amit shah and narendra modi
অমিত শাহ, নরেন্দ্র মোদী। ছবি সৌজন্যে দ্য প্রিন্ট।
দেবারুণ রায়

অক্টোপাসের গ্রাসের দিকে দ্রুত এগোচ্ছে বিজেপি। কেন্দ্র ও বেশির ভাগ রাজ‍্যে শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে তারা ধরে নিয়েছে, তাদের জয়ের সীমা হতে পারে শুধু  আকাশ। ২৮২টি লোকসভা আসন, সংসদের নিম্নকক্ষে তিন দশক পর প্রথম নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা এ সব তাদের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। তা-ও আবার কীসের জোরে? বাজপেয়ী, আডবাণী এমনকি জোশির মতো প্রবীণ, পরীক্ষিত ও পরিচিত নেতাদের নেতৃত্ব ছাড়াই। মোদীর সঙ্গে সারা দেশের মানুষের কোনো সংযোগই ছিল না। গুজরাতে ২০০২-এর দাঙ্গার দৌলতেই তাঁর খ‍্যাতি ও অখ‍্যাতি। তার ওপরে হিন্দিভাষী  হলেও রাষ্ট্রভাষা তাঁর মাতৃভাষা নয়। এর ওপর আরও একটা বক্ররেখাকে সরল করতে হয়েছে বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থীকে। মোদীর মতো কেউ গুজরাত থেকে প্রথম বার উত্তরপ্রদেশে এসে লোকসভায় দাঁড়িয়েই প্রধানমন্ত্রী বনে যাননি। এবং তাঁর দলের সভাপতি হিসেবে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ অমিত শাহও এই অমিত সাফল্য পেয়েছেন অভাবনীয় ভাবে। মোদী-শাহ জুটি যে সাফল্যের মুখ দেখান বিজেপি ও সংঘ পরিবারকে তা গেরুয়া শিবিরের অধরা স্বপ্ন ছিল চিরকাল। এর পেছনে ছিল কংগ্রেসের মতো প‍্যান ইন্ডিয়ান দল সম্পর্কে দেশবাসীর মোহভঙ্গ এবং কংগ্রেসের বিকল্প হিসেবে কোনো ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির অনুপস্থিতি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শক্তিশালী আঞ্চলিকরাও বিকল্প হতে পারেনি মতাদর্শ ও কর্মসূচিহীন রাজনীতি এবং তাদের শীর্ষ নেতৃত্বের ব‍্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার দরুণ।

আরও পড়ুন প্রণবের রায়ে সোমেন সভাপতি, মমতাকে জোটের বার্তা রাহুলের

তা ছাড়া কংগ্রেসের বিকল্প হতে পারত যে বামেরা তারা অনেক আগেই পথ হারিয়ে কখনও কংগ্রেস, কখনও বা জাতীয় ক্ষেত্রে বিরোধী জাতীয়তাবাদী ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি অথবা আঞ্চলিক দলগুলোর লেজুড়বৃত্তি করেছে নিজেদের লাগাতার সংকুচিত করে। ফলে ইউপিএর সরকার যখন কার্যত অরাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতে পড়ে একঘরে হয়ে সরকার হারাল তখন সরকারের নীতিপঙ্গুত্ব থেকে দুর্নীতি এবং বিদেশনীতির দিশা থেকে অর্থনীতির মোড় বদল মেনে নিতে নারাজ ভারতবাসী রং ভুলে ‘অচ্ছে দিনে’র স্বপ্নে গা ভাসাল। এর পাশাপাশি ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণেরও সঙ্গী হল। মতাদর্শগত কট্টরপন্থা নিয়ে তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও মানুষ এনডিএর অতীত ও বর্তমানের সেকুলার শরিকদের সার্টিফিকেটের জন্যই বিজেপি ও মোদীকে বিকল্প হিসেবে বরণ করল।

