ভারতে আইটি-সহ শিল্পের সার্বিক আকাশেই ঘন কালো মেঘ, টনক নড়বে কবে

0
1220
নীলাঞ্জন দত্ত

গোপালকৃষ্ণ দুর্গাপ্রসাদ জঙ্গলে মারা যায়নি। পুণের মতো একটা আধুনিক শহরের উচ্চমধ্যবিত্ত পাড়ায় কবজির শিরা কেটে একটা চারতলা হোটেলের বারান্দা থেকে ঝাঁপ দিয়েছে। আশ্চর্য, তার মৃত্যুর খবরটা বেরোতে দু-তিন দিন কেটে গেল! আর তেমন বড়ো করে বেরোলও না। ব্যাপারটা নিয়ে কাগজে, টিভিতে, ‘সোশ্যাল’ মিডিয়ায়, লোকমুখে, বিশেষ আলোচনাও হল না।

মাত্র ২৫ বছর বয়সের এই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার যদি প্রেমঘটিত কারণে আত্মহত্যা করত, অথবা উইকএন্ডে বান্ধবীকে পাশে নিয়ে লং ড্রাইভে বেরিয়ে স্পিডে গাড়ি চালাতে গিয়ে অ্যাকসিডেন্ট করত, তা হলে নিশ্চয়ই খবরটা অনেক বেশি জায়গা পেত। কিন্তু এর মধ্যে কোনো কাব্য ছিল না। ১২ জুলাই ভোরবেলা তাকে এমন চরম পদক্ষেপ কেন নিতে হল, তা তার সুইসাইড নোটে সে পরিষ্কার ইংরেজিতে কাটা কাটা বাক্যে লিখে গেছে — “আইটিতে চাকরির কোনো নিরাপত্তা নেই। আমি আমার পরিবারের জন্য ভীষণ উদ্বিগ্ন।”

কথাটা শুনে আর ছেলেটির পরিণতি দেখে আমাদের টনক নড়া উচিত ছিল। আইটি, মানে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের এমন দশা হল কবে? যাকে গত দুই দশক ধরে কেন্দ্রে-রাজ্যে নানা রঙের নানা সরকার, মিডিয়া আর পণ্ডিতেরা আমাদের সামনে ‘সূর্য্যোদয় শিল্প’ বলে নাচিয়ে এসেছে, যেখানে এই ২০ বছরে প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষ চাকরি পেয়েছে, যা নাকি অর্থনীতির বৃদ্ধিকে স্টিম জুগিয়েছে, যার জোরে ভারত ‘আবার জগৎসভায় শ্রেষ্ট আসন লবে’ বলে স্বপ্ন দেখেছে, তার যদি সত্যিই এই অবস্থা হয়ে থাকে, তবে তো গোটা অর্থনীতির হালটাই আমাদের দুশ্চিন্তায় ফেলার মতো। এমন হল কী করে, আমরা কি তা জেনেছি, জানতে চেয়েছি? না, কারণ আমরা ব্যস্ত অন্য তরজায়, অর্থনীতি নিয়ে ভাববার আজকাল আমাদের ফুরসত নেই। দুর্গাপ্রসাদের আত্মহননের পর আমাদের প্রতিক্রিয়াহীনতা দেখিয়ে দিচ্ছে, এখনও আমাদের কোনো ভাবান্তর নেই।

কিন্তু ভেবে দেখুন, খবরটার মধ্যে একটা নতুনত্বও তো আছে, যা আমাদের চমকে দিতে পারে? এত দিন আমরা বন্ধ বা রুগ্ন চটকলের, চা-বাগানের, এমনকি পুরোনো ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানার শ্রমিকদের, তাদের পরিবারের লোকেদের, আত্মহত্যার কথা শুনেছি। শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। কিন্তু আইটির মতো উজ্জ্বল শিল্পে কাজ করা ঝকঝকে ছেলেমেয়েরা! তারা তো এত টাকা রোজগার করে, এত ফুর্তিতে জীবন কাটায়, তাদের তো শ্রমিক বলে বোঝাই যায় না। তাদের আবার এই রাস্তায় যেতে হয় কেন?

