Petrol Pump
গ্রাফিক্স ছবি
Jayanta Mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

পেট্রোল-ডিজেলের মতো অতি প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল না কি দেওয়াল ধরে বাথরুমে ঢোকার জন্য মদ? কোনটাকে অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখা হবে? কতকটা এমন প্রশ্নে উত্তাল মহারাষ্ট্রের মন্ত্রিসভা শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলল – মদে কর বাড়িয়ে সেই টাকায় ভরতুকি বাড়ানো হবে পেট্রোল-ডিজেলে। যত দূর জানা গিয়েছে, দেশে তৈরি বিদেশি মদ বা আইএমএফএলে সে রাজ্য বিগত ২০১৩ সাল থেকে করের পরিমাণ অপরিবর্তিত রেখেছে। যদিও ২০১৫ এবং ২০১৭ সালে দেশি মদ এবং বিয়ারের উপর করের হার বাড়িয়েছে। তা হলে বিদেশিতে কেন ছাড়?

যা হোক সরকারি বাবুলোকেদের এত দিন পর পেট্রোল-ডিজেলের সৌজন্যে সে কথা মনে পড়েছে। ভালো কথা এবং ভালো উদ্যোগ নি:সন্দেহে। তাই বলে কি মদের দাম বাড়ালে কিছু বিক্রিবাট্টা কমবে? মদের আঁচে যে সংসার পুড়ে খাক হয়, যে যৌবন তলিয়ে যায়, তারা কিন্তু সরকারের এমন সিদ্ধান্তে যে মোটেই স্বস্তি পাবে না, তা নিশ্চিত। কী হয় এ সব করে, তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। বিহারে ক্ষমতায় এসে মদ নিষিদ্ধ করে বাহবা কুড়িয়েছিলেন নীতীশ কুমারের সরকার। তার পর কী হল? প্রকাশ্যে নয়, দেওয়ালে ঘেরা মদ পানে দেদার ছাড়।

এই তো ক’ দিন আগে তারাপীঠে মদ বিক্রি রেকর্ড গড়ল। গদগদ আবগারি বিভাগের কর্তারা। তাঁরা জানালেন, গত বছরের তুলনায় এ বারের কৌশিকী অমাবস্যায় মদ বিক্রির পরিমাণ প্রায় ছ’গুণ। টাকার অঙ্কে যা পাঁচ কোটির আশেপাশে। মিডিয়া কতটা আদিখ্যেতা দেখাল তারাপীঠে ভক্ত সমাগমের বহর নিয়ে। যার মধ্যে একটা বিশাল অংশের ভক্তের ভক্তি কারণবারির সিঞ্চনে সরকারের ভাঁড়ার থইথই করে দিল। এটাও কম বড়ো কথা নয়।

আবার এমন খবরও মিলেছে, চলতি আর্থিক বছরে আবগারি দফতরের রাজস্ব আদায় রেকর্ড বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ আর্থিক বছরে দফতরের রাজস্ব আদায় ছুঁয়েছে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। গত ২০১২-১৩-য় যা ছিল ২৬০৯.৮২ কোটি, ২০১৩-১৪-তে ৩০০০.৫৮ কোটি, ২০১৪-১৫-য় ৩৫৮১.৭৭ কোটি, ২০১৫-১৬-য় ৪০১৪ কোটি এবং ২০১৬-১৭-তে ৫২০১.২১ কোটি টাকা। আর এ বার তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। রাজ্য সরকারের আবগারি দফতরের দাবি, নির্দিষ্ট কয়েকটি পরিকল্পনা নেওয়ার কারণেই এতটা রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে।

wine shop
এই শাঁসালো আয়ের উৎস হাতছাড়া করতে চায় কে-ইবা?

মদ নেশা জোগায়। শুধু মদ বিক্রি নিষিদ্ধ করলেই কি সামাজিক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? গত বৃহস্পতিবার বলিউডের অভিনেতা উদয় চোপড়া দাবি করেছেন, দেশে গাঁজা বৈধ করা হোক।

তা হলে শুধু মদকে ‘নন্দ ঘোষ’ বানিয়ে যত দোষ চাপিয়ে দিয়ে কী হবে? সমাজতাত্ত্বিকরা বলেন, সামাজিক সমস্যার উৎস তো অন্য। এক দিকে অর্থের প্রাচুর্য অন্য দিকে আর্থিক টানাটানি – দুইয়ের কারণেই অতিবিলাস বা হতাশা থেকে মদ্যপ-মনের বাড়বাড়ন্ত। যদিও এ বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক শেষ হওয়ার নয়।

তবে এ কথা তো অস্বীকার করার নয়-ই, মদের বিক্রি যত বাড়বে, ততই ফুলেফেঁপে উঠবে সরকারি কোষাগার। তাতে উন্নয়নমূলক কাজের বহরও বাড়বে। রাজ্যের বামফ্রন্ট আমলের অর্থমন্ত্রী ড. অসীম দাশগুপ্ত মদের দোকানের লাইসেন্স দেওয়ার পরিমাণ বৃদ্ধি করায় কম সমালোচনা হয়নি। তখন তাঁর মিত্রপক্ষ যুক্তি হিসাবে বলত, মদ থেকে আয় হওয়া রাজস্বে সরকারি কর্মীদের বেতন হয়। এমন সোজা বা তির্যক মন্তব্য যতই করা হোক না কেন, এই শাঁসালো আয়ের উৎস হাতছাড়া করতে চায় কে-ই বা?

যেমন চাইছে না মহারাষ্ট্র সরকার। সে রাজ্যে পেট্রোল ও ডিজেলে ভ্যাটের হার যথাক্রমে ২৫-২৬ এবং ২১-২২ শতাংশ। এর থেকে মদের ঘাড়ে কিছুটা ঠেলে দিলে সাধারণ মানুষের স্বস্তি মিললেও মিলতে পারে। কথায় রয়েছে, দিল (মন) বড়ো হলে দেওয়ালের কী ক্ষমতা আছে তাকে আটকানোর। মহারাষ্ট্র সরকার হয়তো সেই বড়ো মনেরই প্রমাণ দিচ্ছে। একটা বহুজাতিক মদ প্রস্তুতকারক সংস্থার বিঞ্জাপনের ক্যাচলাইন -“এটাকে বড়ো করো”। এই ‘এটা’ আসলে কী, হতে পারে দামের তুলনায় পরিমাণে অনেক বেশি, হতে পারে এটা নেওয়ার পর ফুরফুরে অনুভূতির বহর। তবে সেটা তারা স্পষ্ট করে না বললেও বিজ্ঞাপনগুলোতে বীভৎস ভাবে বোঝা যায়, এই ‘এটা’ মানে ‘দিল’।

ফলে চালাও পানসি বেলঘরিয়া -‘দিল’ আর দেওয়ালের খেলাই চলুক!

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন