কণিষ্ক চৌধুরী:

আদিম মানুষ সভ্যতার পথে যে যাত্রা শুরু করেছিল তার প্রথম ও বিরাট পদক্ষেপটি ছিল কৃষির আবিষ্কার। মাত্র সাত হাজার বছর আগে কৃষি উৎপাদনের মধ্যে দিয়ে নিজেদের জীবন সুস্থির ও সুনিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছিল মানুষ। কিন্তু সে আদিম অন্ধকারে কে প্রথম জ্বালিয়েছিল এই সভ্যতা সৃষ্টির প্রদীপটি? উত্তরটি হল নারী, নৃতাত্ত্বিক ও সমাজ বিজ্ঞানীদের মত এটাই। আদিম পর্যায়ে কৃষিকর্ম নারীর হাতে আবিষ্কৃত হয়েছিল এবং তাই কৃষি নারীর এক্তিয়ারের মধ্যে বহুদিন আবদ্ধ থেকেছে। ফলে সমাজটি ছিল নারী প্রাধান্যমূলক। পরবর্তীকালে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের আবির্ভাব ঘটলেও মাতৃতান্ত্রিক সমাজের বহু আচার, আচরণ, সংস্কার স্মৃতির মতো থেকে গেল সমাজের গর্ভে। আর্য আগমন, বৈদিক যুগ, পৌরাণিক পর্ব ইত্যাদি স্তরগুলির মধ্যেও তাই পাওয়া যাবে মাতৃতান্ত্রিক সংস্কারের চিহ্ন। যা আবার পরবর্তী সময়েও বহমান।

বিরক্ত হচ্ছেন না তো? আসলে এ কথাগুলি না বললে আমরা কালীপূজা ও দীপাবলির গল্পে ঢুকতে পারব না। যেমন ধরুন, কালীপূজার আগের দিন চোদ্দো শাক (ওল, কালকাসুন্দি, নটে, গুলঞ্চ, পলতা, নিম, হিঞ্চে, শুল্‌পো, সরষে, জয়ন্তী, বেতো, শুসনি, খেসারি এবং হেলঞ্চ) সংগ্রহ করে খেতে হয়। দুর্গার আর এক নাম শাকম্ভরী হলেও দুর্গাপূজায় এই চোদ্দো শাক খাওয়ার রীতি নেই, কিন্তু কালীপূজায় আছে। বর্তমান কালীপূজার রূপটি বাঙালি সংস্কৃতিতে দুর্গাপূজার থেকে নবীন হলেও আদি রূপটি ছিল প্রাচীন কালের সংস্কারবাহী। এই শাক সংগ্রহের ব্যাপারটি প্রাগৈতিহাসিক শিকারি, সংগ্রহজীবী পর্বের একটা ক্ষীণ এবং আবছায়া স্মৃতিকে বহন করে থাকে। পরবর্তীকালে চাষ-আবাদ এটির স্থায়ীকরণ ঘটায়। ফলে সমাজ থেকে এগুলি হারিয়ে যায় না। কিছু না কিছুকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকে। কালীপূজার অনুষঙ্গে চোদ্দোশাকের এটাই তাৎপর্য। শাকের সংখ্যাটা চোদ্দো সম্ভবত দিনটা ভূত চতুর্দশী বলে।

সরাসরি কালীর কথায় আসা যাক। কালী হিন্দুদের দেবী হিসেবে পূজিতা হলেও তাঁর একটি অনার্য উৎস রয়েছে। বাস্কে দেখিয়েছেন যে, এই পূজা অস্ট্রিক প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত। তিনি লিখেছেন, ‘(কালী) পূজার প্রতীক-এর আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে আদিবাসী (অনার্য) সংস্কৃতির সুস্পষ্ট প্রভাব পরিলক্ষিত হয়’ (১৯৯২: ৯৮)। কালীর পূজা যে পুরাণের থেকেও পুরোনো তা টের পাওয়া যায় বৃহৎধর্মপুরাণের কাহিনি পড়লে। এ কাহিনি অনুযায়ী মহাদেব (শিব) দক্ষের যজ্ঞে যেতে পার্বতীকে নিষেধ করলে পার্বতী/সতী দশমূর্তি দেখিয়ে অনুমতি আদায় করেন। কালী হল দশটি রূপের একটি। ক্রোধে বিবসনা কালীমূর্তি দেখে শিব ভয় পেয়ে যান (বন্দ্যোপাধ্যায়, ১৯৮৫:৯: ৬৭৯-৮০)। অধিকাংশ পুরাণেই বলা হয়েছে, হিমালয় ও মেনকার সন্তান পার্বতীর গায়ের রঙ ছিল কালো। অনার্যদের গায়ের স্বাভাবিক রঙ। পৌরাণিক গল্প অনুযায়ী শিব তাঁর স্ত্রী পার্বতীর গায়ের কালো রঙকে বিদ্রুপ করলে কালী তপস্যায় বসেন এবং ব্রহ্মার বরে তিনি ফরসা হন। তাঁর কালো খোলসটি একটি দেবীতে পরিণত হয় (ভট্টাচার্য, ১৯৯৭:৩:২৬৮-৭০)। পুরাণ থেকে পাওয়া এই তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায় যে, পৌরাণিক যুগে আর্য কর্তৃক অনার্যদের যে আত্তীকরণ প্রক্রিয়া চলছিল, কালী নামক দেবী ছিলেন তার অন্যতম প্রমাণ। আর্যায়ন বা সংস্কৃতায়ন নামক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে পরাজিত বা অর্ধ-পরাজিত অনার্যদের মধ্যে আর্য-সংস্কৃতির আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে পুরাণকাররা এমন সব গল্পের আমদানি করেন, যার মধ্যে দিয়ে অনার্য (কালো রঙের) দেবদেবীকেও আর্যদের উপাস্য বলে ঘোষণা করা হয়। অনার্যদের দেব-দেবীদের এই অন্তর্ভুক্তিকরণ অনার্যদের সঙ্গে সাংস্কৃতিক দেওয়া-নেওয়া সম্ভব করে তোলে। ফলে কালো কালী পুরাণকারদের হাতে হয়ে ওঠে গৌরী এবং আর্যদের দ্বারা পূজিতা। এক চমৎকার ভারসাম্য তৈরি হল এর মধ্যে দিয়ে।

অনেকে কালীর এই অনার্য উৎস সম্পর্কে সন্দেহ করতেই পারেন। তাই আর একটু পুরোনো ও আরও স্পষ্ট তথ্য উল্লেখ করা যাক। ‘খিল হরিবংশে’ কালী সম্পর্কে বলা হয়েছে: মদ মাংস প্রিয়া এই (কালী) দেবী শবর-বর্বর-পুলিন্দদের (অনার্য) আরাধ্যা। ‘কুমার সম্ভব’-এর কালীও যথেষ্ট লঘু অবস্থানেই রয়েছেন। বাকপতির ‘গৌড়বহো’’তে তাঁকে পর্ণশবরী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আদিম বিস্তৃতনামা এই দেবী যখন আত্তীকরণের মধ্যে দিয়েই সমাজের ওপরতলায় গৃহীতা হলেন তখন তিনি চামুণ্ডেশ্বরী (কনার্ট), কামাক্ষী (কাঞ্চী), মীনাক্ষী (মাদুরাই), মহাকালী (গৌড়বঙ্গ) ছাড়াও আরও বহুনামে পরিচিত হন। গায়ের রঙটি কিন্তু কালোই থেকে গেল। যা বহন করছে সুদূর অতীত অনার্য সভ্যতার স্মৃতিকে।

বর্তমান বাংলার কথায় আসা যাক। এসময় কালী যে রূপে পূজিতা হন তার বর্ণনা পাওয়া যায় ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ সংকলিত ‘তন্ত্রসার’-এ (দাশগুপ্ত, কল্যাণকুমার, ২০০০: ১৫৩)। যদিও অনেকের মতে, আগমবাগীশের পূর্ববর্তী গ্রন্থেও এই মূর্তির বর্ণনা পাওয়া যায়। (চক্রবর্তী, ১৩৭৭ বাংলা : ১২৫)। ষোড়শ শতকের পর থেকে বাঙালির আধ্যাত্মিক ভাবনায় তন্ত্র-প্রভাবের যে ব্যাপ্তি সামাজিক কারণে ঘটেছিল, সম্ভবত তারই অনিবার্য অনুষঙ্গে কালীর এই রূপের পুনরভ্যুদয় ঘটেছে। আঠারো শতকে রাষ্ট্রীয় সহায়তায় বাংলায় এই পূজার আরও ব্যাপ্তি ঘটে। নদিয়ার মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ও তাঁর ছেলে এবং নাতি কালীপূজা প্রচারের জন্য প্রচুর চেষ্টা করেছিলেন। কৃষ্ণচন্দ্রের হুকুম ছিল, প্রত্যেক প্রজাকে এই পূজার অনুষ্ঠান করতে হবে। না করলে কঠিন শাস্তি হবে। তাঁদের চেষ্টায় নদিয়ায় প্রতি বছর দীপাবলি উপলক্ষে দশ হাজার কালীপূজা হত। কৃষ্ণচন্দ্রের নাতি ঈশান চন্দ্র রায় এই উপলক্ষে কখনও কখনও হাজার হাজার মন মিষ্টি, হাজার হাজার শাড়ি ও অন্যান্য দ্রব্য উৎসর্গ করতেন। এ ছাড়া অন্যান্য খরচ বাবদও তাঁর প্রায় কুড়ি হাজার টাকা ব্যয় হত (চক্রবর্তী, ২০১০: ৯৫-৯৬)। অর্থাৎ কালীপ্রতিমার উদ্ভব চার-পাঁচশো বছরের বেশি নয় এবং পূজার ব্যাপ্তিও দু’শো-আড়াইশো বছর। এর আগে (হয়তো) শিলা ও ঘটে পূজা হত।

আরও পড়ুন : প্রসঙ্গ মা কালী কথা 

কালীপূজার এই বির্বতনের পথেই যুক্ত হয়েছে দীপাবলি উৎসব। কালী, দুর্গার মতো উর্বরতা কাল্টের ঐতিহ্যকে বহন করেনি, সে উপস্থিত হয়েছে অন্য ব্যঞ্জনায়। শুরুতে কুশিক (অনার্য মানবগোষ্ঠী) বা শবরদের টোটেম হিসেবে থাকলেও আর্যকরণের মধ্য দিয়ে অন্য অর্থ লাভ করে। কালীকে মৃত্যুর দেবীরূপে কল্পনা করার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে দীপাবলি উৎসব। ‘পরলোকগত’ স্বজন ও বন্ধুরা ‘ভয়ংকর’ এবং ‘অন্ধকার’ পরলোকের পথে নির্বিঘ্নে যেতে পারেন, তাই অমাবস্যা ও তার আগের দিন নদীর জলে বা পুকুরের জলে জ্বলন্ত প্রদীপ ভাসানো হয় বা আকাশ-প্রদীপ জ্বালানো হয়। আসলে অমাবস্যার ভয়ংকর অন্ধকারকে মানুষ ভয় পেত, তাই ঘন ঘোর অন্ধকারে আলো জ্বালিয়ে মানুষ তার ভয় দূর করত। এর সঙ্গে থাকত নানা ধরনের আওয়াজ করা – যার মধ্যে দিয়ে ‘ভূত-প্রেত’ তাড়ানোর মানসিকতা প্রকাশিত হত। আদিমকাল থেকেই কাঠকুটো জ্বালিয়ে আলো আর আগুন তৈরি করা হয়। পাথর-টাথর ফেলে দল বেঁধে চেঁচামেচি করে বিকট শব্দ করা – এই ছিল আত্মরক্ষার আদিম পদ্ধতি। কয়েক হাজার বছর অতিক্রম করে তা পরিণত হয়েছে কালীপূজার আতসবাজি পোড়ানোতে। ঘটনা হল ভূত-প্রেতে বিশ্বাস কেবল আদিম মানুষের নয়, বাঙলার প্রায় ঘরে ঘরে এই বিশ্বাস এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী। ফলে আদিম মানুষের ভয়ের গল্পের সঙ্গে বর্তমানের মানুষের অন্ধত্ব ও কুসংস্কারের কথা ভুললে চলবে না। তাই আগুন জ্বালানো ও শব্দবাজির সঙ্গে ভূত তাড়ানোর গল্পটি কম প্রাসঙ্গিক নয়।

গ্রন্থপঞ্জি

চক্রবর্তী, চিন্তাহরণ, ১৩৭৭ বাংলা। হিন্দুর আচার অনুষ্ঠান, কলিকাতা: লেখক সমবায় সমিতি

চক্রবর্তী, চিন্তাহরণ, ২০১০। তন্ত্র। কলকাতা : গাঙচিল

দাশগুপ্ত, কল্যাণকুমার। ২০০০। প্রতিমা শিল্প হিন্দু দেবদেবী, কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি

বন্দ্যোপাধ্যায়, অমলকুমার। ১৯৮৫। পৌরাণিকা। কলিকাতা : ফার্মা কেএলএম প্রাইভেট লিমিটেড

বাস্কে, ধীরেন্দ্রনাথ, ২০০৬। বঙ্গ সংস্কৃতিতে প্রাক-বৈদিক প্রভাব, কলকাতা: সুশীল বাস্কে (পরিবেশক-সুবর্ণরেখা)

ভট্টাচার্য, হংসনারায়ণ, ১৯৯৭। হিন্দুদের দেবদেবী-উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ। তৃতীয় পর্ব। কলিকাতা: ফার্মা কেএলএম প্রাইভেট লিমিটেড

সেনগুপ্ত, পল্লব, ২০০১, পূজা-পার্বনের উৎসকথা, কলকাতা : পুস্তক বিপণি

Doniger, Wendy, 2011 The Hindus- An Alternative History, New Delhi, Penguin Books