প্রসিত দাস

গত বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রাপকের নাম,আমরা সবাই জানি,বব ডিলান। ইতিহাসের বিচিত্র ঠাট্টায় গত বছরই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন পশ্চিমী সঙ্গীতের আরেক ঈশ্বর লেওনার্দ কোহেন।

১৯৬৭ সালের এক ২৭ ডিসেম্বর সঙ্গীতের জগতে পা রাখেন লেওনার্দ কোহেন। বাজারে আসে তাঁর প্রথম রেকর্ড ‘সংস অফ লেওনার্দ কোহেন’। ততদিনে অবশ্য প্রকাশিত হয়ে গেছে তাঁর বেশ কয়েটা কবিতা সংকলন ও দু’টো উপন্যাস (‘দ্য ফেভারিট গেম’ ও ‘বিউটিফুল লুসারস’)। উপন্যাস দু’টো, বিশেষত ‘বিউটিফুল লুসারস’ যৌন অনুপুঙ্ক্ষের কারণে সমালোচক মহলে বিশেষ কলকে পায়নি।

আসলে বরাবরই লেখক হতে চেয়েছিলেন কোহেন। ছাত্রাবস্থায় কোনো গায়কের তুলনায় ডব্লু.বি. ইয়েটস বা লোরকার মত কবিরাই তাঁকে প্রভাবিত করেছিল ঢের বেশি (পরে নিজের মেয়ের নামও রাখেন লোরকা)।

হাইড্রা নামে গ্রিসের একটা ছোট্ট দ্বীপে বসে লেখেন ‘প্যারাসাইটস অফ হেভেন’ নামক কবিতা সংকলন ও ‘বিউটিফুল লুসারস’। আলাপ হয় মারিয়ান নামে এক বিবাহিতা মহিলার সঙ্গে। পরে তাঁকে নিয়ে লেখেন ‘সো লং, মারিয়ান’।

কোহেন গান লিখতে শুরু করেন মূলত আর্থিক বেহাল দশা কাটানোর জন্য। নিউ ইয়র্কে এসে আলাপ হয় গায়িকা জুডি কলিন্সের সঙ্গে। কলিন্সের অনুরোধে নিউ ইয়র্কের টাউন হলে ভিয়েতনাম যুদ্ধ-বিরোধী সমাবেশে ‘সুজান’ গানটা গাইতে গিয়ে প্রথম স্তবকের পর আর গাইতে পারছিলেন না (ভাবা যায়!)। প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে গান গাওয়া নিয়ে এই আড়ষ্টতা কোহেন পরিণত বয়সের আগে কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তবে সে তো অনেক পরের কথা।

ডিলান তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন ‘হ্যালেলুইয়া’ গানটা লিখতে তাঁর কত সময় লেগেছে। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘বছর পনেরো।’। কোহেন পালটা প্রশ্ন করেন ‘আই অ্যান্ড আই’ গানটা লিখতে ডিলানের কত সময় লেগেছে। ডিলানের উত্তর ছিল, ‘পায় মিনিট পনেরো।’

১৯৬৬ সালের নভেম্বর মাসে জুডি কলিন্স ‘সুজান’ গানটা রেকর্ড করেন তাঁর ‘ইন মাই লাইফ’ অ্যালবামের জন্য। এরপরই কোহেন কিংবদন্তী রেকর্ড প্রোডিউসার জন হ্যামন্ডের নজরে পড়ে যান। এই হ্যামন্ডই আবিষ্কার করেছিলেন ডিলান ও জ্যাজ তারকা বিলি হলিডের মত প্রতিভাদের। ১৯৬৭ সালে কোলম্বিয়া রেকর্ডস থেকে প্রকাশিত হয় ‘সংস অফ লেওনার্দ কোহেন’। এই অ্যালবামে ছিল ‘সিস্টার্স অফ মার্সি’, ‘উইন্টার লেডি’, ‘সো লং মারিয়ান’ এবং অবশ্যই ‘সুজান’-এর মত ইতিহাস-হয়ে-যাওয়া গান। ব্যস, আর কী! আপামর সঙ্গীতপ্রেমীরা পেয়ে গেলেন প্রেম ও বিষণ্ণতার সন্তকে।

গান লিখতে শুরু করার ঢের আগেই বলেছিলেন তাঁর লেখার পাঠক ‘মনোবেদনার বিভিন্ন স্তরে থাকা প্রেমিক প্রেমিকারা’। স্বয়ং ডিলান বলেছেন তাঁর গান ‘প্রার্থনার মত’।

ন’ বছর বয়সে বাবার মৃত্যু তাঁকে প্রবল নাড়া দিয়েছিল। একটা কাগজে কয়েক লাইন লিখে বাবার কফিনের সঙ্গে সেটা রেখে দেন। এটাই কোহেনের প্রথম স্মরণযোগ্য রচনা।

প্যারিসের এক ক্যাফেতে বসে ডিলান তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন ‘হ্যালেলুইয়া’ গানটা লিখতে তাঁর কত সময় লেগেছে। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘বছর পনেরো।’ (কথাটা সত্যি নয়, আসলে লেগেছিল পাঁচ বছর।)। কোহেন পালটা প্রশ্ন করেন ‘আই অ্যান্ড আই’ গানটা লিখতে ডিলানের কত সময় লেগেছে। ডিলানের উত্তর ছিল, ‘পায় মিনিট পনেরো।’

আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান তাঁর গানের মত তাঁর সাদাসিধে জীবনযাপনেরও অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যদিও জন্মসূত্রে ইহুদি কোহেন বারবার বলেছেন নিজের ধর্ম নিয়েই তিনি সন্তুষ্ট। ইসরায়েল-প্যালেস্তাইন প্রশ্নে বরাবরই প্যালেস্তাইনের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু এসবের মধ্যেই জারি থেকেছে তাঁর আধ্যাত্মিক খোঁজ। নব্বইয়ের দশকে সুসাকি রোশি নামে এক জেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে দীর্ঘদিন জেন মেডিটেশন সেন্টারে সাধনার মধ্যে কাটিয়েছেন। আবার রমেশ বালসেকারের বই পড়ে সৎসঙ্গের ভাবধারায় আকৃষ্ট হওয়া মাত্র প্লেন ধরে সোজা চলে আসেন মুম্বই। প্রায় বছর খানেক মুম্বইতে ছিলেন।

বাড়ি ফিরে টের পেলেন তাঁর ম্যানেজার কেলি লিঞ্চ তাঁকে দীর্ঘদিন ধরে ঠকিয়ে আসছে। লিঞ্চের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে বাধ্য হলেন। আদালতের রায়ে বিপুল অঙ্কের (৯০ লক্ষ মার্কিন ডলার) ক্ষতিপূরণ পেলেন। কিন্তু জাত সজ্জন কোহেন কোনোদিনই টাকাটা উদ্ধার করার উদ্যোগ নিতে পারেননি। তাই সত্তরোর্দ্ধ বয়সে তাঁকে বেরোতে হল বিশ্ব সফরে। পরিণত বয়সের কোহেনকে চাক্ষুষ করে, তাঁর গান শুনে দুনিয়া জুড়ে সঙ্গীতপ্রেমীরা মাতোয়ারা হয়ে ওঠেন।

২০১৬ সালে, বিরাশি বছর বয়সে, প্রকাশিত হয়েছে তাঁর শেষ অ্যালবাম ‘ইউ ওয়ান্ট ইট ডার্কার’।

ঠিক অর্ধশতাব্দী আগে আজকের দিনেই সঙ্গীতের জগত পেয়েছিল এই ঈশ্বরপ্রতিম গায়ক ও গীতিকারকে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here