এর পর ধীরে ধীরে মোহভঙ্গের শুরু। প্রথমে নোটবন্দি। তারপর জিএসটি। কর্পোরেটের একের পর এক কেলেঙ্কারি, মূল‍্যবৃদ্ধি, সমস্ত জনকল্যাণকর নীতির অবসান, এমনকি কংগ্রেস জমানার দুর্নীতির অভিযোগও অসার করে দিল মোদীর ‘ না খাতা হুঁ অর না খানে দুঙ্গা’ র আশ্বাস। উত্তরপ্রদেশে যোগীগড় কেঁপে উঠল তিন উপনির্বাচনে। কাশ্মীর থেকে কন‍্যাকুমারিকা, অমদাবাদ থেকে আসাম দখলের দম্ভ ধাক্কা খেল কাশ্মীরেই। রাখা গেল না সরকার। মহারাষ্ট্রে বেঁকে বসল সব চেয়ে পুরোনো বন্ধু শিবসেনা। আগেই বিচ্ছিন্ন হয়েছেন চন্দ্রবাবু। এর মধ্যে যে গুজরাত থেকে হয়েছিল বিজেপির জয়যাত্রা, সেখানেই বিধানসভা ভোটের ফল চমকে দিল দুই গুজরাতি, মোদী ও শাহকে। ফলে ২০০২-এর গুজরাত মেরুকরণের যে রাস্তায় হেঁটে ওই রাজ‍্যে বিজেপি দুর্গ তৈরি করেছিল, পতনের সূচনাও হল সেখান থেকেই।

north indian workers are fleeing from gujarat.
উত্তর ভারতের শ্রমিকরা গুজরাত ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। ছবি সৌজন্যে জি নিউজ।

গুজরাতের রূপানি মোদীর আসন টলিয়ে দেওয়ার জোগাড়। প্রাদেশিকতার মোড়কে শুরু হয়েছে হিন্দিভাষী খেদাও। গুজরাতে ভোট পেতে এটা দরকার বিজেপির মতো দলের। অতীতে ধর্মীয় মেরুকরণ করেছে। তার সুফল কুড়িয়ে মোদী হয়েছেন দিল্লিশ্বর। তার ধার পড়ে গিয়েছে। অন্য দাওয়াই হিসেবে প্রয়োগ করা হল প্রাদশিকতা। উত্তরপ্রদেশ, বিহার, অসম ইত্যাদি অন্য প্রদেশের ছেলেমেয়েদের খেদানো শুরু হল শিবসেনা স্টাইলে। সরাসরি এই ইস‍্যু তুলে নিলেন হিন্দি বলয়ের নেতারা। গুজরাতে এটা চললে উত্তরপ্রদেশ-বিহারে কপাল পুড়বে  বিজেপির। আর এই আন্দোলন বন্ধ করা হলেও ধাক্কা খেতে হবে গুজরাতে। কারণ কংগ্রেসে শামিল অল্পেশ ঠাকোর এই ইস‍্যুতে ইতিমধ্যেই‍ বাজার গরম করেছেন। কংগ্রেসকে দ্ব্যর্থহীন ভাবে ঘায়েল করতে গিয়েই ফেঁসে গিয়েছে বিজেপি। নিজের জালেই জড়িয়েছে। এই ধরনের ইস‍্যু নেওয়ায় রাজ‍্যে রাজ‍্যে গড়ে উঠছে বিরোধী জোট। রাজস্থান, মধ্যপ্র‌দেশ ও ছত্তীসগঢ়ে বিজেপি আর কংগ্রেস কার্যত মুখোমুখি। তৃতীয় দল বা শক্তির কোনো স্বীকৃতি নেই। ফলে জোট না হলেও কোনো সংকট  নেই বিরোধীদের। এর প্রভাবে কংগ্রেস উত্তর‌‌প্রদেশেও যদি মহাজোটের বাইরে থাকে তা হলেও বিজেপির অন্তত ৩০টি আসন কমবে। ওই ৩০টি পুষিয়ে নেওয়ার মতো আর কোনো রাজ‍্য নেই। বাংলার আশা ক্রমশই দুরাশা হয়ে উঠছে। এ অবস্থায় শাহ বাংলায় ভাগ বসানোর ছক কষছেন। ভোটের আগে ক‍্যাম্প করবেন এ রাজ্যে। ফলে বিজেপি-বিরোধী জোট দলগুলোর মধ্যে না হলেও গ্রামে গ্রামে মানুষ গড়ে তুলবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন