modi rahul maya
মোদী, রাহুল এবং মায়া। ছবি সৌজন্যে দ্য ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস।

দেবারুণ রায়

আগামী লোকসভা ভোটে বিরোধী জোট গড়ে ওঠার প্রশ্নে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় বিজেপি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। যদিও সারা দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ঘটনার ঘনঘটা বলে দিচ্ছে, স্বস্তি বোধহয় বিজেপির বরাতে নেই। দেখা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় ভাবে কোনো বিরোধী জোট হয়তো হবে না। কিন্তু, রাজ‍্যে রাজ্যে স্থানীয় জোট বা কোনো কোনো দলের একক শক্তিই রুখে দিতে পারে বিজেপি বা এনডিএ-কে। যেমন বাংলায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাই ৪২টি আসন জেতার ডাক দিয়েছেন। মানুষ এ ডাকে সাড়া দিলে বিজেপির নতুন এলাকায় বিস্তারের স্বপ্নে ভেটো পড়বে।

উনিশের ভোটে নিরঙ্কুশ হতে হলে পূর্বে ও দক্ষিণে বিজেপিকে অনেক বেশি আসন জিতে উত্তরপ্রদেশ, বিহার, রাজস্থান, গুজরাত, মধ‍্যপ্রদেশ, ছত্তীসগঢ়সহ পুরো হিন্দি বলয়ের ঘাটতি পুষিয়ে নিতে হবে। কারণ এই সব এলাকায় কোথাও কোথাও বেশি এবং বাকি রাজ‍্যে এ বার বিজেপির আসন কমবে বলেই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। ২০১৪-র ২৮২ আসন এসেছিল এই সব এলাকা থেকে। এক কথায় এই রাজ‍্যগুলিতে বিজেপির সমর্থন সম্পৃক্ত। আর বাড়ার জায়গা নেই। সুতরাং গ্রাফ এ বার নিম্নগামী হবে বলেই বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত। তাঁদের মতে এটাই প্রকৃতির নিয়ম। তা ছাড়া, অর্থনীতির সূত্র ‘ল অফ ডিমিনিশিং রিটার্ন’এর সঙ্গে অনেকটা মিলে যায় রাজনীতির ‘ইনকাম্বেন্সি ফ‍্যাক্টর’। অর্থাৎ ক্ষমতায় থাকার দরুণ জনপ্রিয়তা হ্রাস। অনেক আশা করে সরকারে এনে দেখা গেল, কোনো আশাই পূর্ণ হল না। সুতরাং ফের অন্য কোনো বিকল্প খোঁজা। বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ ভারতের সংসদীয় ব‍্যবস্থা এ জন্যই এত সফল। মানুষ খেতে পরতে না পেলেও মনের কথা খুলে বলতে পারে। একেবারে নিরন্ন, নিপীড়িত মানুষও সর্বশক্তিমান প্রধানমন্ত্রীকে সরকারশুদ্ধু বদলে দিতে পারে। ‘৭৭, ‘৮০,’৮৯, ৯১, ‘৯৬, ‘৯৯, ‘০৪ ও ‘১৪-য় এমন ঘটনা ঘটেছে। সুতরাং ভবিষ্যত সম্পর্কে নিশ্চিন্ত থাকার অবকাশ কোনো পক্ষেরই নেই।

এর বিপরীতে, শাসক দলের উত্তর পূর্বাঞ্চলে লোকসভার আসন বাড়ার সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছেই। নতুন রাজ‍্যের পালক হিসেবে বিজেপির মুকুটে জুড়েছে অসম ও ত্রিপুরা। কিন্তু এই দুই রাজ‍্যের আসনের যোগফল ১৬। আর গোটা উত্তর-পূর্বের মোট আসনসংখ‍্যা ২৫। অথচ উত্তরপ্রদেশে শুধু মায়াবতী-অখিলেশ জোট হলেই বিজেপির অন্তত ৪০টি আসন কমে যাওয়ার আশঙ্কা। এই ৪০-এর শূন‍্যস্থান পূর্ণ করবে কোন রাজ‍্য, সেটাই খুঁজছে মরিয়া বিজেপি। নিত্যনতুন প্রকল্প, কর্মসূচি ঘোষণা হচ্ছে এই লক্ষ্যেই।অবশ্য ভোট বাড়া বা কমার একটা সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া আছে। ধারাবাহিক ভাবে ভোট কমে বা বাড়ে। কোনোটাই রাতারাতি হয় না। এ জন্যই বিধানসভা ভোটের ফলাফলের হার পরের লোকসভা ভোটেও প্রতিফলিত হয়। তবে এই ধরাবাঁধা নিয়ম বদলে যেতে পারে সামাজিক ও রাজনৈতিক সমীকরণে দ্রুত পরিবর্তন ঘটলে এবং সেইমতো রণনীতিতে রূপান্তর এলে। যেমন, উত্তরপ্রদেশের ৮০ আসনের ৭৩টিই পকেটে পুরেছিল বিজেপি ও সঙ্গী অপনা দল। মেরুকরণের রামধাক্কা সামলাতে পারেনি সপা, কং ও বসপা। বাদ বাকি ৭টার মধ্যে সপা পেয়েছিল মাত্র ৫ ও কং ২। বিপুল দলিত সাম্রাজ্যের অধীশ্বরী ও প্রাক্তন মুখ‍্যমন্ত্রী মায়াবতী পেয়েছিলেন শূন্য। এই ইতিহাস দগদগে ঘা হয়ে আছে তিন দলের মনে। তাই উত্তরপ্রদেশ নিয়ে আর ঝুঁকির রাজনীতিতে যেতে চান না এই তিন দলপতি। মেরুকরণ আরও তীব্র হয়েছে। আরও কয়েক ধাপ বাড়বে অযোধ্যার ইস‍্যুতে মোদীমহল মারমুখী মুদ্রায় গেলে। ভোটের মুখে রামনাম অনিবার্য। তার মধ্যে আদালতের অবস্থানও স্পষ্ট হতে পারে। মোট কথা, নীরব মোদী ও বিজয় মাল‍্যর লুট, অসংখ্য কৃষকের আত্মহত্যা, বুদ্ধিজীবী খুন, কাশ্মীর-সহ অভ‍্যন্তরীণ নীতির ব‍্যর্থতা, অর্থনীতির পঙ্গুত্ব, নোটবন্দি থেকে নোটের দামে রেকর্ড পতন, সীমান্তে পাকিস্তান থেকে চিনের হুমকি, বছরে দু’ কোটি চাকরি আর বিদেশে পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে ১৫ লাখ এবং বিজেপি-রাজ‍্যে লাগাতার শিশুমৃত্যু, গো-তাণ্ডব, সংখ্যালঘু ও দলিতহত্যা, নিপীড়ন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা থেকে হাত গুটিয়ে কর্পোরেটকে কুর্নিশ ইত্যাদির পাশাপাশি বফর্সের ঠাকুর্দা রাফাল কেলেঙ্কারি উড়িয়ে দিতে চাই হিন্দু-মুসলমানের আরও এক দফা বিভাজন। ধর্মীয় মেরুকরণের ওই অমোঘ অস্ত্রেই বিরোধী-বধের অঙ্ক। যে সূত্র ভোটারদের মুখস্থ হয়ে গেলেও ভোটের দাওয়াই হিসেবে ধন্বন্তরি। বিরোধীরাও সেই পুরোনো অঙ্ক বুঝে কোমর বাঁধছে। এক দিকে রামবাণ রুখতে জাতধর্মের বিভেদ-বিহীন সমঝোতা আর সেই সঙ্গে সম্ভাব্য মেরুকরণের দরুণও ফায়দার পথ খুলে রেখে। ২০১৪-য় বিচ্ছিন্ন বিরোধীরা রাজ‍্যে ও কেন্দ্রে লাগাতার ক্ষমতায় থেকে জনসমর্থন খুইয়ে দান ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল বিজেপিকে। মোদীর উগ্র জাতীয়তাবাদী রণনীতি বিজেপিকে তৃতীয় থেকে প্রথম স্থানে তোলে।

