papya_mitraপাপিয়া মিত্র

সুকুমার রায় প্রসঙ্গে টাউনহলের এক স্মৃতিসভায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, “আমি সারা জীবন শিশুদের জন্য সেইরকম ভাবে কিছু ভেবে উঠতে পারিনি। সুকুমার রায় কিন্তু সেই ভাবে শিশুমনে একটা বিরাট জায়গা দখল করে নিয়েছিলেন।” পরবর্তী সময় পাঠককুল আরও এক মানুষকে পেয়েছিলেন যিনি নীরবে শিশুসাহিত্যকে পুষ্ট করে গিয়েছেন, তিনি ধীরেন বল। আত্মপ্রচারবিমুখ, নিরহঙ্কারী শিশুসাহিত্যিকের আজ রবিবার ১০৫তম জন্মবার্ষিকী।

‘চেঙাবেঙা’, ‘তুতুভূতু্‌’র মতো বাংলা কমিকস বইয়ের স্রষ্টা, নানা পত্রপত্রিকার অলংকারক, লেখা ও আঁকা যুগলবন্দি ছিল যাঁর হাতে তিনিই নন্দলাল ও দক্ষবালা বলের কৃতী সন্তান ধীরেন।

২২ জানুয়ারি, ১৯১২। বাংলাদেশের বগুড়া জেলায় বারইল গ্রামে জন্ম। ধীরেন ছিলেন মূলত অঙ্কনশিল্পী। ছোটোদের ছড়া, কবিতা এবং গল্পেও দক্ষতার পরিচয় মিলেছে বারবার। বগুড়ার গ্রামীণ বাড়িতে তাঁর তুলিকলম পাখা মেলে উড়ে বেড়াত। চিরশিশু এই মানুষটির মনে কৈশোরের ছায়া জুড়ে ছিল আজীবন। তাই তিনি সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন অসাধারণ সব ‘চিত্রকথা’।

বগুড়ার করোনেশান স্কুলে শিক্ষাজীবন শুরু। ১৯৩১, রংপুরের কারমাইকেল কলেজ থেকে বিএ পাশ করে কলকাতার গভরমেন্ট আর্ট কলেজ থেকে তিন বছরের কমার্শিয়াল আর্ট-এ শিক্ষালাভ করেন। গ্রামের বাড়িতে থাকাকালীন ঘরে মন বসাতে পারতেন না কিশোর ধীরেন। কাগজ-পেন্সিল নিয়ে চলে যেতেন এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে, কখনও বা পুকুরঘাটে আবার কখনও বা কুমোরপাড়ায়। মাটির পুতুল গড়ার নেশা ধরেছিল কুমোরপাড়া থেকে। ফেলে আসা নিজের গ্রামকে ধরে রেখেছিলেন ‘ছড়ায় ভরা গ্রাম’ বইটিতে। আর্ট কলেজ থেকে পাশ করার পরে দু’বছর তিনি ভারত সরকারের প্রচার বিভাগের শিল্পী হিসেবে শিমলায় ছিলেন। সেখানে থাকাকালীন তিনি মাটির দুর্গা ও সরস্বতী মূর্তি গড়েছিলেন। সেখানে সেই প্রথম মাটির মূর্তিপুজো করা হয় (১৯৪৫, ভারতবর্ষ পত্রিকা)।

bal-3এক সময় শিমলার চাকরি ছেড়ে কলকাতায় আসেন স্বাধীন ভাবে কাজ করার জন্য। বিভিন্ন সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন বিভাগে চিত্রশিল্পী হিসেবে যুক্ত হন। মানুষের চোখে ধরা রইল ‘নিম সাবান’, ‘হিমানি’, ‘হিমকল্যাণ’ ‘আমলা’, ‘ভিভিগ্যান’-এর মতো বিজ্ঞাপন। সময়টা ১৯৩৯-৪০। বিমল ঘোষ (মৌমাছি) তাঁকে আনন্দবাজার পত্রিকার ‘আনন্দমেলা’য় নিয়ে আসেন। বর্মণ স্ট্রিটের কার্যালয়ে ধীরেনের কর্মজীবন শুরু হয়। এই বিভাগে তাঁর অঙ্কণে গল্প প্রকাশিত হত। এ ছাড়া পত্রিকার সব বিভাগের গল্প ও উপন্যাসের ছবি আঁকতেন তিনি। পাশাপাশি যুগান্তর, অমৃতবাজার, শুকতারা, মৌচাক, কিশোর জ্ঞানবিজ্ঞান ও আলোর ফুলকিতে ছবি এঁকেছেন। তাঁর অমর সৃষ্টির কথা মনে রেখে লীলা মজুমদার হাতচিঠিতে (২০.১২.১৯৯১) জানিয়েছিলেন, “আমাদের বন্ধু ধীরেন বলের মতো চিত্রশিল্পী আমাদের দেশে কম জন্মেছেন। ছোটোদের জন্য আঁকা ছবি যেন লাফায়-ঝাঁপায়, মনকে নাড়া দেয়। ধন্য তাঁর তুলিকলম। কেবলি আমার দাদা সুকুমার রায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। নামকরা শিল্পী আমাদের চিত্রজগতে অনেকে দেখা দিয়েছেন, কিন্তু ছোটোদের মনের ছাড়পত্র পেয়েছেন দু’চারজনা। ধীরেন বলের দর্শন পেয়েছি আমার সৌভাগ্য।”

bal-2ধীরেনের তুলিকলম কত উঁচু মানের, তার প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর সৃষ্টি ‘চেঙাবেঙা’, ‘তুতুভূতু্‌’, ‘ঠেকে হাবুল শেখে’, ‘দেখে হাবুল শেখে’, ‘মজার দেশে মানু’, ‘দেখে এলাম ভারত’, ‘এই বাংলার মেয়ে’, ‘দেখে এলাম কলকাতা’, ‘পিকনিকে চ্যাঙাব্যাঙা’ ‘চিত্রকথা’-সহ ৫০টি বইতে। শিশুমন বুঝে তিনি পশুপাখির গায়ে জামাকাপড় পরিয়েছিলেন। তা দেখে তিন-চার প্রজন্মের সেই হাসি আজও অমলিন। ভাবা যায় ভূতুর মা কোমর বেঁধে মাছের কালিয়া রাঁধছে! তুতু গেঞ্জিপ্যান্ট আর কোমরে বেল্ট পরে বল নিয়ে খেলতে যাচ্ছে! নানা বেয়াদপিতে হাবুলের রঙিন মুহূর্ত! নিপুণ হাতে প্রাণ পেয়েছে পশুর লেজের লোম, মাছের মুখে বঁড়শি গাঁথা, গলায় গামছা দিয়ে বাজারে ব্যাঙার ডিম বিক্রি করা, চুরি করে খেয়ে হাবুলের পেটের ছবি!

১৯৫২-তে প্রথম দেখা হয় ধীরেনবাবুর সঙ্গে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর। আনন্দবাজার পত্রিকার বার্তা বিভাগ থেকে রবিবাসরীয় পদে সহকারী হয়েছেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। আনন্দমেলার পাতাটি সম্পাদনা করেন বিমল ঘোষ অর্থাৎ মৌমাছি। দু’টি বিভাগের কাঠের পার্টিশনের মধ্যে বড়ো ফোঁকর। সেখান দিয়ে কথাবার্তা চলে। এমনই এক দিনে বিমল ঘোষ ডাকলেন নীরেনবাবুকে ধীরেন বলের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেওয়ার জন্য। উজ্জ্বল চোখ, পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি-পায়ে চপ্পল, রোগা পাতলা লম্বাটে গড়নের মানুষ, মুখে একটু হাসির ছোঁয়া নিয়ে ধীরেন বল এসেছেন। ছোটোদের জন্য লিখতে চান জেনে ধীরেনবাবু নীরেন্দ্রনাথকে বলেছিলেন, “খেয়াল রেখো, মনটা যেন বুড়িয়ে না যায়। সেটাকে সব সময় টাটকা-তাজা রাখতে হবে।”

bal-1এই টাটকা-তাজা মন পেয়েছিলেন সুকুমার রায়ের কাছ থেকে। কারণ দশ বছর বয়স থেকে ধীরেন ‘সন্দেশ’, ‘শিশুসাথী’, ‘খোকাখুকু’-র গ্রাহক ছিলেন। গ্রামের বাড়িতে সেই সব পত্রিকা পৌঁছোত। ওই সময় থেকে বালক ধীরেন ‘শিশুসাথী’তে নিয়মিত লেখা পাঠাতেন। দশ বছর বয়সে স্কুলের খাতাকে তৈরি করেছিলেন পত্রিকা। এ রকম একটি খাতার নাম দিয়েছিলেন ‘গাঁথা’। এই খাতাটি কন্যা পৃথা বলের সংগ্রহে আছে। বাংলাদেশ ছেড়ে চলে আসার সময় কাকা শৈলেন বল নানা জিনিসের সঙ্গে সেটি টিনের বাক্সে কলকাতায় নিয়ে আসেন। লেখা ও আঁকার সম্মিলিত দক্ষতার জন্য স্কুলের প্রধান শিক্ষক ধীরেন বলকে বিশেষ পুরস্কার দেন। কয়েকটি পোর্ট্রেট আঁকার আদেশ দেন। সেই আঁকাগুলি দীর্ঘদিন বগুড়ার করোনেশন স্কুলে ঝোলানো ছিল।

সেই সময় এত পুরস্কারের ছড়াছড়ি ছিল না। ছবি প্রদর্শনীও ছিল না। তবু ‘চেঙাবেঙা’ বইটির ছবির জন্য রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পান। প্রথম প্রকাশিত বই ‘তোলপাড়’ (১৯৪৭)। ‘টইটুম্বুর’-এর জন্য শিশুসাহিত্য সংসদ পুরস্কার পান। এ ছাড়া ভুবনেশ্বরী পদক, মৌমাছি পুরস্কার, রঞ্জিত স্মৃতি পদক পান। শিশুসাহিত্যে বইয়ের মূল্যায়নের জন্য শেষের দিকে বেশ কয়েক বার এনসিইআরটি-র পুরস্কারের বিচারক হয়েছিলেন। জীবনে এক বারই ধীরেন বল বার্মা শেল কর্তৃক “আর্ট ইন ইন্ডাস্ট্রি”তে প্রদর্শনীর জন্য মাত্র তিনটি ছবি পাঠিয়েছিলেন, সব ক’টি পুরস্কার পায়।

জন্ম শতবর্ষে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বলেছিলেন, শুধু লেখা নয়, একই সঙ্গে আঁকতে পারা ‘শিল্পী’র সংখ্যা সারা পৃথিবীতে হাতে গোনা। আমাদের দেশে সুকুমার রায় আর শৈল চক্রবর্তীর পরে সেই বিরল মানুষটি ধীরেন বল।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here