আমরা হয়তো খবর রাখিনি, ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই ভারতের আইটি সেক্টরে ওই চা-বাগান বা চটকলের মতোই লে-অফ আর ছাঁটাই পর্ব শুরু হয়েছে। বিভিন্ন মহল থেকে যে সমস্ত হিসেব পাওয়া যাচ্ছে তা যোগ দিলে, এই বছরের মধ্যেই সাতটি বৃহত্তম আইটি কোম্পানি থেকে মোট অন্তত ৫৬,০০০ ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।

আরও পড়ুন: নোটে লেখা ‘তথ্যপ্রযুক্তিতে চাকরির নিরাপত্তা নেই’, মিলল ইঞ্জিনিয়ারের দেহ

গোপালকৃষ্ণ দুর্গাপ্রসাদ।

এ জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ স্লোগান তুলে বহিরাগত শ্রমিক বিতাড়ন করে আর বিভিন্ন কোম্পানির ভারতের মতো দেশ থেকে সস্তায় কাজ করিয়ে আনা বন্ধ করে তাঁর দেশের বেকারদের চাকরির সুযোগ করে দেওয়ার যে নীতি নিয়েছেন, তার ওপর দোষ চাপিয়ে অনেকে ক্ষান্ত হচ্ছেন। কিন্তু কেবল আমেরিকাই নয়, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড-সহ যে সব দেশ এত দিন ভারতীয় আইটি ইঞ্জিনিয়ারদের প্রচুর কাজ দিত, তারা সকলেই এমন সঙ্কটে পড়েছে যে এক এক করে দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে। বিশ্বায়নের সুফল কুড়োতে ব্যস্ত থাকার দরুন আমরা এই রকম পরিস্থিতির জন্য তৈরি ছিলাম না।

তবে সেটা কেবল একটা কারণ। যে সাতটা বড়ো কোম্পানির কথা বললাম, তার মধ্যে বিদেশি বরাত-নির্ভর ভারতীয় কোম্পানি যেমন আছে, তেমনি আছে খাস বিদেশি বা বহুজাতিক কোম্পানি। রয়েছে ভারতের ইনফোসিস, উইপ্রো, টেক মাহিন্দ্রা, এইচসিএল, আমেরিকার কগনিজ্যান্ট আর ডিএক্সসি টেকনোলজি আর ফ্রান্সের ক্যাপ জেমিনি এসএ।

আইবিএম থেকেও কয়েক হাজার কর্মীকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে, যদিও সঠিক সংখ্যাটা এখনও পাওয়া যায়নি। আইবিএম যদি ভারতে ছাঁটাই করে তবে সেটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তার প্রতি তিন জন কর্মীর এক জন নাকি এখান থেকেই আসে। মাইক্রোসফটও তাদের পৃথিবীজোড়া কর্মীবহর থেকে ছাঁটাই শুরু করেছে। তারা নিজেরা না বললেও, সিএনবিসি টেলিভিশন জানিয়েছে, এখনও পর্যন্ত সংখ্যাটা প্রায় ৩,০০০।

সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, “আইটি ইঞ্জিনিয়ারদের আর বিয়ের বাজারে কোনো দাম রইল না। বিভিন্ন ম্যাট্রিমনিয়াল সাইটগুলির ট্রেন্ড বলছে, মেয়ের বাড়ির লোকেরা আর ইঞ্জিনিয়ার পাত্র চাইছে না। পাত্র ইঞ্জিনিয়ার বলে কেউ যোগাযোগ করলেও ফিরিয়ে দিচ্ছেন। এমনকি ঘটকদের কাছেও বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছেন এ কালের ইঞ্জিনিয়াররা। এ সবের অন্যতম বড়ো কারণ হল আইটি সেক্টরে কাজের অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া।”