তুখোড় রাজনীতিক মোদী এ বারও অবস্থা বুঝে ব‍্যবস্থা রেখেছেন। দেশের সব চেয়ে শক্তিশালী রাজনীতিক তিনি। সুতরাং কৌশলও সবই তাঁর হাতের মুঠোয়। সব কিছু তাঁকে নিজে হাতে করতেও হয় না। বিরোধী শিবিরের ফাটল বিজেপির পক্ষে সহায়ক। বিজেপি সেই বুঝেই কংগ্রেস বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে তলে তলে সমঝোতা রেখে এগিয়েছে। সংসদের  অদৃশ্য ফ্লোর কোঅর্ডিনেশন প্রকাশ‍্যে এসেছে কিছু ক্ষেত্রে। যেমন নবীন পট্টনায়েকের  বিজেডি। চন্দ্রশেখর রাওয়ের টিআরএস কংগ্রেসের বিরুদ্ধে জেহাদ জীইয়ে রেখে বিরোধী ঐক্যের কথা বলছে। তৃণমূল প্রধানমন্ত্রীপদে রাহুল গান্ধীকে মেনে না নেওয়ার সংকেত দিয়েছে আগেভাগেই। তার পর মায়াবতীর প্রধানমন্ত্রী পদের দাবিও অনেকটা স্পষ্ট হয় ঘটনাচক্রে। এই সঙ্গে কংগ্রেসের কিছু প্রথম সারির নেতাও কার্যকারণে বিজেপির উপকার করে চলেছেন। রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগঢ়ের বিধানসভা নির্বাচনে বিরোধী জোট না হওয়ার পেছনে কংগ্রেস ও মায়াবতী দু’ পক্ষেরই বাস্তববিমুখ মনোভাব ফুটে উঠল। এমনিতে কংগ্রেস ওই তিন রাজ‍্যে একাই বিজেপিকে হারানোর ক্ষমতা রাখে। বসপা সঙ্গে থাকলে বিরোধীদের ভোট শেয়ার আরও বাড়ত। বিজেপিকে রাজস্থানের সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগঢ়েও বড়ো চাপের মুখে ঠেলে দিতে পারত বিরোধীরা। এবং উনিশের পাকাপোক্ত জোটের নান্দীমুখ হত। কিন্তু তা হল না। গুমোর ছাড়তে নারাজ কংগ্রেস নেতা দিগ্বিজয় সিং মায়াবতীকে নস্যাৎ করলেন সাংবাদিক বৈঠকে। জবাব দিলেন মায়াবতী। কিন্তু কেন্দ্রীয় জোটের সম্ভাবনা জিইয়ে রাখলেন সনিয়া, রাহুলের প্রশংসা করে। যদিও সব বুঝেও অবুঝ থাকল কৌশলী বিজেপি। জোট হচ্ছে না বলে ঢ‍্যাঁড়া পেটাতে নামল সহস্রমুখ আরএসএস-এর অক্টোপাস। এ বার দায়ে পড়ে ভূত তাড়াতে ওঝার শরণে মায়াবতী। ছত্তীসগঢ়ে বিজেপির দিকে কোণঠাসা অজিত যোগী আর সিপিআইয়ের সঙ্গে জোট করলেন। প্রাক্তন মুখ‍্যমন্ত্রী যোগীর স্ত্রী রেণু এখনও কংগ্রেসে। ছেলে অমিতকে নিয়েই যত সমস্যা। পুত্রবধূ ঋচাকে দলে টানলেন মায়া। তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে প্রার্থী করে ভবিষ্যতের নেত্রী হিসেবে তুলে ধরলেন। এবং অজিতকে জনতা কংগ্রেসেই রেখে বললেন আপনি একটা কেন্দ্রে আটকে না থেকে গোটা রাজ‍্যে প্রচার করুন। ভবিষ্যত মুখ‍্যমন্ত্রিত্বের স্বপ্ন ছাড়তে হল যোগীকে। যে স্বপ্ন ছাড়াতে পারেনি কংগ্রেস ও বিজেপি। এবং মায়ার এই খেলায় সত্তা হারানোর শঙ্কায় বিজেপি। আর মায়া তাঁর গরিবগুর্বো ভোটারদের ভুল ভাঙিয়ে কংগ্রেসকে বিরুদ্ধ প্রচার এড়িয়ে সঠিক রণনীতি ছকতে বাধ্য করলেন।

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here