মৃণাল সেন নিজেই বলতেন, সামাজিক জীব হিসেবে সামাজিক ঘটনা আমাকে সকলের মতো নাড়া দেয়। অথচ, মৃণাল সেনের ওপর বাংলার সমাজতন্ত্রীরা অনেকেই হয়ত বিরক্ত, অনেকক্ষেত্রেই তাদের আশাভঙ্গের জন্য। রাজনৈতিক মানুষ জানে ছবি দিয়ে সমাজ পাল্টায় না তবুও মনের অজান্তেই ছবি-পরিচালকের কাছে সেই প্রত্যাশা করতে থাকে। মৃণাল সেনের কাজের জন্যই। সমাজতন্ত্রীরা ছবির মধ্যে আরও গভীরভাবে দেখতে চায় রাষ্ট্রের চরিত্র, হতাশ হয়, পরিচালক সমালোচনার মধ্যে পড়েন। তখনি মৃণাল সেন বলে ওঠেন, আমি প্রাইভেট মার্কসিস্ট। আর শিল্পীরা কেউ কেউ বলেন ওটা রাজনৈতিক ছবি। দুটো বিষয়ই মৃণাল মাথায় রেখে তার ছবি নিয়ে কাটাছেঁড়া করেছেন সমাজ দর্শনের ওপর।

‘বাইশে শ্রাবণ’(১৯৬০)থেকেই মৃণাল সেনকে ছবির সত্যকার মনের দর্শক চিনে নিল। স্টিফেনসন ও ডেব্রিক্স – এর ‘সিনেমা অ্যাজ আর্ট’ গ্রন্থে ‘বাইশে শ্রাবণের ওপর লেখার ফলে চলচ্চিত্রস্রষ্টা শিল্পী হিসেবে মৃণাল সেন জায়গা দখল করেছিলেন আন্তর্জাতিক গুণী মহলে। মাত্র দুই দশক আগে বাংলায় যে ভয়ঙ্কর দুর্ভিক্ষ হয়েছিল – সেই দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি প্রথম বাংলা চলচ্চিত্রে মৃণাল সেনই সিনেমার আঙ্গিকে তুলে ধরেন ‘বাইশে শ্রাবণে’। আবার ‘বাইশে শ্রাবণ’-এ গ্রামের প্রেমিক-প্রেমিকার ওপর সামাজিক প্রভাবের থেকে বেড়িয়ে এসে ‘পুনশ্চ’(১৯৬১) ছবি করলেন শহুরে প্রেমের জীবন সমস্যা নিয়ে। এই সমস্যা মূলত অর্থকেন্দ্রিক।

আবার ‘ভুবন সোমে’ অন্য মৃণাল, ভারতীয় সিনেমায় ‘ভুবন সোম’(১৯৬৯) ল্যান্ডমার্ক। মৃণাল সেনের ভাষায়, ভারতীয় ছবিতে ‘ভুবন সোম’–এই বোধহয় প্রথম বস্তাপচা কাতুকুতু বাদ দিয়ে একটা রাজনৈতিক পরিহাস পরিবেশনের চেষ্টা করা হয়। এ ছবিতে তথাকথিত আদর্শবোধ নিয়ে মজা করা হয়েছ। “আমার ইচ্ছে ছিল না ‘আমলা’টিকে মানুষ করার, আমি তাঁর দুর্নীতিগ্রস্ততার  ছবি আঁকতে চেয়েছি। তাঁর ভিক্টরিও আদর্শকে ধূলিসাৎ করতে চেয়েছি”। ছবির শেষে যাদব বউকে জানায় যে সে অন্য এক স্টেশনে বদলি হয়েছে যেখানে আরো বেশি ট্রেন যায়, অতএব আরো বেশি উপরি। এতেই পরিষ্কার সোমবাবু অবশেষে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন।

চার্লি চ্যাপলিনকে নিয়ে নিজের লেখা বইয়ের প্রচ্ছদ হাতে মৃণাল সেন

সমালোচকদের মতে ‘ইন্টারভিউ’(১৯৭১)-এর মাধ্যমে মৃণাল সরাসরি রাজনৈতিক পর্বে প্রবেশ করেন। একটা স্যুট না থাকায়, এক যুবকের ইন্টারভিউ দিয়েও চাকরি হয় না। সরাসরি আক্রমণ করা হয় ঐ ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গিকে।এক কুড়ি বছরের যুবক ইতিহাসের পথ ধরে হাঁটে। তার সীমাহীন যাত্রাপথে চল্লিশ বছরের চারটে ভিন্ন দশকের প্রতিটি দিনের ঘটনা ফুটে ওঠে। সেই দিনগুলি একই সূত্রে বাঁধা, তা হল গরিবি-অনাহার-দারিদ্র, যা আমরা দেখতে পাই ‘কলকাতা ৭১’ ছবিতে। এরপর থেকে আমরা তাঁর ছবিতে সমাজের বিভিন্ন সমস্যা ফুটে উঠতে দেখেছি। ‘ওক অরি কথা’, ‘একদিন প্রতিদিন’, ‘আকালের সন্ধানে’, ‘খারিজ’। ‘আকালের সন্ধানে’ ছবির মধ্যে ছবি, আসলে যা বাস্তব। আকালের পরে সামাজিক পরিবেশ কী হয়, তার জ্বলন্ত উদাহরণ এই ছবি।

মৃণাল সেনের সঙ্গে লেখক

একটু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলি। আমি প্রথম আমার তথ্যচিত্র ‘রত্নগর্ভা’(বিষয় – চিকিৎসা বিজ্ঞানে ভারতীয়দের অবদান)ছবির একটা কপি ওনার হাতে দিই, উনি বলেন বিষয় কী? আমি বলি, বিষয় হল চিকিৎসা বিজ্ঞানে বাঙালিদের অবদান। উনি  রেগে গিয়ে বলেন, বাঙালি কেন বলছ, ভারতীয় বলতে পার না, আমি তো এবার ‘সেরা বাঙালি’ অনুষ্ঠানে যাইনি এই কারণে। ওদের বলেছি। আমি তখন কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। ছবির ডিভিডি-টা নিয়ে ভাল করে দেখছিলেন, আমার টিভিতে চলবে? আমি বললাম হ্যাঁ। কতজনকে তো দিয়েছি বেশিরভাগ গুণীজন ঠোঙার মত নিয়ে টেবেলে রেখেছে। ছবি নিয়ে যখন কথা বলতেন, তখন মৃণাল সেন দেখতেন না আমি কোথা থেকে এসেছি,আমার পরিচয় কী! শিশুর মতো বলতে থাকতেন। এ কথা খুব মনে পড়ছে।

এক শতাব্দীর জীবন্ত দলিল সঙ্গে নিয়ে পৃথিবীর সামনে বাঙালিকে আরও একটু একা করে দিয়ে বিদায় নিলেন মৃণাল সেন।

গ্রাফিক্স ও ছবি: লেখক

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here