rahul on kailas pilgrimage
কৈলাসে রাহুল। ছবি সৌজন্যে জি নিউজ।
দেবারুণ রায়

কৈলাসে কেলেঙ্কারি। প্রাচীন মন্দির, নাটমন্দির, মসজিদ বা সাতমহলা রাজবাড়ি, জমিদারবাড়িতে কখনও গিয়েছেন? বিশেষ করে যেগুলো পরিত্যক্ত। আলো-আঁধারির অন্দরমহলে পর্যটকদের ক‍্যামেরার ফ্ল‍্যাশলাইট জ্বললেই দলে দলে চামচিকের ঝাপটা ঝাপটি। ডানার ঝাপটা খেয়েই ঢুকতে হয়। পোড়োবাড়ির স্থায়ী বাসিন্দারা জানিয়ে দেয়, ওটা তাদের খাসতালুক। ওখানে আমআদমির নো এন্ট্রি। তবুও নাছোড় উৎসুক আগন্তুক। প্রাচীন সভ‍্যতা সুপ্রাচীন সংস্কৃতির দেশকে আবিষ্কার করতে হলে তো পুরোনো ইমারতগুলোর চৌকাঠ ডিঙোতেই হবে। বোঝা মুশকিল, পরিবেশ ও প্রকৃতিপ্রেমীরা কী বলবেন। তবে অন্ধকারে আলো ফেলার অধিকার তো সব ধর্মেকর্মেই স্বীকৃত। অন্ধকারের কোনো প্রকাশ‍্য দাবিদার নেই।

ধর্ম সম্পর্কে উদাসীন বা আ্যগনস্টিক ছিলেন নেহরু।  মনে করতেন, এটা ব‍্যক্তিগত  বিশ্বাসের বিষয়। রাষ্ট্র কোনো বিশেষ ধর্মের ধামাধরা হতে পারে না।

গত কয়েক দিন ধরে কৈলাসযাত্রা নিয়ে শুরু হয়েছে বিরাট ধুন্ধুমার। লক্ষ বার বিভিন্ন দলের লোকেরা দলে দলে কৈলাসে গিয়েছেন। ধর্মপ্রাণ বিজেপির তো কথাই নেই। অনেকের মধ্যে বিশেষ করে মনে পড়ছে উমা ভারতীকে। দল থেকে বহিষ্কার পর্বের আগে পরে দুর্গম তীর্থে গিয়ে শিবঠাকুরের কাছে নালিশ জানিয়ে বিজেপি হাইকমান্ডের বুকে কাঁপন ধরিয়েছেন। কংগ্রেসেরও বহু নেতা এবং দলে নির্দলে বহু ভক্ত তিরুপতি থেকে কৈলাস, কেদার থেকে কালীঘাট কিংবা পশুপতি বা অমরনাথে হত‍্যে দিয়েছেন। কিন্তু নেতানেত্রীদের তীর্থযাত্রা নিয়ে কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক বাঁধানো হয়নি। এই অধ‍্যায় শুরু হল ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের কাল থেকে। যার তীব্রতা রাহুল গান্ধী কংগ্রেসের সহ-সভাপতি হওয়ার পর আকাশ ছুঁয়ে গেল। প্রথমে গুজরাতের মন্দিরে মন্দিরে সদল রাহুলের পুজো দিতে যাওয়ায়। সোমনাথের মতো বিখ্যাত মন্দিরে যে দিন গেলেন রাহুল, সে দিন জওহরলাল নেহরুকেও ছেড়ে কথা বলল না বিজেপি। ধর্ম সম্পর্কে উদাসীন বা আ্যগনস্টিক ছিলেন নেহরু।  মনে করতেন, এটা ব‍্যক্তিগত  বিশ্বাসের বিষয়। রাষ্ট্র কোনো বিশেষ ধর্মের ধামাধরা হতে পারে না।