আইটি শিল্পের মালিকদের সংস্থা ন্যাসকম বলছে, এমন তো হয়েই থাকে। প্রতি বছর কে কতটা কাজ করতে পারল, তা হিসেব করে কিছু কর্মীকে বাদ দিতেই হয়। কোম্পানিগুলিও একই কথা বলছে। তারা কেউ লে-অফ বা ছাঁটাইয়ের কথা স্বীকার করছে না। কিন্তু এ বছরের ব্যাপারটা একটু অস্বাভাবিক ঠেকছে। অর্থনৈতিক সংবাদপত্র ‘লাইভমিন্ট’ তদন্ত করে দেখেছে, এ বছর ওই সাতটা বড়ো কোম্পানি অনেক বেশি কর্মীকে একেবারে কম নম্বর দিয়ে তলায় পাঠিয়ে দিয়েছে। কগনিজ্যান্টে এ রকম কর্মীর সংখ্যা ১৫,০০০ ছাড়িয়ে গেছে। ম্যানেজার পদমর্যাদার তিন হাজারেরও বেশি কর্মচারীকে ইনফোসিস বলেই দিয়েছে, কাজের মান না বাড়ালে তাদের কপালে দুঃখ আছে। এই পত্রিকার মতে, এ সব বাহানা মাত্র, আসলে ছাঁটাইয়ের প্রস্তুতি ছাড়া আর কিছু না। ডিএক্সসি টেকনোলজি সারা দেশে তাদের অফিসের সংখ্যা তিন বছরে ৫০ থেকে ২৬-এ নামিয়ে আনবে বলে ঠিক করেছে। এবং সেই জন্য তারা প্রায় ১০,০০০ কর্মীকে এই বছরেই বিদায় করবে বলে আশঙ্কা। সব জায়গাতেই যাঁদের চাকরি যাচ্ছে, তাঁদের বেশির ভাগই হলেন ছয় থেকে আট বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ইঞ্জিনিয়ার।

আরও পড়ুন: টেক মাহিন্দ্রার কর্মী ছাঁটাইয়ে ক্ষমা প্রার্থনা আনন্দ মাহিন্দ্রার

বিশ্বাস করুন বা না করুন, এ ধরনের খবরও সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, “আইটি ইঞ্জিনিয়ারদের আর বিয়ের বাজারে কোনো দাম রইল না। বিভিন্ন ম্যাট্রিমনিয়াল সাইটগুলির ট্রেন্ড বলছে, মেয়ের বাড়ির লোকেরা আর ইঞ্জিনিয়ার পাত্র চাইছে না। পাত্র ইঞ্জিনিয়ার বলে কেউ যোগাযোগ করলেও ফিরিয়ে দিচ্ছেন। এমনকি ঘটকদের কাছেও বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছেন এ কালের ইঞ্জিনিয়াররা। এ সবের অন্যতম বড়ো কারণ হল আইটি সেক্টরে কাজের অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া” (ইন্টারনেট সংবাদপত্র ‘ওয়ানইন্ডিয়া’ (বাংলা), ৮ জুলাই ২০১৭)।

কেন্দ্রের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী বলে দিয়েছেন, “আইটি সেক্টরে চাকরি কমার এই সব কথাবার্তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।” তিনি বলেছেন, “ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতি ঊর্ধ্বমুখী, চাকরির ক্ষেত্র শিথিল হয়ে আসছে এটা তথ্যগত ভাবে একেবারেই ভুল। অবশ্যই, যারা কাজ করতে পারে না তাদের তো যেতেই হবে।”

এক বছর আগে, ৬ জুলাই ২০১৬ ‘এইচএফএস রিসার্চ’ সংস্থা বস্টন, লন্ডন ও বেঙ্গালুরু থেকে থেকে এক যোগে ‘ফিউচার ওয়ার্কফোর্স ইমপ্যাক্ট মডেল’ নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, যাতে তারা দেখিয়েছে যে সারা পৃথিবীর আইটি ও বিজনেস সার্ভিস কোম্পানিগুলো আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি, অটোমেশন এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অর্থাৎ বুদ্ধিমান যন্ত্রের সুবিধা নিয়ে তাদের ব্যবসা বাড়াতে পারছে কর্মীসংখ্যা কমিয়েই। এদের হিসেব অনুসারে ২০২১ সালের মধ্যে ভারতে সব চেয়ে ‘কম দক্ষতাসম্পন্ন’ শ্রমিকদের ২৮ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৬,৪০,০০০ শ্রমিকের আর কোনো জায়গা থাকবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই কাজের ক্ষেত্র সঙ্কোচনের অনুপাতটা হল ৩৩ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৭,৭০,০০০ মানুষের জীবিকা। এই সমস্ত কাজ স্বয়ংক্রিয় ভাবে, যন্ত্রের মাধ্যমে হবে, তার জন্য এত মানুষ লাগবে না। এর বিনিময়ে ভারত এই সময়ে ১,৬০,০০০ চাকরির ক্ষেত্র সৃষ্টি করবে (১৪ শতাংশ বৃদ্ধি) আর আমেরিকা হয়ত ১,৭৩,০০০ (সাত শতাংশ বৃদ্ধি)। দেখাই যাচ্ছে, যত মানুষ কাজ হারাচ্ছে, তার চেয়ে কাজ পাচ্ছে অনেক কম মানুষ।

‘লাইভমিন্ট’ পত্রিকা জানান দিচ্ছে, ভারতের বড়ো বড়ো আইটি কোম্পানিগুলির বেশির ভাগই এ ভাবে লোক কমাতে কমাতে এমন অবস্থায় চলে যাবে, যেখানে তারা যত জন নিয়ে কাজ শুরু করেছিল তাদের কর্মীসংখ্যা হবে তার চেয়েও কম। উৎপাদনশীলতা বাড়বে, মালিকদের মুনাফাও বাড়বে, কিন্তু চাকরি কমবে।

আরও পড়ুন: ইনফোসিস, উইপ্রো সহ দেশের প্রথম সারির ৭টি তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা ৫৬,০০০ কর্মী ছাঁটাই করবে এ বছর

তা হলে সমাজ কী পাবে এই ‘সূর্য্যোদয় শিল্পের’ কাছ থেকে? প্রশ্নটা তখন আর হয়তো করাই যাবে না, করতে গেলেই ‘দেশদ্রোহী’ বলে দেওয়া হবে। বলা হবে, এ সব প্রশ্ন তোলা মানে আমাদের অর্থনীতিকে হেয় করার চেষ্টা। এখনই তো কেন্দ্রের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী বলে দিয়েছেন, “আইটি সেক্টরে চাকরি কমার এই সব কথাবার্তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।” তিনি বলেছেন, “ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতি ঊর্ধ্বমুখী, চাকরির ক্ষেত্র শিথিল হয়ে আসছে এটা তথ্যগত ভাবে একেবারেই ভুল। অবশ্যই, যারা কাজ করতে পারে না তাদের তো যেতেই হবে।”

একজন মন্ত্রী কত সহজে বলে দিচ্ছেন – “তাদের তো যেতেই হবে”! শুনলে হাড় হিম হয়ে যায়। কিন্তু এটা কী বললেন – “ডিজিটাল অর্থনীতি ঊর্ধ্বমুখী”? তথ্য বলছে, ডিজিটাল শিল্পক্ষেত্রের অবস্থা মোটেই সুবিধের নয়। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে যারা সামান্য কিছু বিনিয়োগ করে আর বিপুল পরিমাণ ভূতুড়ে পুঁজি জোগাড় করে ব্যাঙের ছাতার মতো সব ‘স্টার্টআপ’ শিল্প খুলে বসেছিল, তাদের মাথায় এখন একটাই চিন্তা – কী করে খরচ কমানো যায়। অফিস বন্ধ করে দেওয়া এবং কর্মী ছাঁটাই তার প্রকৃষ্ট পথ। এদের মধ্যে কেবল দেশি নয়, বিদেশি কোম্পানিও আছে।

২০১৭-এর জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে ভারতে প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষ কাজ হারিয়েছে। এটা সংগঠিত, অসংগঠিত, কৃষি ও অ-কৃষি ক্ষেত্রের মোট হিসেব। সিএমআইই বলছে, এই কর্মচ্যুতির ফলে সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নতুন, অল্পবয়সি শ্রমিকরা।

এ বছর বিশাল চিনা কোম্পানি লেইকো ঘোষণা করেছে, তাদের হাতে যথেষ্ট টাকা নেই, তাই ভারতে ৮৫ শতাংশ কর্মীকে ছাঁটতে বাধ্য হচ্ছে। ফেব্রুয়ারি মাসে মোবাইল ফোন পরিষেবা সংস্থা এয়ারসেল নাকি ৭০০ কর্মচারীকে চিঠি ধরিয়ে দিয়েছে। শোনা যাচ্ছে, এটা প্রথম পর্ব। ইন্টারনেটে খুচরো ব্যবসার প্রতাপশালী প্রতিষ্ঠান স্ন্যাপডিলও নাকি বছরখানেক মন্দার বাজার দেখার পর এই পথেই হাঁটতে শুরু করেছে, যদিও তারা কর্মীসঙ্কোচনের কোনো পরিসংখ্যান এখনও প্রকাশ করেনি। ফ্যাশানদুরস্ত জামাকাপড়ের ই-ব্যবসায়ী ইয়েপমিও তাদের মজুত ও গুণমান নির্ধারক বিভাগ থেকে কর্মীদের লে-অফ করে দিয়েছে। ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ‘এথনিক’ জামাকাপড়ের ব্যবসা করা ক্রাফটসভিল সম্প্রতি শতাধিক কর্মীকে ছাঁটাই করেছে বলে ‘ইকনমিক টাইমস’-এর খবর।

দুর্গাপ্রসাদের আত্মহত্যার দিন দুয়েক আগে সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকনমি (সিএমআইই) একটি সমীক্ষাপত্র প্রকাশ করে। তাতে দেখা যাচ্ছে, ২০১৭-এর জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে ভারতে প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষ কাজ হারিয়েছে। এটা সংগঠিত, অসংগঠিত, কৃষি ও অ-কৃষি ক্ষেত্রের মোট হিসেব। সিএমআইই বলছে, এই কর্মচ্যুতির ফলে সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নতুন, অল্পবয়সি শ্রমিকরা।

মনে রাখবেন, এ দেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষের বয়স এখন ২৫ বছরের নীচে। এদের জীবিকায় কোপ পড়া মানে গোটা অর্থনীতির ভিত নড়ে যাওয়া। আর এর প্রভাব যে সমাজে কত রকম ভাবে পড়তে পারে তা উদ্বেগের বিষয়। কমবয়সিরা কাজ না পেলে কী না করতে পারে তা কি আমাদের নেতারা ভেবেছেন? নাকি তাঁরা মনে করেন, এতে তাঁদের সুবিধাই হবে, আর কিছু করার না থাকলে এঁরা সবাই তাঁদের তাঁবেদার হয়ে ভোট ম্যানেজমেন্টের কাজ করবে? যতই টাকা কামিয়ে থাকুন, এই বিশাল বেকারবাহিনীকে পোষার মতো রেস্ত আছে তো?

আর যারা কাজ পেয়ে, ভালো রোজগার করেও কাজ হারাচ্ছে? অন্য ক্ষেত্রের কথা আপাতত ছেড়েই দিন, আইটি দিয়ে শুরু করেছিলাম, আইটিতেই ফিরে আসি। এই যে প্রায় ৪০ লক্ষ লোক সরাসরি এবং তার তিন গুণেরও বেশি, অন্তত ১ কোটি ৩০ লক্ষ, লোক পরোক্ষ ভাবে এই উজ্জ্বল শিল্পে এত দিন কাজ করে এত টাকা রোজগার করল, তারা তো অনেক টাকা খরচও করেছে, খেয়েছে, জামাকাপড় কিনেছে, বেড়িয়েছে, গাড়ি চড়েছে, আরও কত কী করেছে। এ ভাবে তাদের রোজগারের ওপর ভিত্তি করে আরও কত মানুষ রোজগার করেছে। এখন এদের হাতে পয়সা না থাকলে অর্থনীতির সেই ক্ষেত্রগুলোতেও কি ভাটার টান পড়বে না? এরা তো শুধু একা ডুববে না, আরও অনেককে টেনে নামাবে।

দুর্গাপুর থেকে ডেট্রয়েট – পৃথিবীতে মন্দার বাজারে কপাল পোড়া শহরের অভাব নেই। বন্ধ কলকারখানার আশেপাশে গমগমে দোকান-বাজার-জনপদ কী ভাবে শ্মশানের চেহারা নিয়েছে, তা আমরা আগে ‘সূর্যাস্ত শিল্পের’ ক্ষেত্রে অনেক দেখেছি। এখন ‘সূর্যোদয় শিল্পের’ ক্ষেত্রেও সেই একই ছবি দেখতে হবে নাকি? সল্ট লেকের সেক্টর ফাইভ থেকে শুরু করে বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, পুণে, কোচি, চেন্নাই, ভুবনেশ্বর, ইত্যাদির আইটি শিল্পাঞ্চলগুলির অবস্থা কী হবে? এই শিল্পাঞ্চলগুলিকে উন্নয়নের ইঞ্জিন হিসেবে ব্যবহার করে যে শহরগুলি দ্রুত ঝাঁ-চকচকে হয়ে উঠছিল, তাদেরই বা কী হবে?

প্যানিক ছড়াচ্ছি না, অর্থনীতির দিকে একটু নজর দেওয়ার কথা বলছি শুধু। মানুষ বাঁচলে তবে তো গরু বাঁচবে।

 

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here