trinamul congress
দেবারুণ রায়

স্বৈরশাসনই শেষ কথা নয়। রাজ্য জুড়ে পঞ্চায়েতের ভোটপর্বে মনোনয়ন নিয়ে বিরোধী প্রার্থীদের প্রতি শাসক দলের লাগাতার শাসানি, হুমকি এবং খুন-জখমের অসংখ্য অভিযোগ যখন দৈনন্দিন ঘটনা, তখন সাম্প্রতিক থেকে দূরতম অতীতের ইতিহাস সে কথাই বলছে। কেন্দ্রেই হোক, কিংবা বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের ইতিহাসে মানুষই শেষ কথা বলেছে। বিরোধিতাহীন শাসনতন্ত্র একনায়কতন্ত্রের জন্ম দেয়, তাকেই পুষ্ট করে। কিন্তু যখন শাসনব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ লাগামগুলো অকেজো হয়ে যায়, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতাসীন হয়ে শাসক যখন গণতন্ত্রকেই বুড়ো আঙুল দেখাতে শুরু করে তখন শেষ পর্যন্ত মানুষ রুখে দাঁড়ায়। এই অভ্যুত্থান কোনো বিশেষ দল বা তার নেতার জন্য অপেক্ষা করে না। মানুষই তার প্রয়োজনে নেতা তৈরি করে নেয়। স্বৈরশাসক যত শক্তিশালীই হোন না কেন, জনচেতনার আছড়ে পড়া ঢেউ তাঁকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় কালের অতলান্ত গহ্বরের দিকে। স্বৈরতন্ত্রের সমার্থক ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে এ দেশেরই মানুষ এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলায় আরও একবার ইতিহাসের এই সংকেত ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

‘আশির’ পরে যাঁরা বড়ো হয়েছেন, তাঁরা সর্ব ভারতীয় ক্ষেত্রে স্বৈরশাসনের সেই চেহারা চোখে দেখেননি। দেখেছেন ৩৪ বছরের বাম জমানার একচ্ছত্র হয়ে ওঠার পর্ব। যখন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নানা কারণেই বিরোধীদের স্থান লুপ্ত হয়ে যাচ্ছিল। স্বৈরপ্রবণতা নিরঙ্কুশ হয়ে ওঠার সময়েই পরিবর্তনের মাস্তুলে বসা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অনেকটা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে গ্রহণ করেছিল বাংলার মানুষ। পরিবর্তনের সেই রামধনু-রং আজও নিশ্চয় কারও স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি। স্বৈরতন্ত্রের যে সব লক্ষণ ফুটে উঠেছিল বাংলার ‘শেঠ’দের প্রতিটি পদক্ষেপে, মেদিনীপুরের পূর্বাঞ্চলে জগৎ শেঠের বংশধরদের যে ধরনের কার্যকলাপে বাম জমানার সূর্যাস্ত হয়েছিল, তারই প্রচ্ছায়া আরও অনেক বেশি প্রলম্বিত ইদানীং।

২০০৯ থেকে এ চত্বরেই পরিবর্তনের ঝোড়ো হাওয়ায় চোখে পড়েছিল যে সব মুখ, সেই সব মুখেরই ভাব বদলেছে তুলনায় অল্প দিনে। আরও আরও আরও একচ্ছত্র হয়ে ওঠার নেশায় নেত্রীকে বিরোধীবিহীন জেলা পরিষদ উপহার দিতে চলছে দাম্ভিক দ্বন্দ্বযুদ্ধ। কখনও বীরভূম, কখনও বা মুর্শিদাবাদ আর মালদার মতো জেলা থেকেও শোনা যাচ্ছে বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করার ‘কসম’। ভাবলে বিস্ময় জাগে, যাঁরা এই হুংকার ছাড়ছেন, তাঁরাই কেউ কেউ ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী সাংবিধানিক পদে থাকার শপথ নিয়েছেন। তাঁদের কাছেই গণতন্ত্রের ভাষা সব চেয়ে আপত্তিকর। গ্রামেগঞ্জে সন্ত্রাস ও হিংসাত্মক আক্রমণকে তাঁরা নাম দিয়েছেন ‘উন্নয়ন’। সংবাদ মাধ্যমে ‘উন্নয়নের’ এ হেন ভাষ্যের তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার এবং দেওয়ালের লিখন পড়ার পরামর্শ বার বার শোনা বা দেখা গেলেও সন্ত্রাসব্রত বড়ো-মেজো-ছোটো নেতারা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে তার অনুমোদনও মিলে যায়।

বিরোধিতার পদধ্বনি শুনতে চায় না শাসক। কোনো রকম সমালোচনা, তা গঠনমূলক হলেও, সহ্য করেন না তাঁরা। সমালোচকদের সমঝে দেন সমুচিত শাস্তিতে। এতেই ইতিহাসের স্বৈরশাসনের সঙ্গে বর্তমানের মিল খুঁজে পেতে ভুল হয় না। এবং ইতিহাসেরই অন্য অধ্যায়ে এমন শাসনের পরিণাম দেখে জটিল মোড়ে সঠিক পথ চিনে নেওয়া যায়। সর্বোপরি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে হতাশা আসে না। বহু আলোচিত ‘জরুরি অবস্থা’র পর্বকেই বার বার টেনে আনতে হয় এমন প্রসঙ্গে। এসেই পড়ে বাংলার সত্তর দশক। ‘জরুরি অবস্থা’কে ‘অনুশাসন পর্ব’ আখ্যা দিয়েছিলেন আচার্য বিনোবা ভাবে। তাবৎ গান্ধীবাদীদের স্বৈরতন্ত্র-বিরোধী আন্দোলন রুখতে ইন্দিরা গান্ধী ঢাল করেছিলেন বিনোবাকে। কিন্তু তাতে কোনো ফল হয়নি। মানুষ বুঝেছিল, বিনোবা নয়, জয়প্রকাশই সঠিক পথের দিশারী। তিনিই ক্ষমতার আগ্রাসনে মাথা বিকিয়ে দেননি। অবশ্য সেই অপরাধে কারা-কুঠুরিতে বিকল হয়েছিল লোকনায়কের কিডনি। তাঁকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল মৃত্যুর দিকে। তবু মৃত্যুর আগে তাঁরই হাতে উড়েছিল পরিবর্তনের পতাকা। বাধ্যতামূলক ‘নশবন্দি’র মতো দুর্বৃত্তায়নের জন্ম হয়েছিল সঞ্জয় গান্ধীর হাতে। মা ইন্দিরার মদতে তাঁরই ‘কথা কম, কাজ বেশি’র স্লোগান ফিরি করতেন কংগ্রেসিরা। কিন্তু এ সবের পরিণাম কী হয়েছিল, ইতিহাস তার সাক্ষী। শেষ পর্যন্ত ইন্দিরাকেও বুঝতে হয়েছিল ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ কাকে বলে। অবশ্য সেটা এক বার নয়, বার বার। রহস্যের অভিযোগ উঠেছিল বিমান দুর্ঘটনায় সঞ্জয়ের মৃত্যুকে ঘিরে। আর পাঞ্জাব ও বাংলায় কংগ্রেসের কু-নীতি দলকে নিয়ে গিয়েছিল অতলান্ত খাদে। পাঞ্জাবে দল অটুট থাকায় পুনরুত্থান হয়েছে। কিন্তু বাংলায় সত্তরের স্বৈরাচার মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে কংগ্রেসের। চৌত্রিশ বছরেও মানুষকে টলানো যায়নি। ৪১টি বছর স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বাংলার রায়ে সিলমোহর দিয়েছে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here