rahul gandhi and mihir patel
কৈলাসের পথে মিহির প্যাটেলের সঙ্গে রাহুল গান্ধী। ছবি সৌজন্যে ইন্ডিয়া টুডে।
দেবারুণ রায়

ধর্ম-রাজনীতির মিশেল বন্ধ করতে দলের ভেতর বিরোধিতা অগ্রাহ্য করে বাম-হাত ধরেছিলেন বিশ্বনাথপ্রতাপ সিংহ। বাবরি মসজিদ বাঁচাতে প্রধানমন্ত্রীর গদি ছাড়লেও জামা মসজিদে যাননি ইমাম বুখারির মন্ত্রণা নিতে। নিজের ঠাকুর পরিচয় বিসর্জন দিয়েছিলেন। মণ্ডলের কারণে ঠাকুররাও তাঁকে ত‍্যাজ‍্য করেছিল। এ হেন ভিপি উত্তরপ্রদেশের মুসলমান অধ‍্যুষিত আসনে ভোট প্রচারে গিয়ে বলতেন, দলিত, পিছড়েদের আদি মসিহা মহাদেব। দেখো না, ওই দেবতার কোনো কৌলীন‍্য নেই। ভূতপ্রেত পিশাচ আর সাপখোপরাই ওঁর সঙ্গী। ওরাই দলিত, ‘দবে হুয়ে কুচলে হুয়ে আম আদমি’। ৯৮ পর্যন্ত রুখেছিলেন সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ। নিচু তলার আগমার্কা শ্রেণিরাজনীতিকে জাতপাত বলে হ‍্যাটা করে যে আলালের ঘরের দুলালরা প্রেসিডেন্সির গেটে বসে জুতো পালিশের নামে  নিজেদের বিচ্ছিন্ন করেছে স্বদেশের মূলস্রোত থেকে তারা মহামতি গোখেলের কথাকেই মিথ্যে প্রমাণ করেছে।

ধর্ম-রাজনীতির মূল ভাব নিয়েও ভাসা ভাসা মন্তব‍্যের সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাও বিজেপি নেতাদের বলেছিলেন ‘৯৬ সালে: “তোমাদের হাতে একে ৪৭। আর আমরা লড়ছি খালি হাতে। তোমরা অস্ত্র করেছ রামকে‌। আমরা সভ‍্যতা, আদর্শ, গণতান্ত্রিক নীতির প্রশ্নে মানুষের খাওয়া-পরার সমস্যার কথা বলছি। কিন্তু কালাশনিকভের সঙ্গে এটা অসম লড়াই।”

আরও পড়ুন কৈলাসে কেলেঙ্কারি: বিজেপির আন্ডারহ্যান্ড হাঁকালেন রাহুল, বল গেল গুজরাতে/১

রাওয়ের  কথা যুক্তিবদ্ধ ছিল বলেই কেন্দ্রে দু’ বছর টিকেছিল যুক্তফ্রন্ট। জ‍্যোতিবাবু‌ হিন্দি বলয়ে গিয়ে বলতেন, আমরা কমিউনিস্টরা রাম বুঝি না। আমরা চিরকাল মানুষের কথা বোঝার চেষ্টা করেছি। মানুষের জন্য লড়াই করেছি। অন্য কিছু বুঝিনি। এখন আমার সঙ্গী অন্য দলের নেতারা যা বললেন এ সব কথা, পুরাণ, ধর্ম, রামায়ণ আমাদের পরিচিত প্রসঙ্গের বাইরে। তিনি এ ভাবেই বলতেন জোট রাজনীতির কথা। সাধারণত ধর্মবিশ্বাসকে আঘাত করে নিজের মত ফলাতেন না। যা অন্য কেউ কেউ করেছেন।

বাংলার মুখ‍্যমন্ত্রী বিজেপি-বিরোধী লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান নেত্রী। তিনি রাহুল গান্ধীর মতো পরিবারের পাদপ্রদীপের আলো পাননি। দেশবন্ধুর দৌহিত্রী কিংবা নেতাজির ভ্রাতুষ্পুত্রী নন। রাজনীতিতে উত্থানপর্বে তাঁর ইউএসপি ‘পিপলস পালস’। মানুষের নাড়ি দেখার বিদ্যা রপ্ত করেছেন চল্লিশ বছরের রাজনৈতিক জীবনে। ‘৮৫ থেকে শুরু কার্যত লাগাতার সংসদীয় জীবন। প্রশাসনে ‘৯১ থেকে। বিজেপিকে ফাঁকা মাঠ ছেড়ে দেননি। তাই বাংলার ত্রিসীমানায় ত্রিপুরা নেই। শুধু সাম্প্রদায়িক শক্তি নয়। ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরেরও বড়ো অংশ জোট বেঁধে তৃতীয় স্থান পায়। বিজেপি বুক ঠুকে বলে তারাই মূল বিরোধী। এই উত্থান অলৌকিক নয়। রীতিমতো দ্বান্দ্বিক রসায়ন আছে। কিন্তু তাতে কী হবে? জনারণ্যে দাঁড়িয়ে নেত্রী মন্ত্রোচ্চারণ করেন, জয়ন্তী মঙ্গলাকালী …….। মা মাটি মানুষকে প্রণাম আর সালাম জানিয়ে উচ্চারণ করেন, ইনশাআল্লাহ। জয়ধ্বনিতে ফেটে পড়ে উচ্চকিত জনসমুদ্র।

এবং মোহনদাস করমচন্দ গান্ধী। জীবনের সারাংশ হিসেবে তিনি রেখে গিয়েছেন তাঁর গণতন্ত্র আর সামাজিক ন্যায় দিয়ে গড়া রামরাজের স্বপ্ন‌‌। অনায়াসে বলতে পারতেন স্বনির্ভর কল‍্যাণরাষ্ট্রের কথা। কিন্তু বলেননি। কারণ তাঁর মতো করে ভারতের গরিব গুরবোর নাড়ি দেখেননি আর কোনো পালা বদলের নেতা। নির্জলা লাল ও গাঢ় গেরুয়ার মধ্যে দিয়ে পদযাত্রা করতে করতে দেশ কাল মানুষ চিনেছেন। তাই রামনাম আর কৌপীনধারী সাধুর বেশ। গানহি বাওয়া। সংঘ পরিবারে কট্টর গান্ধী-বিরোধী ও গডসে-ভক্তের অভাব নেই‌। কিন্তু সংঘেরই ইচ্ছায় বিজেপির ম‍্যাসকট হিসেবে যে ক’ জন অহিন্দুত্ববাদী নেতা ও মনীষীকে দলের আদর্শ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে সেই তালিকায় বিবেকানন্দ, সুভাষচন্দ্র আর জয়প্রকাশ ছাড়া আছেন গান্ধীজি। ঐতিহাসিক ক্ষণ। বিড়লাবাড়িতে মহাত্মাকে টার্গেট করে এগিয়ে গেল নাথুরাম। গর্জে উঠল তার হাতের আগ্নেয়াস্ত্র। বুলেটবিদ্ধ মানুষটি লুটিয়ে পড়ার মুহূর্তে শেষ বার বললেন, ‘হে রাম’। নাথুরামের সংসার আর সংস্কারের বিরুদ্ধে স্বাধীন ভারতের প্রথম শহিদের শেষ জবাব। রাও যাকে কালাশনিকভ বলেছিলেন। সেকুলার শিবিরের নেতা গান্ধী বলেই আজও বিজেপি অপরাজেয় নয়।

‘পাপ্পু’ কি আদৌ কৈলাসে? নাকি লোক ঠকাতে ফটোশপ করছেন? জবাবে এল বিশল‍্যকরণী। সতীর্থযাত্রী গুজরাতের যুবা মিহির প‍্যাটেল রাহুলের সঙ্গেই ৩৪ কিমি হেঁটেছেন কৈলাসযাত্রায়।…বাড়া ভাতে ছাই পড়ল মিহির প‍্যাটেলের দেওয়া সাক্ষ্যে।

এ সব অজানা নয় বিজেপির চৌকস নেতাদের। তবুও যে কোনো মূল্যে রাহুলকে তাদের রুখতেই হবে। লোকসভার ঘাটতি পুষিয়ে বৃদ্ধি ঘটানো কার্যত অসম্ভব। তায় ‘১৪-য় বলা ‘অচ্ছে দিন’ আরও কাল করেছে। তরুণ প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখানোর কালে ভিলেন সাজানো মনমোহনের ৮০ পার। তিনি তখন সবে ৬২। কিন্তু এখন ৬৭ বনাম ৪৭। ৫৬ ইঞ্চির হুংকারও ছাতু হয়ে গিয়েছে। অতএব কৈলাসে সাবধান। মোদী, শাহ আগেই মুখ নষ্ট করেছেন। তাই এ বার মুখপাত্র সম্বিৎ আর মন্ত্রী গিরিরাজের ক‍্যারিশমা। আগে বাউন্সার বুমেরাং হল। এ বারে তাই স্পিন। সম্বিৎ ফিরল, কৈলাসে কেলেঙ্কারি দেখে। মনে হয়েছিল বাছাধনকে এ বার রামশিক্ষা দেওয়া যাবে। র‍্যাফেল নিয়ে আর রা কাটতে হবে না। স্পিনের ডোজ বাড়িয়ে দিলেন গিরি। ‘পাপ্পু’ কি আদৌ কৈলাসে? নাকি লোক ঠকাতে ফটোশপ করছেন? জবাবে এল বিশল‍্যকরণী। সতীর্থযাত্রী গুজরাতের যুবা মিহির প‍্যাটেল রাহুলের সঙ্গেই ৩৪ কিমি হেঁটেছেন কৈলাসযাত্রায়। ১৫ জন পরিবারের সদস্য সঙ্গী। মিহির গুজরাতের বাড়িতে ভিডিও কলে বৌয়ের সঙ্গে কথা বললেন, রাহুলকেও বলালেন। সম্বিৎ তখনও ফেরেনি। গিরিও গাঁইগুঁই করছেন, হুঃ, যত্তোসব। পাহাড়ে ৩৪ কিমি কখনও ৮ ঘণ্টায় হয়? একী ছেলেভোলানো গপ্পো! কিন্তু বাড়া ভাতে ছাই পড়ল মিহির প‍্যাটেলের দেওয়া সাক্ষ্যে। একে গুজরাত তায় প‍্যাটেল! এ তো ছেলে না। বুড়োভোলানো গল্প। সম্বিৎ ফিরল। গিরিরাজের আন্ডারহ‍্যান্ড এমন হাঁকিয়েছেন রাহুল যে একদম কৈলাস থেকে গুজরাতে। একেবারে মার কৈলাস! (শেষ) 

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন