মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী গোপালকৃষ্ণ, তাঁকে যারা উপরাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী করলেন, তাঁদের কী মত?

0
865
নীলাঞ্জন দত্ত

নন্দীগ্রামে তখন ‘সূর্যোদয়’ হয়েছে। মানে, আন্দোলনকারীদের হাত থেকে এলাকা পুনর্দখলের অভিযানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে শাসক দল আর পুলিশের যৌথবাহিনী। সন্ত্রাসের রাজত্ব কাকে বলে, স্বচক্ষে দেখে একদিন সেখান থেকে ফেরার পথে কে যেন বললো, “চলো, আমরা রাজ্যপালের কাছে গিয়ে সব বলি।” তাতে কী হবে জানি না, কিন্তু তখন সবাই মরিয়া। কলকাতায় ঢুকেই আর কোথাও না গিয়ে সোজা রাজভবনে। সিংহদরজায় পাহারারত পুলিশকে দিয়ে খবর পাঠানো হল। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরেই ডাক এল। পথ দেখিয়ে আমাদের নিয়ে যাওয়া হল রাজ্যপালের কাছে। কীভাবে শুরু করবো কথাটা? হঠাৎ সাহস করে বলেই ফেললাম, “আমরা নন্দীগ্রাম থেকে আসছি। কিন্তু আমরা রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধীর কাছে আসিনি। সিভিল লিবার্টিস অ্যাকটিভিস্ট গোপালকৃষ্ণ গান্ধীর কাছে এসেছি।” কোনও ভাবান্তর হল না। শুধু একটু যেন হাসি ফুটে উঠলো ঠোঁটের কোণে। বললেন, “আমি তো সব জানতেই চাই। আপনারা যা দেখেছেন বলুন আমাকে। আমার যা করার, করবো।”

গোপালকৃষ্ণ গান্ধী এই রকমই। যতই উঁচু পদে থাকুন না কেন, নিজেকে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের কর্মী বলে ভাবতেই ভালবাসেন। আর কেউ এই পরিচয়ে তাঁকে চিনলে খুশিই হন। এখনও। তাই উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী মঞ্চের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করার পরেই সাংবাদিকরা যখন তাঁকে চেপে ধরে, “আপনি নাকি মুম্বই বিস্ফোরণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত ইয়াকুব মেমনের ফাঁসি রদ করার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন?” তখন বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে তিনি বলেন, “একজন সাধারণ, স্বাধীন নাগরিক হিসেবে আমার দায়িত্ব হল আমার নীতিগুলি পালন করা। আমি এটা মনে করি। মৃত্যদণ্ডের বিষয়ে আমার অনুপ্রেরণা আমি গ্রহণ করেছি দুজনের কাছ থেকে – মহাত্মা গান্ধী, যিনি এর বিরোধী ছিলেন, এবং বাবাসাহেব আম্বেডকার, যিনি বলেছিলেন এটা তুলে দেওয়াই ভাল।”

উপ-রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন জমা দিচ্ছেন গোপালকৃষ্ণ গান্ধী

সাংবাদিকরা গোপালকৃষ্ণের সম্পর্কে বিতর্ক তোলার ইন্ধন পেয়েছিলেন শাসক জোটের সঙ্গী শিবসেনার সাংসদ সঞ্জয় রাউতের কাছ থেকে। তিনি এর আগের দিন, উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধীদের প্রার্থীর নাম ঘোষণার পরেই সংবাদমাধ্যমের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “১৯৯৩-এর মুম্বই বিস্ফোরণের চক্রান্তকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পরেও কিছু লোক এই মৃত্যুদণ্ড রদ করা এবং দয়া দেখানোর জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে। গোপালকৃষ্ণ গান্ধী ছিলেন এদের মধ্যে একজন। আমার মনে হয়, এরকম একজন লোককে একটা সাংবিধানিক পদের জন্য মনোনীত করে কংগ্রেস দেশকে অপমান করেছে। এটা দেশপ্রেমিকদের এবং দেশের আবেগকে অসম্মান করা।” সেখানেই থেমে না থেকে তিনি টুইট করেন, “আপনারা কি গোপালকৃষ্ণ গান্ধীকে উপরাষ্ট্রপতি পদে দেখতে চান? যিনি ১৯৯৩-এর মুম্বই বিস্ফোরণের চক্রান্তকারী ইয়াকুব মেমনকে ফাঁসি দেওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন।”

দেশজোড়া মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মীরা তাঁর পাশে দাঁড়াতে পারতেন। তাঁরা তো চিরকাল এই অমানবিক শাস্তির অবলুপ্তির দাবিই করে আসছেন। এই সময়ে সেই দাবিকে সামনে নিয়ে আসা যেত। কিন্তু নির্বাচনী ছোঁয়াচ এড়াতেই হয়ত, তাঁরাও দূরে সরেই রইলেন।

