amit shah
অমিত শাহ। ছবি সৌজন্যে স্ক্রল.ইন।

দেবারুণ রায়

শেষমেশ সবরিমালায় অমূল্য রতনের খোঁজে অমিত শাহ। যেখানেই দেখ ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন। এই আপ্তবাক‍্য অনুযায়ী। দক্ষিণ ভারতের নানা প্রান্তে বিজেপি পরশপাথর খুঁজে বেড়াচ্ছে দীর্ঘদিন। একেবারে যে কিছু পায়নি তা-ও নয়। কিন্তু কপালদোষে বারবারই তা হাত ফসকে চলে গেছে শত্রু শিবিরের নাগালে। অন্ধ্রের চন্দ্র (বাবু) এই নিয়ে বার বার দু’বার হাতছাড়া। কট্টর কংগ্রেস-বিরোধী বলে তাঁকে বাজপেয়ীজির মতো মোদী মহারাজও ভরসা করেছিলেন। হাত ধরে টেনে হিঁচড়ে পাশে বসানোর ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেল মিডিয়ায়। কিন্তু বাবু ভাগলবা। কংগ্রেস-বিরোধিতা শিকেয় তুলে সটান বিরোধী মঞ্চে। এর পর আরেক চন্দ্র। তেলঙ্গানার চন্দ্রশেখর রাও। কট্টর কংগ্রেস-বিরোধী। নবীন পট্টনায়েকের মতোই আগমার্কা আস্থাভাজন। বিরোধীদের ঘরের মধ্যে ঘর করার লক্ষ্যে এক কালের কংগ্রেস নেতা ও এমপি কেশব রাওকে নিয়ে সটান হাজির কলকাতায়। বিরোধী জোটের নতুন সূত্রে নবান্নের নৈবেদ্য। সারা দেশে শোরগোল ফেলল ওই সফর। কিন্তু কালক্রমে কুঁকড়ে গেলেন তিনিও। সরাসরি বিজেপির কোলে ঝোল টানছেন এমন দৃশ্যে বামালশুদ্ধু ধরা পড়ে গিয়ে। এ বার বাকি থাকলেন ওড়িশার নবীন। যিনি রাজ্যসভায় নাটকীয় ভাবে মোদী-মন্ত্র আউড়ে মান বাঁচালেন সরকারের। কিন্তু জোট বড়ো বালাই। অযথা নিজের মাত্র ওই ক’টা আসনের মধ্যে জোটের নামে জায়গা ছেড়ে বিনিময়ে পাবেন কী? বিজেপি যেখানে আসন বাড়ানোর জন্য মরিয়া, সেখানে অন্য রাজ‍্যেই বা ছাড়ার মতো আসন কোথায়? যে সব রাজ‍্য থেকে গত বছর বেশি আসন জুটেছে, সে সব রাজ্যে এমনিতেই তো ভাটির টান। সুতরাং ওই ঘাটতি পূরণ হবে এমন জোয়ার কি ভিন রাজ‍্যে আছে? ২০১৪-য় হিন্দি বলয়ের বড়ো রাজ‍্যগুলোই বেশি আসন দিয়েছিল। অকর্ষিত ছিল ছোটো রাজ‍্যগুলো। উত্তর-পূর্ব, ওড়িশা এবং কেরল। উত্তর-পূর্বে ২৫, ওড়িশায় ২০ এবং কেরলে ২০। এই ৬৫-র মধ্যে অন্তত ৩০ জুটলেও উত্তরপ্রদেশের ঘাটতি পুষিয়ে যাবে হয়তো। কিন্তু হিন্দি বলয়ের বাদ বাকি রাজ‍্যের ঘাটতি পূরণ হবে কী দিয়ে? বাংলা থেকে ১০-এর অঙ্ক কষেছিলেন অমিত শাহ। কিন্তু তার পর আর তা নিয়ে সাড়াশব্দ শোনা যায়নি বহু দিন।

আরও পড়ুন মায়ার খেলায় মুখ বন্ধ বিজেপির, মেরুকরণের পালটা দাওয়াই জোটের

কর্নাটকের মতো রাজ‍্যে বিজেপির বিজয়রথ অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বাধ সাধল বিরোধী জোট। এমনই বাড়া ভাতে ছাই পড়ল বিজেপির যে, কর্নাটকের ছায়ায় উত্তরপ্রদেশেও হাতের সঙ্গে হাতাহাতির বদলে সংবাদ শুরু করল হাতি আর সাইকেল। শেষোক্ত দু’ দল হাতও মিলিয়ে ফেলল উপনির্বাচনে। ফলে অনিবার্য হার হল যোগী অ্যান্ড কোং-এর। এমতাবস্থায়, ভিন রাজ‍্যে জাল ফেলা শুরু। এবং অবশ্যই তার আগে সেখানে জল ঘোলা করে টুকটাক মৎ‌স‍্যচাষ। এরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ কেরলের শবরীমালা। কর্নাটকে কত শত ইস‍্যু নিয়েও লাভ হল না বিধি বাম বলে। অন্ধ্রের অলিগলি এড়িয়ে পালানিস্বামীর রাজ্যে এল বিজেপি। যেখানে সম্ভাবনার কেন্দ্রে আছেন স্ট‍্যালিন। হাওয়া বুঝে পলায়নে রজনীকান্ত। পায়ের তলার মাটি সরছে পালানির। রামরথের তদবির করে সম্ভাব্য হার বাঁচাতে খড়কুটো করতে চান  মোদীকে। স্ট‍্যালিনকে না পেয়ে অগত্যা মোদীরও মধুসূদন পালানি। কিন্তু কোনো মেরুকরণের ইস‍্যু মেলেনি। পুরোনো চাল ভাতে বাড়বে ভেবে রামসেতুর স্বপ্নভঙ্গকে ভোলার চেষ্টায় কসুর করেননি বিজেপির কেন্দ্র রাজ‍্যের কর্তারা। যদিও উত্তাল বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ে আরও একবার ভেসে গেল পৌরাণিক রূপকথা। দলিত-সংখ্যালঘুঅনগ্রসর জোট এতটাই পাকা নীচের তলায় যে, দলগুলোর সেতুবন্ধন নেহাতই আনুষ্ঠানিকতা। ফলে বিজেপির বাড়তি আসনের গল্প জমল না তামিলনাড়ুতে। এবং বাকি রইল কুড়ি আসনের কেরল।

sabarimala protest
সবরিমালা রায়ের প্রতিবাদ। ছবি সৌজন্যে ফার্স্ট পোস্ট হিন্দি।

সবরিমালা নিয়ে সংকটে সিপিএম সরকার। কারণ বাকি সবাই মাথা মুড়িয়েছে মৌলবাদের দোকানদারিতে। দোকানটা অবশ্যই হিন্দু ভোটের। কেরলের বিচিত্র বাস্তবতায় মুসলিম ও ক্রিশ্চানরা মূলত কংগ্রেসের সঙ্গে বলেই হিন্দুরা ধর্মীয় দৃষ্টিতে না হলেও, জনগোষ্ঠীর বৃহত্তম অংশ হিসেবে বরাবরই সিপিএমের সঙ্গে‌। যে কারণে বিজেপি হিন্দু-সমর্থনে বঞ্চিত। সংখ্যালঘুরা তো কোনো অবস্থাতেই বিজেপির খাতায় নাম লেখাবে না। উলটে, যে দল বা প্রার্থী বিজেপিকে হারানোর মতো শক্তিশালী তাকেই ভোট দেবে। তা ছাড়া, কেরলে শিক্ষার হার ও রাজনৈতিক সচেতনতা যথেষ্ট বেশি হওয়ায় মৌলবাদীরা মোটেই নির্ণায়ক শক্তি নয়। বিশেষ করে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ইস‍্যুতে ভর করে নির্বাচনে জেতা অকল্পনীয়। এবং মেয়েদের অনগ্রসরতাও ব‍্যাপক নয়। তাই মহিলাদের মন্দিরে ঢোকা রুখতে যে সব মিছিল, প্রদর্শন হচ্ছে তার পালটা প্রগতিশীল মহিলাদের নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পক্ষেও পথে নামছে মানুষ। অবশ্য একটা বিজেপি-আতঙ্ক পেয়ে বসেছে রাজ‍্যের শাসক ও বিরোধী দলকে। আরএসএসের প্রচার ব‍্যাপক ভাবে চলার পাশাপাশি বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়ে চলেছেন। কারণ অনেক ইস‍্যু ভেস্তে যাওয়ার পর হাতে আসা সবরিমালাকে আঁকড়ে ধরে হিন্দুত্বের হালে পানি পাবেন বলে ভাবছেন তাঁরা। যা অন্ধ্র, তামিলনাড়ু বা কেরলে কস্মিনকালেও হয়নি। বিজেপির হিন্দুত্ববাদী প্রচারের বহর দেখে বেশ বেকায়দায় রাজ‍্য কংগ্রেস। দিল্লির গুঁতোয় যতটা না করলে নয় তাই করছে। হিন্দু ভোট খোয়ানোর কথা ভাবতে হচ্ছে মুখ‍্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নকেও। কিন্তু সিপিএম অবশ্য সারা দেশে এ নিয়ে প্রচারে নেমেছে মোদীবাহিনীর বিরুদ্ধে। তারা বলছে, তিন তালাক নিষিদ্ধ করে মুসলিম মহিলাদের সুবিচার দেওয়ার দাবি করছে বিজেপি, এটা ভালো কথা। মুসলিম মহিলাদের শোষণ, পীড়ন বন্ধ করার প্রয়াসকে স্বাগত। কিন্তু হিন্দু মহিলাদের বৈষম্যের শিকার করে রাখা কেন? তারাও তো সামাজিক ও ধর্মীয় বিধিনিষেধের বলি। এবং তাঁরা সংখ্যায় অনেক অনেক গুণ বেশি। তাঁদের সমানাধিকার সর্বোচ্চ আদালত স্বীকার করলেও দেশের শাসকদল তার রূপায়ণে বাধা দিচ্ছে। বিজেপি সরকারের এই সুবিধাবাদী দুমুখো নীতি কেন? যদিও আদালতের রায়ের সমালোচনা করতেও অগ্রগণ‍্য বিজেপি। শাহ বলছেন, আদালতের এমন রায় দেওয়া উচিত নয় যা রূপায়ণ করা সম্ভব নয়। উল্লেখ্য, মহিলা স্বেচ্ছাসেবকরাই সবরিমালা মন্দিরে ঋতুমতী মহিলাদের ঢোকার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে। তাঁরা হুমকি দিচ্ছেন, একজন  মহিলাকেও ঢুকতে দিলে আগুন জ্বলবে কেরলে। মহিলারা আত্মবলিদান দেবেন। কেরল সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে।

তবু অমিত শাহের ভাবনামাফিক বিজেপিকে কিছুটা গ্রেস দিয়ে হিসেবনিকেশ করলেও ১টা বিধানসভা আসনের পার্টি কুড়ির ভেতর ক’টা পেতে পারে সহজেই অনুমেয়। কুঁড়িতেই ঝরে যাওয়ার দশায় সবরিমালার আয়াপ্পান আর কতটুকু ভোটসিঞ্চন করবেন?

এ দিকে, কেরলের প্রথামতো প্রতি পাঁচ বছরেই সরকার বদলায়। সিপিএম সরকার এখন তখতে। আগামী লোকসভা ভোট পর্যন্ত রাজ‍্যে ভোটের চলতি হারই বজায় থাকার কথা। পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষে ২০২১-এর বিধানসভা ভোটে ফের কংগ্রেসের পাল্লা ভারী হওয়ার কথা। এ ভাবেই পাঁচ বছর অন্তর পরিবর্তনের পদ্ধতি বহাল কেরলে‌। যদি পাঁচ বছর আগে বাম সরকারের জনপ্রিয়তা কমে যায় সবরিমালার কারণে, তা হলেও তার ফলভোগী হবে মূল বিরোধীদল কংগ্রেস। সরকার পরিবর্তন বা লোকসভায় হারজিত তো পাঁচ শতাংশ ভোটের দিক-পরিবর্তনেই সম্ভব। কংগ্রেস ও সিপিএমের সাংগঠনিক ভিত্তি তেমন ভাবেই রয়েছে। যা বিজেপির নেই। তা ছাড়া লোকসসভায় বিজেপি শূন্য। বিধানসভায় সবেমাত্র পা রাখার জায়গা পেয়েছে তারা। সংখ্যা ১। প্রথমত, ভোটের হার এত দ্রুত বদলায় না। খুব আলোড়ন জাগানো ঘটনা ঘটলেও ভোটারদের মেরুবদল হতে অনেকটা সময় চাই। তা-ও যদি আদৌ বামমার্গী ভোটাররা দক্ষিণমার্গী হন, কেরলের মতো কমিটেড ভোটাররা যা কখনও হননি। সর্বোপরি রাজনৈতিক মেরুকরণ কেরলের মতো রাজ‍্যে প্রখর। মনে রাখতে হবে, কেরলে কংগ্রেসের ভিত যেমন পোক্ত তেমনি বামেদের। পঞ্চাশের দশকেই অবিভক্ত কম‍্যুনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় আসে কেরলে। যেখানে বাংলায় বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসে সত্তরের শেষার্ধে। এবং বাংলায় বামরাজ ৩৪ বছর চলায়  সমর্থনভূমিতে যে বিরাট ধস নেমেছে, কেরলে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর পালা বদলের দরুণ তা হয়নি। সুতরাং তৃতীয় শক্তি হিসেবে বিজেপির মতো বিপরীত মেরুর দলের পক্ষে ওই রাজ‍্যের মাটিতে ফসল ফলানো কঠিন। কারণ, কেরলের শাসক ও বিরোধী দুই পক্ষই বৃহত্তর ক্ষেত্রে অভিন্ন রাজনৈতিক মেরুর। এই মেরু হল ধর্মনিরপেক্ষতার। এ ছাড়া, জনমানসে যদি মতাদর্শগত কোনো রূপান্তর ঘটেও, তা হলেও জমিতে তার ছায়া পড়তে যথেষ্ট সময় লাগে। বাবরি মসজিদ ভেঙে সাড়া জাগানো ইস‍্যুর জন্ম হয়েছিল ‘৯২-এর শেষে। আর বিজেপি কেন্দ্রে কোয়ালিশন সরকারে আসে ‘৯৮-তে। ‘৯৬-তে ছিল মাত্র ১৩ দিন।’৯৮-সরকারও টেকে এক বছর। এবং সর্বোপরি, বাবরি-কেন্দ্রিক অযোধ্যা আন্দোলন ছিল হিন্দি বলয়ের, যার প্রভাব পড়েনি দক্ষিণে। উত্তরেই হিন্দুত্বের রাজনীতি ভোটের অঙ্কে ফুটে উঠতে সময় লেগেছিল অন্তত চার বছর। আর কেরলের মতো প্রান্তিক দক্ষিণী রাজ‍্যের মাটিতে হিন্দুত্বের বীজ আদৌ অঙ্কুরিত হবে কিনা তা পরীক্ষিত নয়। তবু অমিত শাহের ভাবনামাফিক বিজেপিকে কিছুটা গ্রেস দিয়ে হিসেবনিকেশ করলেও ১টা বিধানসভা আসনের পার্টি কুড়ির ভেতর ক’টা পেতে পারে সহজেই অনুমেয়। কুঁড়িতেই ঝরে যাওয়ার দশায় সবরিমালার আয়াপ্পান আর কতটুকু ভোটসিঞ্চন করবেন? মন্দিরে না ঢোকার জন্য মহিলারা কি একক সিদ্ধান্ত নেবেন বিজেপির পক্ষে? তিন তালাকমুক্ত মুসলিম মহিলারাও কি পরিবারের মধ্যে হয়ে যাবেন পৃথক দ্বীপপুঞ্জ?

 

 

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here