আরও পড়ুন স্বৈরাচার যত উলঙ্গ হচ্ছে ততই জোরদার হচ্ছে বিরোধী জোট

ইন্দিরা অবশ্য সব ধর্মস্থানেই যেতেন। যেতেন দিল্লির বাঙালিদের প্রতিষ্ঠিত কালীবাড়ি ও তাঁর গুরু আনন্দময়ী মায়ের বাঙালি আশ্রমে।  রাজীব গান্ধী ধর্মবিশ্বাস নিয়ে তেমন মাতামাতি না করলেও রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে বিজেপির সঙ্গে পাঞ্জা কষতে ধর্মীয় অনুষঙ্গ রাখতেন তাঁর রণনীতিতে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, অযোধ্যায় রামমন্দিরের বিতর্কিত ইমারতের দরজার তালা তিনিই খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। মন্দিরের শিলান‍্যাস তো করিয়েছিলেন বটেই, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বুটা সিংকে পাঠিয়েও ছিলেন অযোধ্যায়, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কর্মসূচি সমর্থনের প্রতীকী স্বাক্ষর হিসেবে। মানে লুকিয়েচুরিয়ে নয়। প্রকাশ‍্যে। জনগণকে জানাতে, যে রামে শুধু বিজেপিই নেই, কংগ্রেসও আছে। ‘৮৯-এর ভোটের প্রচারও শুরু করলেন অযোধ্যা থেকে। তীব্র সমালোচনা উঠল সেকুলার শিবিরের তরফে। কিন্তু রাজীব তাঁর কক্ষ বদলালেন না।

রাহুলের নেতৃত্ব শুরু শূন্য থেকে। কিন্তু মন্দিরে মাথা কুটে বুকে কাঁপন ধরালেন শাসক বিজেপির। রাহুলকে সোমনাথ যেতে দেখে ঘুম উড়ে গেল অমিত শাহের।…কোনোমতে গরিষ্ঠতার অঙ্ক মিলল ঠিকই, কিন্তু জয়ের বিপুল ব‍্যবধান মিইয়ে গেল।

গুজরাত বিধানসভার এর আগের বারের ভোটে অম্বাদেবীর মন্দির থেকে প্রচারে নামলেন সনিয়া এবং স্লোগান দিলেন, মওত কি সওদাগর। কোনোটাই কাজে লাগল না। উলটে নরম হিন্দুত্বের লাইন নেওয়ার দায়ে দায়ী হলেন। রাহুল নেতা হওয়ার পর হালহকিকত বদলে গেল। গুজরাত-জয় না হলেও কেন্দ্রে ক্ষমতায় ফিরেছিল কংগ্রেস, দশ বছরের  জন্য। সনিয়ারই সে কৃতিত্ব প্রাপ্য। তার আগে রামনাম করেও রাজীব মসনদ বাঁচাতে পারেননি। রাহুলের নেতৃত্ব শুরু শূন্য থেকে। কিন্তু মন্দিরে মাথা কুটে বুকে কাঁপন ধরালেন শাসক বিজেপির। রাহুলকে সোমনাথ যেতে দেখে ঘুম উড়ে গেল অমিত শাহের। তিনি ছুটলেন সোমনাথ আর প্রধানমন্ত্রী সি প্লেন নিয়ে নামলেন অমদাবাদের সবরমতীতে। কোনোমতে গরিষ্ঠতার অঙ্ক মিলল ঠিকই, কিন্তু জয়ের বিপুল ব‍্যবধান মিইয়ে গেল। আসন ও মার্জিন, দুইই কমে গিয়ে শিক্ষা হল শাসকের। প্রচণ্ড উৎসাহিত হল কংগ্রেস। গ্রামে কংগ্রেসের শক্তিবৃদ্ধির পাশাপাশি মলঘেরা শহরেই মাথা বাঁচাল বিজেপি।

এত দিন পর্যন্ত কংগ্রেসের নরম হিন্দুত্বকে দুয়ো দিয়েছে কমিউনিস্টরা। ধর্ম-রাজনীতির মিশেল বিরোধী নেহরুনীতিতে আস্থা ছিল তাদের। ইন্দিরা-জমানা নেহরুর গণতান্ত্রিকতা আর যুক্তরাষ্ট্রীয়তার সঙ্গে সঙ্গে ধর্ম থেকে রাজনীতিকে দূরে রাখার নীতি খারিজ করার সময় থেকেই বামেরা তাঁকে দুষেছে। কিন্তু ৭১-এ পাক-যুদ্ধ জয়ের পর সংঘ কার্যত মেনে নেয় ইন্দিরার ক‍্যারিশমা। বাজপেয়ী প্রকাশ‍্যেই বলেন, মা দুর্গা।

