power-and-politics
দেবারুণ রায়

ক্ষমতা মাথায় চড়ে গেলে ক্ষমতাসীন ব্যক্তির হাল হয় ধুম জ্বরে আক্রান্ত রোগীর মতো। জ্বর যখন লাল সংকেত ছুঁই ছুঁই, জ্বরের ঘোরে মানুষ ভুল বকতে থাকে। মাথায় আইসব্যাগ দিয়ে বা জল ঢেলে জ্বর কমানোর প্রক্রিয়া অবশ্যই সনাতনী। তাতেও কাজ না হলে তাতে গুরুতর পদক্ষেপ। ক্ষমতার অলিন্দে বিচরণকারীরা এ ধরনের জ্বরের লক্ষণ জানেন। আমজনতার নাড়িতে হাত রেখেও কেউ কেউ বুঝতে পারেন শাসকের হালহকিকত। এ দেশের মাটি যাঁরা চেনেন, তাঁদের মধ্যে এমন অভিজ্ঞতা আছে অনেকেরই। বিশেষ করে বাংলার আকাশ দেখে যে সারা দুর্যোগ আঁচ করা যায়, সে আর নতুন কথা কী!

পঞ্চায়েত ভোটকে কেন্দ্র করে বাংলার আকাশে কালো মেঘের আনাগোনা চলছে কিছু দিন। এই মেঘে তাৎক্ষণিক বৃষ্টির আভাস নেই। আছে বড়োসড়ো দুর্যোগের সংকেত। দুর্যোগ ঠিক কত দূরে তার পূর্বাভাস খোলসা না করে মেঘের পরে মেঘ জমছে। মেঘের রং ক্রমশই কোকিলকালো। এ দিকে দুর্যোগের সংকেতে মানুষ ত্র্যস্ত হলেও শাসকের হেলদোল নেই। চিরকাল দেশে দেশান্তরে স্বৈরশাসনে যেমন যেমন ঘটেছে বাংলার মাঠে-ময়দানে তেমন তেমন ঘটনাপ্রবাহেরই ঘনঘটা। শাসনে আছেন যাঁরা তাঁদের নির্দিষ্ট রঙের খড়ির গণ্ডিতে বাঁধা পড়েছে প্রশাসন। অকুতোভয় মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ আপসে অরাজি হয়ে ন্যায়ের পক্ষ নিয়ে ব্যক্তিগত ভাবে বিপদকে আলিঙ্গন করছেন। কিন্তু অন্যায়ের সঙ্গে সমঝোতা করছেন না। তবু বিপুল গরিষ্ঠসংখ্যকরা দায়ে পড়ে মাথা নুইয়েছেন শক্তিমানের সামনে। সুখের সূত্র মেনে এঁরা গভীর ভাইরাসের অসুখে আক্রান্ত। কারণ এই ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচানোর উপায় যাঁদের হাতে থাকার কথা সেই বিরোধীরা কার্যত নিষ্ক্রিয়। দীর্ঘদিন ধরে ফুলে-ফলে ভরে থাকা মহীরুহের শিকড় থেকে আলগা হচ্ছে মাটি। তাই কঠিন শীতে পাতা ঝরার পর আর শাখাপ্রশাখায় নতুন পল্লবের দেখা নেই। ফের অন্য কোনো ঝড়ে ভেঙে পড়ার অপেক্ষায়।

অন্য দিকে নতুন শাসকের জমি হারানোর পালা যখন শুরু তার অনেক আগেই ষাট বছরের পুরোনো প্রভুত্বের মৃত্যুঘণ্টা বেজেছে। পরিবর্তনের পালায় গোড়া থেকেই শাসক ও বিরোধী নির্দিষ্ট হয়েই ছিল। অতীতের মোহমুক্তির সুযোগে শাসকেরাই মানুষের কাছ থেকে আদায় করে নিয়েছিল বিরোধী-মনোনয়নের অধিকার। বিরোধী শক্তির পা রাখার জমি কাদের ছেড়ে দেওয়া যাবে তা ঠিক করার সুযোগ এমনিতেই থাকে শাসকদের। সেইমতোই বাংলার মাঠে রাজনীতির বল গড়িয়েছে। ক্ষমতাসীনরা ভেবেছিলেন, তাদের দু’ হাতেই রসগোল্লা। হিন্দি বলয়ে যেমন বলা হয়, ‘দোনো হাত মে লাড্ডু’। কিন্তু এমন লাড্ডু একটাই পাওয়া বা খাওয়া যায়। অন্যটা ছেড়ে দিতে হয় প্রতিদ্বন্দ্বীকে। বাংলায় সেই রসগোল্লাই বিরোধীদের হাতে তুলে দিয়েছে শাসক। হাতটা সঠিক কার তা বোঝা গেলেও হয়তো শেষ কথা বলার সুযোগ এখনও আসেনি। পঞ্চায়েত ভোট হলে সেই সময়টা ঘনিয়ে আসবে। তবুও কি ক্ষমতার জ্বর কমবে? ভোট যে ভাবেই হোক, গরিষ্ঠতার অঙ্ক আসল নকল যা-ই হোক, নিরঙ্কুশ ক্ষমতার ঘোরে নকল সংখ্যাকে আসল মনে হয়। ক্ষমতার ‘বিপ বিপ’ শব্দকেও মানুষের নাড়ির স্পন্দন বলে মালুম হয়। এই ভুল-ই ইতিহাসের কাছে হিরণ্ময়। এবং মনিটরের সংকেত ভুল হলে তার পরিণাম সর্বনাশা।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here