সাংবাদিকরা এবিষয়ে তাঁর মন্তব্য জানতে চাইলে গোপালকৃষ্ণ বলেন, “শিবসেনা নিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর কর্তব্য পালন করছে। শিবসেনা যা বলেছে, তা তাঁকে বলতেই হতো। আমি মনে করি, মৃত্যুদণ্ড মধ্যযুগীয়। মৃত্যুদণ্ড ভুল, এবং এটাই আমার নীতি।”

এই বিশ্বাস থেকেই গোপালকৃষ্ণ পাকিস্তানে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ভারতীয় নাগরিক কূলভূষণ যাদবের জন্যেও ১১ এপ্রিল সে দেশের রাষ্ট্রপতিকে চিঠি লিখেছিলেন। এই চিঠিতে তিনি লেখেন, “আমি আপনার কাছে আবেদন করছি, একটু থেমে ভাবুন যে রাষ্ট্র যখন প্রতিহিংসার থেকে একজন ব্যক্তির বাঁচার অধিকারের ওপর আক্রমণ চালায় এবং একটি মানুষের প্রাণ নিয়ে নেয়, তখন সে কীরকম দায়িত্বজ্ঞানহীন ও নীতিশূন্য কাজ করে।”

আরও পড়ুন: ভারতের ছ’জন উপরাষ্ট্রপতি যাঁরা রাষ্ট্রপতি হয়েছেন

কেবল যে এই দুজনের জন্যই তিনি মৃত্যুদণ্ড রদের আর্জি জানিয়েছেন তাই নয়, ভারত থেকে কেন এই শাস্তিটাই তুলে দেওয়া উচিত, তা নিয়ে তিনি আস্ত একটা বইও লিখে ফেলেছেন – ‘অ্যাবলিশিং দা ডেথ পেনাল্টি: হোয়াই ইন্ডিয়া শুড সে নো টু ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট’ (নিউ দিল্লি, আলেফ বুক কোম্পানি, ২০১৬, ৩৯৯ টাকা)। এই বইতে গোপালকৃষ্ণ দেখিয়েছেন মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে কীভাবে লুকিয়ে থাকে আদিম প্রতিহিংসার বীজ, কীভাবে মানুষের মধ্যেকার এই সুপ্ত প্রবৃত্তিকে তার রাজনৈতিক স্বার্থে লালন করে রাষ্ট্র, কেন মৃত্যুদণ্ড আসলে রাজনৈতিক হত্যারই আর এক রূপ, কীভাবে আজকের যুগে মিডিয়া তাকে একটা বিকট মনোরঞ্জন হিসেবে উপস্থিত করে আমাদের কাছে আর কীভাবে আমরা ফাঁসিতে চড়া একটি লোকের শেষ মুহূর্তটা পর্যন্ত উদগ্রীব হয়ে গিলি – ভারত-পাকিস্তানের ক্রিকেট ম্যাচ দেখার মত।

কিন্তু কোনও নীতি, যুক্তির তোয়াক্কা না করে গোপালকৃষ্ণের ওপর ব্যক্তিগত আক্রমণ নামিয়ে আনা হয়েছে। তাঁর উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার খবর যেসব সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তাদের ওয়েবসাইটগুলোতে খবরটার তলায় মন্তব্য লেখার জায়গায় ঝাঁকে ঝাঁকে ‘ট্রল’ বা ইন্টারনেটে লোকের গায়ে কাদা ছেটানোর দল গালাগালির বন্যা বইয়ে দিয়েছে। এমনকি, মিডিয়ার একাংশও এই আক্রমণে যোগ দিয়েছে। তারা পুরো ব্যাপারটাকে দেশভক্তির ইস্যু করে তুলেছে। যেমন, ‘টাইমস নাও’ এবিষয়ে তাদের টক-শোর বিজ্ঞাপন দিয়ে টুইট করেছে, “Patriot pariksha for UPA’s V-P candidate GK Gandhi, does he pass or fail?”

এই প্রবল প্রতিপক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে ১৮ জুলাই উপরাষ্ট্রপতি পদের জন্য পার্থীপত্র পূরণ করার পর গোপালকৃষ্ণ মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে একাই লড়ে গেলেন। তাঁর মনোনয়নকারী বিরোধী দলগুলির তাবড় তাবড় নেতারা সেই লড়াইতে যোগ দিলেন না। কারণ তাঁরা তো আসলে তাঁদের প্রার্থীর এই মতের অংশীদার নন, তাঁদের সরকারের আমলেও তো মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, হবে।

দেশজোড়া মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মীরা তাঁর পাশে দাঁড়াতে পারতেন। তাঁরা তো চিরকাল এই অমানবিক শাস্তির অবলুপ্তির দাবিই করে আসছেন। এই সময়ে সেই দাবিকে সামনে নিয়ে আসা যেত। কিন্তু নির্বাচনী ছোঁয়াচ এড়াতেই হয়ত, তাঁরাও দূরে সরেই রইলেন।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here