জরুরি অবস্থার আগে থেকেই কমিউনিস্ট পার্টির জোট ছিল ইন্দিরার সঙ্গে। জরুরি অবস্থার শেষ দিকে তীব্র বিরোধী-নিধনের সময় বামেদের বাকি অংশেও ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছিল কংগ্রেসের সঙ্গে কৌশলগত বোঝাপড়া নিয়ে। রাজীব-জমানাতেও সাম্প্রদায়িকতার কাছে নতি স্বীকার করার দায়ে বামেরা দায়ী করেছে কংগ্রেসকে। রাহুলের মন্দির-প্রদক্ষিণ নিয়ে বক্রোক্তি বহাল থাকলেও গত বিধানসভার ফলের পর তার তীব্রতা কমেছে। এ দিকে, রাহুল বংশগত শিবভক্তির কথা ঘোষণা ও নিজেকে শিব-অনুরাগী বলে দাবি করায় বিজেপির মেরু রাজনীতির মাতব্বরেরা চমকে যান। তারা বিদেশিনি আখ‍্যা দিয়ে সনিয়াকে রুখেছেন। ভদ্র-ঘরণী বলে প্রিয়াঙ্কাকে।  গুজরাতের প্রচারপর্বেই ইতালিতে রাহুলের মামাবাড়ি বলে কার্যত হাওয়ার মোড় ঘোরাতে চেয়েছেন। উদ্দেশ্য ছিল তাঁকেও ইতালীয় বলে চালানোর। কিন্তু ইন্দিরার নাতিকে বিদেশি বানাতে না পেরে তার শিবভক্তির আগমার্কা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন ধর্মের জায়গীরদাররা।

আরও পড়ুন নোটবন্দি: অচ্ছে দিনের হোতা কী চেয়েছিলেন আর কী পেলেন?

কিন্তু তাতে হালে পানি পায়নি বিজেপি।  বরং হার্দিক, জিগনেশ, অল্পেশদের সামাজিক হাল্লাবোলের পাশাপাশি মন্দির-প্রদক্ষিণ ঘেরা রাহুল-রাজনীতির টনিক বিরোধী জোটের রাস্তা সাফ করেছে। আহমেদ প‍্যাটেলের রাজ‍্যসভায় ফেরা থেকেই গুজরাতে কংগ্রেসের ঘুরে দাঁড়ানো শুরু। অসুস্থ সনিয়া সময় দিতে পারেননি। একাই গুজরাতের ফ্রন্ট সামলেছেন রাহুল। সেই সঙ্গে মনমোহনের প্রচার শহরে কিছুটা হাত বাড়িয়েছে কুলীন ভোটারদের দিকে। এ ভাবেই গুজরাতের অঙ্ক মিলিয়ে আনার সূত্র হাতে আসার পর সংসদে মোদীর আক্রমণ রোখার নতুন অস্ত্র খুঁজে পেলেন কংগ্রেস সভাপতি। তিনি মোদীর মতো ভাষণবেত্তা নন। ধারে ও ভারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর পেরে ওঠাও অসম্ভব। সেই সঙ্গে পরিবারতন্ত্রের তাস চা-ওয়ালার গ্রাফ ঊর্ধ্বে তোলার সঙ্গে সঙ্গে তার পথ আটকেছে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে। রাহুল সংসদে উঠে দাঁড়িয়ে কূটকৌশলের পথে না হেঁটে সরল অঙ্ক করলেন। বললেন, আপনাদের (বিজেপি) বিরুদ্ধে আমার মনে কোনো কু-ভাবনা নেই। আপনারা যদি আমার সম্পর্কে এমন ভাবনা পোষণ করেন তা হলেও আমি করি না। আমি আপনাদের ভালো চাই। আর মোদীজিকে উদ্দেশ করে বললেন, আপনার কাছেই আমি হিন্দু ধর্মের মর্ম বুঝতে শিখেছি। এখানেই থামলেন না। মোদীর বিরুদ্ধে তীক্ষ্ণ আক্রমণাত্মক ভাষণ দেওয়ার পর সটান ফ্লোর ক্রস করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে তাঁকে উঠে দাঁড়াতে অনুরোধ করলেন। তার পরই আসনে আসীন প্রধানমন্ত্রীকে আলিঙ্গন করলেন নিবিড় ভাবে। ট্রেজারি বেঞ্চ-সহ পুরো সভা হতভম্ব। স্পিকার সুমিত্রা মহাজন হতবাক। বিজেপির কিছু সদস্য আলতো আওয়াজ তুলতে গেলেন। কিন্তু সে সব ভেসে গেল অনেকের তারিফে। এ বার সিটে ফিরে দৃশ্যত বাজিমাত করার সন্তুষ্টিতে রাহুল প্রমাদ ঘটালেন। জ‍্যোতিরাদিত‍্যর দিকে তাকিয়ে চোখ নাচালেন। সে দৃশ্যও ধরা পড়ল ক‍্যামেরায়। এবং মোদী উঠে অঙ্গভঙ্গি করে রাহলের শেষ মুহূর্তের বালখিল্যকেই অস্ত্র করতে চাইলেন। রসিকতায় মাত করলেন সভা, কিন্তু তা বীররসে নয়। ফলে চোখের চটুলতা ছাপিয়ে গেল রাহুলের আলিঙ্গন। ক‍্যারিশমাকে চ্যালেঞ্জ করে সারল‍্যের রাজনীতির রং বাড়ালেন রাহুল। দেখা গেল, দেশের মানুষ এই গান্ধীগিরি গ্রহণ করেছে। চৈতন্যবাদেই চৈতন্য ফিরছে হিন্দি হৃদয়ের। বোঝা যাচ্ছে হিন্দুহৃদয়সম্রাটের কর্মসূচি দেখে। আক্রমণ তীব্রতর হয়েছে বিজেপির। পুরো মাত্রায় রাহুলকেন্দ্রিক। তিনি দেশে-বিদেশে যেখানেই যান, নেমে পড়ছে বিজেপি আর তার সৌরমণ্ডল, মানে মিডিয়ার মোদীমুগ্ধ বিরাট মহল।

নেপালে বসুর সফরসঙ্গী সীতারামকেও প্রোটোকলের প‍্যাঁচে পড়ে পশুপতিনাথ দর্শন করতে হয়েছিল। পলিটব্যুরোর সদস্যরা শিবতীর্থে কী ভাবে যাবেন প্রশ্ন তুলেছিলেন ইয়েচুরি। বসুর জবাব ছিল, “যে ভাবে বিদেশি অতিথিরা রাজঘাটে যান।” যুক্তিতে মাত সীতারামের শিবভক্ত পিতৃদেবের জন্য পশুপতিনাথের মহামূল্যবান রুদ্রাক্ষ নিয়ে  এসেছিলেন ঘোর নাস্তিক জ‍্যোতিবাবু।

আঞ্চলিকরা কেউ কেউ না বুঝে বা সার বুঝে রাহুল-বধে সায় দিচ্ছিলেন। কিন্তু মেরুকরণ তীব্র দেখে এবং কংগ্রেসের সংযত শর্ত জেনে তাঁরা দেশ ও দলের দিকে তাকালেন। এনডিএতে বিজেপির দাদাগিরি প্রশ্নাতীত। যে গুমোর একদা ছিল কংগ্রেসের। সেই তালপুকুরে যখন ঘটি ডোবে না তখন আর ভাবনা কী? বামেরা, মানে সিপিএমও রাহুলের শিবসূত্র নিয়ে কম সোচ্চার। রাহুল তো আর সুভাষ চক্রবর্তী নন,  যে তারাপীঠ নিয়ে তাড়াহুড়ো চাই। রাহুলের তীর্থযাত্রা তাই তর্কাতীত। ওতে বিজেপি ছাড়া কারও কষ্ট নেই। তীর্থযাত্রা নিয়ে বিজ্ঞাপন দিতে আপত্তি থাকতেই পারে তাঁদের যাঁরা মতাদর্শে নাস্তিক। নেপালে বসুর সফরসঙ্গী সীতারামকেও প্রোটোকলের প‍্যাঁচে পড়ে পশুপতিনাথ দর্শন করতে হয়েছিল। পলিটব্যুরোর সদস্যরা শিবতীর্থে কী ভাবে যাবেন প্রশ্ন তুলেছিলেন ইয়েচুরি। বসুর জবাব ছিল, “যে ভাবে বিদেশি অতিথিরা রাজঘাটে যান।” যুক্তিতে মাত সীতারামের শিবভক্ত পিতৃদেবের জন্য পশুপতিনাথের মহামূল্যবান রুদ্রাক্ষ নিয়ে এসেছিলেন ঘোর নাস্তিক জ‍্যোতিবাবু। কিন্তু ভোটসভায় সঙ্গত কারণেই এই গল্প শুনিয়ে ফায়দা তোলেনি সিপিএম। তার দরকার হয়নি কেরল, বঙ্গ, ত্রিপুরায়। উত্তরপ্রদেশ, বিহারে না হয় অন্য জেট। কিন্তু রাজস্থানের ধু ধু বালিয়াড়িতে কংগ্রেস ছাড়া কে আছে মরুবিজয়ের কেতন ওড়াতে? কে আছে মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগঢ়, মহারাষ্ট্র, এমনকি সুদূর উত্তর-পূর্বের অন্তত ২৩টি লোকসভা আসনে? (চলবে)

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন