prasenjitপ্রসেনজিৎ চক্রবর্তী

রাজ্যের বিভিন্ন শহরে বাংলো, বাগানবাড়ি, কৃষিজমি, হায়দরাবাদে বাগানবাড়ি, নীলগিরিতে চা বাগান, ১৭টি দামি গাড়ি, বহুমূল্য অলঙ্কার, ব্যাঙ্কে স্থায়ী আমানত, শেয়ার- সব মিলিয়ে ১৯৯১ সালে থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত প্রথম মুখ্যমন্ত্রিত্ব কালে ৬৬.৬৫ কোটি টাকা মূল্যের সম্পত্তির অধিকারী হয়েছিলেন জয়ললিতা। ১৯৯৭ সালে তার বাড়ি থেকে বাজেয়াপ্ত হয়েছিল ২৮ কিলো সোনা, ৮০০ কিলো রুপো, সাড়ে দশ হাজার শাড়ি, ৭৫০ জোড়া জুতো, ৯১টি হাতঘড়ি ও কোটি টাকার প্রসাধনী। চমকে গিয়েছিল সাড়া দেশ, সারা পৃথিবীও।

১৮ বছরের পুরনো সেই দুর্নীতির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ২০১৪ সালে মুখ্যমন্ত্রীয় চেয়ার থেকে সরাসরি জেলে যান আম্মা। রায় দিয়েছিল কর্নাটকের এক বিশেষ আদালত। ৪ বছরের জেল ও ১০০ কোটি টাকার জরিমানা। পাশাপাশি সাজা হয় তাঁর তিন ঘনিষ্ঠেরও। পরে কর্নাটক হাইকোর্ট নির্দোষ সাব্যস্ত করে তাদের। জয়ললিতা ফের মুখ্যমন্ত্রী হন। কিন্তু ইতিমধ্যে সেই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছে কর্নাটক সরকার। সেখানে বিচার চলছে তার। থুড়ি, চলছিল।

প্রবাদপ্রতিম তামিল অভিনেতা এম জি রামচন্দ্রনের হাত ধরে তামিল রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন জয়ললিতা। পরিচালক শিবাজি গণেশনের একদা পছন্দের এই তামিল অভিনেত্রীর জনপ্রিয়তা তখন আকাশ ছুঁই ছুঁই।

সেকথায় একটু পরে আসা যাবে। তার আগে বলে নেওয়া যাক, গত ত্রিশ বছরের বলিউড কিংবা হালের বঙ্গ রাজনীতি থেকে দ্রাবিড় রাজনীতির সঙ্গে রুপোলি পর্দার সম্পর্কটা মোটেই বোঝা যাবে না। চল্লিশের দশক, পঞ্চাশের দশকে দ্রাবিড় রাজনীতির ডানা মেলা শুরু এবং তার ধারাবাহিকতায় পৃথক রাজ্য অর্জনের সাফল্যের যাত্রাপথে অন্যতম প্রধান ভূমিকায় ছিলেন সাংস্কৃতিক কর্মীরা। রুপালি পর্দার অভিনেতা, পরিচালক, চিত্রনাট্যকাররা। তাঁদের একজন এখনও সক্রিয়। কালাইগনার। ৯৩ বছর বয়সি তামিলনাডুর বিরোধী নেতা করুণানিধি। রাজনৈতিক নেতার জনপ্রিয়তা ও রুপালি পর্দার নায়কের খ্যাতি সে রাজ্যের জনমানসে সর্বদাই মিলেমিশে থেকেছে। তার চূড়ান্ত প্রমাণ আমরা দেখেছি, যখন ১৯৮৭ সালে এমজি রামচন্দ্রনের মৃত্যুর পর আত্মাহুতি দিয়েছিলেন নেতা ও নায়কের ৫৮ জন গুণমুগ্ধ।

১৯৪৮ সালে জন্ম জয়ললিতার। আর প্রথম কোনো ছবিতে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় মাত্র ১৫ বছর বয়সে। চাইন্নাড়া গোম্বে। সেটি ছিল কন্নড় সিনেমা। প্রথম তামিল ছবিতে অভিনয় ১৯৬৫ তে। তারপর এমজিআর-এর সঙ্গে জুটি বাঁধা এবং তুমুল জনপ্রিয়তা। এবং প্রেম। বিতর্কের জেরে জুটি ভেঙে যাওয়া এবং আবার তৈরি হওয়া, সবই যেন সিনেমা। ১৯৮০ সালে ‘নদীয়াই থেডি ভান্ডা কাদাল’ জয়ললিতার মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করা  শেষ ছবি। তখন তাঁর ৩০০ সিনেমায় অভিনয় হয়ে গেছে। তারপর থেকেই এআইডিএমকে-র রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।     

রামচন্দ্রনের মৃত্যুর পর ৯১ সালে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন জয়া। মুখ্যমন্ত্রিত্বের স্বাদ পেতে পথের কাঁটা এমজিআর-এর স্ত্রী জানকি রামচন্দ্রনকে সরাতে হয়েছিল এই আম্মাকে। তামিল রাজনীতিতে পরিচিত হয়েছিলেন পুরাতচি থালাইভি নামে। যার অর্থ বিপ্লবী নেত্রী।

jaya-mgr

এই তথ্য দিয়েই তামিলনাডুর ভোটচিত্রের সব রং ধরা যাবে না। তার জন্য জানতে হবে, ১৯৮৯ সাল থেকে ডিএমকে ও এআইএডিএমকে পালা করে রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনগুলিতে জিতে আসছে। তাদের ক্ষমতায় আসতে সাহায্য করেছে বিভিন্ন ছোট দল। দ্রাবিড় রাজনীতির অন্যতম প্রবাদপুরুষ করুণানিধি সেই ১৯৬৯ সালে থেকে মোট পাঁচবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। ১৯৯১ সাল থেকে নানা ধাপে ছ’বার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন জয়ললিতাও।

করুণানিধি ও জয়ললিতা – দুজনের ইতিহাসেই লেগে আছে দুর্নীতির ছায়া। দুজনের ব্যক্তিত্বের লড়াইও কম রোমাঞ্চকর নয়। ২০০১ সালে মুখ্যমন্ত্রী হয়ে, উড়ালপুল দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে বৃদ্ধ করুণানিধিকে মধ্যরাতে বাড়ি থেকে গ্রেফতার করিয়েছিলেন আম্মা। সেই ঘটনা আজ ইতিহাস।

তবে বৃদ্ধ চিত্রনাট্যকারকে এক জায়গায় কিন্তু হারিয়ে দিয়েছেন পুরাতচি থালাইভি। করুণানিধি তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক কেরিয়ারে কখনো পরপর দু’বার মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেননি। আম্মা ২০১৬ সালে ফিরে এসেছিলেন। পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতির অভিযোগ ঘাড়ে নিয়েও।

jaya-karunanidhi

দ্রাবিড় আত্মমর্যাদার সোচ্চার দাবি নিয়ে যে ভূখণ্ডের রাজনৈতিক পথচলা শুরু; ক্ষমতা, অর্থ, দুর্নীতির সবরকমের জটিল সমীকরণ গত পাঁচ দশকে সে দেখে নিয়েছে। সিনেমার কুশীলবরা বাস্তবের যে চিত্রনাট্য বারবার রচনা করেছেন, তার দিকে চেয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছে রুপালি পর্দা। আর সেই বাস্তবের অবিশ্বাস্য নির্মাণে অন্যতম প্রধান ভূমিকায় ছিলেন জয়রাম জয়ললিতা। ‘বিপ্লবী নেত্রী’-র এই মূল্যায়ন করতে গিয়ে ভবিষ্যতে কি হাত কেঁপে যাবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ? এ প্রশ্নের উত্তর তাঁর সেই সব ভক্তরাই জানেন, যারা এখন আত্মহত্যার প্রস্তুতি নিচ্ছেন (হয়তো বা)।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here