narendra modi in UP meeting
দেবারুণ রায়

সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের সময়টাই বিরোধীদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল, তারা লাগাতার ঠুক ঠুক করে শাসকদলের বিরুদ্ধে যতই আক্রমণ শানাক, শাসক কিন্তু এক মোক্ষম ঘা দিয়ে এক লহমায় তাদের সব অস্ত্র ভোঁতা করে দিতে পারে। বালাকোটে দ্বিতীয় বার সেটা প্রমাণ হয়ে গেল। বিরোধীদের এটা জানা ছিল না, তা নয়। কিন্তু মোদী প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় সর্বশক্তিমান বলে বিরোধীরা কি তাঁকে ওয়াকওভার দিয়ে দেবেন? মোদীও নিশ্চয়ই তা আশা করেন না। সে জন্য তিনি আটঘাট বেঁধেই মাঠে নেমেছেন। বিরোধী দলগুলো স্বভাবতই রিসিভিং এন্ড-এ বা প্রাপকের প্রান্তে, তাই প্রধানমন্ত্রী কোনো ইস‍্যু সফল ভাবে তৈরি করলে তাতে সাড়া দিতেই হয়। অগ্রাহ‍্য করার প্রশ্ন আসে না।তাই দ্বিতীয় সার্জিক্যাল স্ট্রাইক ভোটে মোদীকে বাড়তি সুযোগ দেবে ধরে নিয়েও তারা তাদের সাধ‍্যমতো শাসকদলের প্রচার-ফানুস ফাঁসিয়ে দিতে তৎপর।

আরও পড়ুন প্রধানমন্ত্রীর পাইলট প্রজেক্টের পর উলুখাগড়াদের কী হবে? হাল্লা চলেছে যুদ্ধে!

তা ছাড়া তিরিশ বছর পর লোকসভায় একক ভাবে নিরঙ্কুশ হওয়া দলকে পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার পর লড়াইয়ের ময়দানে সামনে পেয়েও স্বস্তিতে নেই বিরোধীরা। আবার অন‍্য দিকে দেখাই যাচ্ছে, বিরোধীদের বিরুদ্ধে মনের মতো দাওয়াই দিয়েও তেমন আত্মবিশ্বাসী নন সর্বাধিনায়ক। একটা না একটা খোঁচ থেকেই যাচ্ছে। বালাকোটে ১০০০ কেজি বোমাবর্ষণের পর জইশ-এর ৩০০ জঙ্গি নিকেশ করেছে ভারতীয় বায়ুসেনা, এই খবর প্রচারিত হওয়ায় যেমন আকাশে-বাতাসে ভি সাইনের মেলা লেগেছিল, সেগুলো রাতারাতি সব কোথায় মিলিয়ে গেল। একের পর এক মন্তব‍্যে হাতছাড়া হয়ে গেল সদ‍্য হাতানো বেশ কিছু পয়েন্ট। সবিশেষ ফাঁসলেন ও ফাঁসালেন অমিত শাহ, তাঁর আগ বাড়িয়ে করা ঘোষণায়। প্রশ্ন উঠে গেল, তবে কি বিরোধী-সন্দেহই সত্যি? না হলে, প্রথম দিন সরকারি সূত্র থেকে সংবাদ সংস্থাগুলো ৩০০ জঙ্গি নিকেশের কথা বলার কয়েক দিন পরে শাহ কেন ৫০ কমিয়ে‍ ২৫০-এ নামলেন? এর নেপথ্যে আসল কারণ কী তা খোলসা না করেই বিজেপির এক একজন মন্ত্রী সান্ত্রী তাঁদের বাণী বিতরণ করতে লাগলেন। জওয়ানদের সাবেক অধ্যক্ষ ভিকে সিং আগুয়ান হলেন। বললেন, মশা মারলে কি হিসেব রাখি, ক’টা মারলাম?

এ দিকে বিদেশি সংবাদ সংস্থাগুলো তো প্রথম দিন থেকেই উঠেপড়ে লেগেছিল। রয়টার প্রথম দিনই বালাকোটের মাদ্রাসা ও বিস্তীর্ণ জমিতে বোমার ধংসাবশেষ, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বোমা বর্ষণের চিহ্ন দেখিয়ে বলল, মৃত্যু কত তার হদিস মেলেনি। রাজনাথ ব‍্যাখ‍্যা দিলেন। দিলেন না সংখ্যা। সুষমা বললেন, বিদেশ সচিব যা বলেছেন সেটাই আসল। তবে মোদী যথারীতি একটা শব্দও উচ্চারণ করেননি। নিরাপত্তা উপদেষ্টার পরামর্শ ছাড়া তিনি পা ফেলেন না। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল ধ্বংসাবশেষ দেখানো মাদ্রাসার ছবি-সহ রয়টারের দাবি, এত অক্ষত! এ বার বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র এলেন সত্যি ঘটনা তুলে ধরতে। ফলে সরকার ও দেশের কল‍্যাণ যা হওয়ার তো হলই। সেই সঙ্গে বিতর্ক জীবন্ত হয়ে উঠল নতুন করে।

আরও পড়ুন বালাকোটেই কি হল বাজিমাত? কারগিলের পরে কুপোকাত হয়েছিল বিজেপি

‍এই রণনীতির সুবাদে দেখা যাচ্ছে, ভোট ঘোষণার একেবারে প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রী অনেকটা সফল ভাবেই উত্তর প্রদেশের জনসভায় দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। টৈনে আনছেন ২০১৪-য় অস্তাচলে যাওয়া মনমোহন সরকারকে।নিজের পাঁচ বছরের পারফরম্যান্স নিয়ে আত্মবিশ্বাস থাকলে পাঁচ বছর আগের সরকারকে নিশ্চয় টানতে হত না। নিজের কাজ দেখিয়ে ভোট টানাটাই সোজা হত। কিন্তু দৃশ্য ১-এ দেখা দিচ্ছেন জনসভায় মোদী। বলছেন কি ২০১৪-য় দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ হওয়া নিয়ে? যেমন, বারাণসী-সহ সারা ভারতের নয়া প্রজন্মের সদস্যদের চাকরির প্রতিশ্রুতি! বছরে ২ কোটির চাকরি হবে বলেছিলাম। কিন্তু সততার সঙ্গে বলছি, এটা আমার নিজের সঙ্গেই নিজের লড়াই। বেকার ভাইদের হয়ে। সততার সঙ্গে বলছি, এতটা পেরেছি, এতটা পারিনি। কিন্তু নিষ্ঠা ও চেষ্টার ত্রুটি ছিল না, থাকবেও না। তার পর আপনারাই বিচার করুন – এমন করেই বলতে পারতেন নরেন্দ্র ভাই মোদী মহাশয়। গত পাঁচ বছর তাঁর প্রতিশ্রুতিমাফিক ‘অচ্ছে দিন’ দেশের ক’ জন মানুষ দেখেছেন সবাই তা জানে। নিশ্চয়ই অস্বীকার করবেন না যে আর কেউ ‘অচ্ছে দিনে’র মুখ দেখুক না দেখুক, তিনি দেখেছেন। দেশ ও তার মানুষকে তিনি কী দিয়েছেন তার তাৎক্ষণিক বিচার করবেন ভোটাররা এবং চূড়ান্ত বিচার করবে ভাবীকাল ও ইতিহাস। কিন্তু নিশ্চয়ই তিনি অস্বীকার করবেন না যে দেশের মানুষ তাঁকে তাদের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছে। বসিয়েছে শ্রেষ্ঠত্বের সিংহাসনে। এই ধর্ম-বর্ণ-জাতি-সম্প্রদায়-শত্রু-মিত্র-ধনী-নির্ধনও তাঁর সমর্থক-বিরোধী নির্বিশেষে মানুষের অকুণ্ঠ দানে মহানুভব তিনি তো স্বভাবতই প্রতিদানের মুদ্রায় সব কিছুর ঊর্ধ্বে থেকে স্থায়ী আসন পেতে পারতেন শুধু বারাণসীতে নয়, সারা দেশে।

সারা দেশের মানুষ, বিশেষ করে নয়া প্রজন্ম তাঁকে যে বিরল সমর্থন দিয়েছিল তা যে কোনো সমকালীন রাজনেতার কাছে ঈর্ষণীয়। কিন্তু আপনি সেই অপার মহিমায় মগ্ন হওয়ার বদলে, ভাবে ও প্রভাবে অনুজপ্রতিম প্রতিদ্বন্দ্বীর ছিদ্র অন্বেষণে মনোনিবেশ করে তাঁর ভাবমূর্তি বাড়ালেন। প্রকৃত প্রতিষ্ঠা দিলেন। এবং যে স্লোগান নিয়ে এগোনোর কথা সেই ‘সবকা সাথ…’ ছেড়ে তেড়ে ধরলেন ‘পাকিস্তান।’ প্রশ্ন জাগে, গোয়েন্দা রিপোর্টে কি কোনো পরিবর্তনের গন্ধ ছিল? আপনার দলের ভেতর থেকে যত আওয়াজই উঠুক যে, ডোভালই ডোবাচ্ছেন কাশ্মীরে কট্টর হয়ে, তবু আপনি বিলক্ষণ জানেন ডোভাল-নীতিই মেরুকরণের মোক্ষম রসদ।

আরও পড়ুন চুরাশির ছায়া, জিম করবেটে নৌকাবিহার ও দেশপ্রেমের ভোট ২০১৯

তাই রণনীতির খাতিরে সীমান্ত নিয়ে সুর চড়াতে ক্ষতি কী? এটা তো আর সত্যি সত্যিই এসক‍্যালেশন নয়। ও পারের প্রতিবেশীও সেটা বোঝে। তা ছাড়া, আর কোনো ভাবেই তো বাগে আনা যাচ্ছে না কংগ্রেসকে। শুধু যুদ্ধের কথা তুললে টের পাবে বাছাধনেরা। না হলে চলবেই বা কী করে? উন্নয়ন, আর্থিক প্রগতি, শিল্প-বাণিজ্য সবই যখন ম‍্যাড়মেড়ে, তখন যুদ্ধ ছাড়া নান‍্যপন্থা। কংগ্রেসের একটা ডামি খাড়া না করলে ভোট জুটবে কেন? কিন্তু কংগ্রেস কোথায়? না আছে দেশে না আছে প্রদেশে। গোকুলে বাড়ছে তিলে তিলে গুজরাতের মতো দুর্গেও। দলিত আর অনগ্রসরদের উত্থান অনিবার্য এই ভোটে, জিগনেশ আর হার্দিকের হাত ধরে। গুজরাতেই বসছে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক। ওই উপলক্ষ্যেই হার্দিক পটেল যোগ দিচ্ছেন কংগ্রেসে। আহমেদ পটেলের পথনির্দেশ মেনে রাহুল অসামান্য সাফল্যের পথে এগিয়ে। এই কথাগুলো প্রকাশ্যে বলার নয়। এবং উত্তর প্রদেশে মায়া-অখিলেশ জয়েন্ট ভেঞ্চারের পাশাপাশি প্রিয়ঙ্কা-জ‍্যোতিরাদিত‍্যও কম চাপ নয়। সিট যে ক’টা কমবে সে ক’টাই তো ঘাটতি থেকে যাবে। এত ঘাটতি মিটিয়ে নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতার অঙ্ক মেলানো অসম্ভব কঠিন। সর্বোপরি, বিজেপিই ক্ষমতাসীন দল গত পাঁচ বছর। ২৩টা রাজ‍্যেও সত্তায়। উত্তর প্রদেশেও। কিন্তু সনিয়া, মনমোহন, রাহুলদের সামনে না দাঁড় করালে ভোট হবে না। এই অঙ্ক মেলানোর জন্যই পাকিস্তানকে চাই। পাকিস্তানের প্রসঙ্গ উঠলেই দুর্বল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সর্দারজিকে টেনে আনা যাবে। তার পর গরুর রচনা। তরতাজা যুদ্ধের হাওয়াবাতাস না থাকলে ২০১৪-র স্লোগান লোকে খেত না। তাই বিরোধীরা যে বলছে পুলওয়ামার ৪৯টা তাজা প্রাণ গেল কেন তার জবাব চাই, এই দাবি যথেষ্ঠ কুৎসিৎ। দেশদ্রোহী ছাড়া এ কথা কেউ বলতে পারে? কিন্তু পালটা প্রশ্নও উঠেছে। ৪৯ জন শহিদের রক্তে লাল হল দেশের মাটি। সেই রক্তপাতের বিনিময়ে কোন পক্ষের মোক্ষলাভ হল? এ প্রশ্ন নিয়েই দেশপ্রেমের প্রদর্শন চলেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। রাজ ঠাকরেও প্রশ্ন তুলেছেন, ভোটের আগে কি আরেকটা পুলওয়ামার আশঙ্কা রয়েছে? ইতিহাসে ভোটের অঙ্ক এ ভাবেই মিলেছে বারবার – সেই কারণেই। মোদী জনসভায় দাঁড়িয়ে বলছেন, ২৬/১১-র পর ফৌজ পাকিস্তানকে শিক্ষা দিতে চেয়েছিল। কংগ্রেস সরকার হতে দেয়নি। কিন্তু মিত্রোঁ, দেখুন আমরা জবাব দিয়েছি। উরির আর পুলওয়ামার পর। মোদী মোদী রবে উত্তাল সমাবেশ। কেউ জানতে চাইছে না, আগে ক’ বার জঙ্গিহানা ও কত জওয়ান ও সাধারণ মানুষ শহিদ হয়েছেন? এবং কাশ্মীরের সরকার কত দিন স্থায়ী হয়েছে আগের জমানায়? দেশদ্রোহ আর দেশপ্রেমের মেরুকরণ-প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়ে উঠছে। সমাবেশে লোক সমানে বাড়ছে।

আরও পড়ুন পুলওয়ামা হামলা কী দিল মোদীকে? 

হার্দিক পটেল বলছেন, দেশপ্রেম অন্তরে থাকে সবার। এটা বিজ্ঞাপন দেওয়ার জিনিস নয়। তা ছাড়া কোন দল কতটা দেশপ্রেমিক তা তো সেই দলের নেতাদের কাজ আর আত্মত্যাগের ইতিহাসেই স্পষ্ট। এ জন্য কারও কাছ থেকে সার্টিফিকেটের দরকার নেই। কিন্তু প্রধান সেবকের জনসভায় জনগণের উচ্ছ্বাস এ সব যুক্তি শোনে না। যুদ্ধের প্রসঙ্গ ছেড়ে প্রশ্ন করে না, অচ্ছে দিন, চাকরি এমনকি রামমন্দির নিয়েও। অরুণ জেটলি অন্য কোথাও ‘সবকা সাথ…’ বই প্রকাশ করছেন। রামমন্দিরের হাওয়া নেই বুঝে ও নিয়ে নীরবতাই শ্রেয়। লন্ডনে নীরব মোদীর নিরাপদ প্রবাস নিয়েও সব প্রশ্ন চাপা পড়ে গিয়েছে। রাফাল থাকলে পাকিস্তানকে আরও ঘোল খাওয়াতাম গোছের মন্তব্য চাঞ্চল্য কিছুটা ছড়ালেও দানা বাঁধেনি। শুধু আদালত দলগুলোকে সতর্ক করেছে। রামমন্দিরের গোপন আলোচনা ফাঁস করা যাবে না। আর, পুলওয়ামা বা তার পরবর্তী ঘটনাবলিতে জড়িত নায়কদের নাম বা ছবি রাজনৈতিক প্রচারে ব‍্যবহার করা চলবে না। উল্লেখ্য, বিজেপি ইতিমধ্যেই অভিনন্দনকে নিয়ে পোস্টার করেছিল।

সাবধানের মার নেই। শাসকদলের প্রধান প্রতারক বক্তৃতায় সব প্রসঙ্গ ছুঁয়ে যাচ্ছেন। জনসভায় অবশ্য প্রথমে আর শেষে পাকিস্তান। এতেই ভোট বাড়বে বলছেন সমীক্ষক সেফোলজিস্টরা। আর জয়ধ্বনি শুনতে শুনতে প্রচারক ভাবছেন আলেকজান্ডারের  কথা – “সত্য সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ!”

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here