protest of junior doctors
dr. dipankar ghosh
দীপঙ্কর ঘোষ

গত কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহে পশ্চিমবঙ্গের ডাক্তাররা ভীত, সন্ত্রস্ত।

সংখ‍্যাতত্ত্ব অনুযায়ী গত ষাট দিনে ডাক্তার-নিগ্রহের চুয়ান্নটি ঘটনা ঘটেছে। কয়েক দিন আগে পান্ডুয়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মার খেয়ে এক জন ডাক্তারের কানের পর্দা ফেটে গিয়েছে। তবে সব অত‍্যাচারকে ছাপিয়ে গিয়েছে ডেবরার ডাক্তার-নিগ্রহ। এখানে নার্সকে অর্ধ-বিবস্ত্র করে রাস্তায় ফেলে মারা হয় এবং সিনিয়র ডাক্তারকে মলমুত্র খেতে বাধ্য করা হয়। এ রকম অভিঘাতের কোনো নিগ্রহের ঘটনা সাধারণত কোথাও শোনা যায় না। হিসেব দিতে গেলে এই তালিকা শেষ হবে না। জোকায় ইএস‌আই হাসপাতালে রোগীর বাড়ির লোকের ক্ষোভে আইসিইউ-এর সমস্ত যন্ত্রপাতি ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়। এতে এক জন মরণাপন্ন রোগিণীর তৎক্ষণাৎ মৃত্যু ঘটে।

এটা যে শুধুমাত্র একটা মাত্র পেশার বিপর্যয় তা কিন্তু নয়। এটা সামগ্রিক ভাবে একটা বিরাট সামাজিক সমস্যা। সমগ্র ডাক্তারসমাজ এই সব ঘটনায় বিপন্ন। চিকিৎসা তো কেবলমাত্র ব‍্যক্তি-উদ্যোগ নয়। বহু যন্ত্র, বহু জীবনদায়ী ওষুধ আর একটা পরিষেবার বিষয়। ডাক্তারকে পেটানো চললে এই পেশার মানুষদের কেবলমাত্র সন্ত্রস্তই করে তুলবে।

কিছু দিন সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজে প্রায় পূর্ণ কর্মবিরতি চলছিল। কলেজচত্বরে পুলিশ মোতায়েন করার প্রতিশ্রুতি পেয়ে ডাক্তাররা কাজে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু পুলিশ প্রহরায় চিকিৎসা তো সমাজের সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ নয়। সবাইকে ভাবতে হবে  সমাজের যে উজ্জ্বল ছেলেমেয়েগুলি ডাক্তারি পড়তে আসছে তাদের ভয় দেখিয়ে লাভ কী? এরা তো ছাত্রাবস্থায়‌ই রোগী পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। সেই অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন এমন রোগীদের শিক্ষা অনুযায়ী সেবা করেন এবং বিনামূল্যে। যেখানে অন্য পেশায় যাঁরা সরকারি কলেজে পড়েন তাঁরাও নামমাত্র ব‍্যক্তিগত খরচে, আসলে সরকারি খরচে পড়াশোনা করেন। তাঁরা শিক্ষা-শেষে যে যাঁর নিজের সংসার চালাতে ব‍্যস্ত হয়ে পড়েন। সমাজের প্রতি পেশাগত কোনো দায়িত্ব তাঁরা নেন না। যখন অন‍্য পেশার মানুষ উৎসবে মত্ত থাকেন, তখন ডাক্তারপড়ুয়াটা কিন্তু ইমারজেন্সির বাইরে বসে নিজের বাড়ির কথা, বন্ধুদের কথা ভাবছে। সে-ও তো মেধাভিত্তিক পরীক্ষা দিয়ে এসেছে! তার প্রতি এত ঘৃণা কেন? ডাক্তারবাবুরা কিন্তু যে ভাবেই হোক মানুষের কিছু সেবা করতে বাধ্য থাকেন। তা হলে এত বিক্ষোভ কেন?

হয়তো বিক্ষুব্ধ করে তোলা হয় অজ্ঞানত।

আমরা অনেকেই জানি, হার্ট অ্যাটাক মানে হৃদয়ের ধমনিতে রক্ত চলাচল ক্লটের জন্যে বন্ধ হয়ে যায়। শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে এক জন রোগীর হার্টের আর পায়ের ধমনি বন্ধ হয়ে যায়। পায়ের ক্লটটা খোলা যায়নি। ধরে গেল পচন। অবশেষে দীর্ঘ যুদ্ধান্তে পরাজয়। মৃত্যুর জয়। কিন্তু এই লড়াইয়ের শেষে কি ডাক্তারের জন্যে বরাদ্দ হাতকড়া আর কারাবাস? বরাদ্দ হল খুনির তকমা। সমাজ, সন্তান সবাই জানল অমুক ডাক্তার দায়ী – নামসহ প্রতিবেদন প্রকাশিত হল! মৃত্যু তো অনিবার্য, এটা বাস্তব। ডাক্তার এই লড়াইয়ে সামান্য বোড়ে মাত্র। ডাক্তারকেও তার স্বজনবিয়োগের বেদনা সহ‍্য করে কাজ করে যেতে হয়। তবুও নিগৃহীত, তবুও সামাজিক বয়কট।

এই অসহনীয় অবস্থায় বহু ডাক্তার চাইছেন হয় অপমানহীন কর্মস্থল, না হলে সম্মানরক্ষার্থে কাজ বন্ধ। এতে কেবল ডাক্তার-নির্ভর বাংলার রুগ্ন স্বাস্থ্যব‍্যবস্থা ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা বাড়ছে এবং তা ঘটলে বিপুলসংখ্যক মানুষ শুধুমাত্র বিনা চিকিৎসায় থাকবেন।  ঘৃণার পরিবর্তে যুক্তি আসুক। খুঁজে দেখা হোক গলদটা কোথায়? নাকি কেউ ভয় পাচ্ছেন আসল গলদ অর্থাৎ ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল ভুলত্রুটি খুঁজে বার করতে। তাই জনগণের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চলেছে?

(লেখক গড়িয়া অঞ্চলে এক প্রৌঢ় জেনারেল ফিজিসিয়ান)

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন