nilanjan dutta
নীলাঞ্জন দত্ত

তখন অমৃতবাজার পত্রিকায় কাজ করি। ১৯৯০ সালের ১০ নভেম্বর। সে দিন মর্নিং ডিউটি ছিল। বিকেলে কাজ সেরে বাড়ি যাওয়ার সময় হয়ে গেছে, হঠাৎ চিফ রিপোর্টার সোমেনদা ডেকে বললেন, “দমদমে নাকি একটা প্লেন হাইজ্যাক করে নামিয়েছে বার্মিজরা। এক বার দেখে এসো তো গিয়ে।”

বাড়ি যাওয়ার বারোটা বাজল। বারোটাও নয়, সে দিন রাতে আর বাড়ি যেতেই পারলাম না। রাতভর এয়ারপোর্টে চলল হাইজ্যাক নাটক। হাইজ্যাকাররা কারা, তারা কী চায়, বুঝতেই অনেকক্ষণ লেগে গেল পুলিশ আর প্রশাসনের কর্তাদের। ওদের ভাষাই তো বোঝা যাচ্ছে না। আর ওদের ইংরেজিও এতই ভাঙা ভাঙা, যে তা থেকেও কিছু উদ্ধার করা মুশকিল। শেষে যখন তারা প্লেন থেকে বেরিয়ে এল, দেখা গেল, দুটো একেবারেই কমবয়সি ছেলে, একদম নিরস্ত্র। থাই এয়ারওয়েজের টিজি ৩০৫ প্লেনটাকে এখানে নামিয়েছিল স্রেফ একটা সাবান কাগজে মুড়ে সেটাকে ‘বোমা’ বলে পাইলটকে ভয় দেখিয়ে। যাত্রীদের কোনো ক্ষতিই করেনি, করবার উদ্দেশ্যও ছিল না। উদ্দেশ্য একটাই – সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের জন্য বার্মার জনগণের আন্দোলনের প্রতি পৃথিবীর মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। বেরোল যখন, তাদের হাতে ধরা দু’টো সাদা কাগজ, তাতে কোনো রকমে নিজেদের আঙুল চিরে রক্ত বার করে তা দিয়ে গোটা গোটা অক্ষরে লিখেছে, “ফ্রি বার্মা। ফ্রি আউং সান সু চি।” এরা ‘ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসির ছাত্রকর্মী।

এমনিতে প্লেন হাইজ্যাকিং বা তার চেষ্টা করা সারা পৃথিবীতেই এক ভয়ংকর অপরাধ এবং নাশকতা ও সন্ত্রাসবাদের চূড়ান্ত উদাহরণ বলে ধরা হয়। কিন্তু পরের দিন সকালের কাগজে লোকে এই বিবরণ পড়ার পর থেকে তাদের প্রতি সহানুভূতির বন্যা বয়ে গেল। কেবল সাধারণ মানুষের মধ্যেই নয়, মিডিয়া, সরকার, পুলিশ, এমনকি বিচারবিভাগের মধ্যেও যেন ওই দু’টি বার্মিজ ছাত্রকে একটু আলাদা নজরে দেখা হতে লাগল। শাসক বা বিরোধী, কোনো শিবিরের মধ্যেই এর ব্যতিক্রম দেখিনি। অপরাধী বা সন্ত্রাসী তো নয়ই, তারা গণতন্ত্রের সৈনিকের মর্যাদা পেয়ে গেল। কয়েক দিন জেলে থাকার পর এই দু’জন, সোয়ে মিন্ট আর টিন কিঅ, জামিন পেয়ে গেল। শেষে ২ জুলাই ২০০৩ বেকসুর খালাস। তার আগেই টিন দেশে ফিরে গিয়ে আবার ঝাঁপিয়ে পড়েছে গণতন্ত্রের সংগ্রামে, আর সোয়ে মিন্ট দিল্লিতে গিয়ে ‘মিজিমা’ বলে একটা সংবাদসংস্থা খুলে ফেলেছে। তত দিনে তাদের সঙ্গে আমার বেশ বন্ধুত্বও হয়ে গেছে।

দিল্লিতে গেলেই সোয়ে মিন্টের ডেরায় একবার যেতাম। শুনলে অবাক হতে পারেন, সেটা ছিল ৩ কৃষ্ণমেনন মার্গে সমাজবাদী নেতা জর্জ ফার্নান্ডেজের বাংলোর এক কোণে। যে সময়কার কথা বলছি, তার মধ্যে বেশ কয়েক বছর জুড়ে জর্জ শাসক এনডিএ জোটের আহ্বায়ক, এমনকি দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীও। সোয়ে মিন্টের সঙ্গে সেখানে থাকে আরও ক’জন বার্মিজ গণ-আন্দোলনের দেশছাড়া কর্মী। তাদের কাছে বার্মার ইতিহাস, সংস্কৃতি, সামরিক জুন্টার উত্থান, জনগণের ওপর নিপীড়ন আর গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছি। তারা বলত ‘মিয়ানমার’ নামটা সামরিক শাসকদের চাপিয়ে দেওয়া, ওটা ব্যবহার না করতে। তাই আজও ‘বার্মা’ই লিখছি।

ওদের কাছেই শুনেছিলাম, বার্মা হল এক বহু-জনগোষ্ঠীর দেশ, যেখানে সামরিক শাসকরা ছোটো ছোটো জনগোষ্ঠীকে বুটের তলায় চেপে রেখে দিয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে চিন, কাচিন, রোহিঙ্গারা। ১৯৮২-র নাগরিকত্ব আইন অনুসারে যে ১৩৫টা জনজাতিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, তাদের তালিকায় রোহিঙ্গাদের নামই নেই। এখন তারা কোনো দেশেরই নাগরিক নয়। রাখাইন রাজ্যে, যেখানে বেশির ভাগ রোহিঙ্গা থাকে, ১৯৭০ দশকের শেষ দিক থেকে মাঝে মাঝেই গ্রামে গ্রামে সৈন্যরা হানা দেয়, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয় তাদের দেশছাড়া করার জন্য। ওরা কোনো দিন বলেনি, রোহিঙ্গারা সন্ত্রাসবাদী। বলেছিল, গণতন্ত্রের সংগ্রাম জয়ী হলে, সু চি মুক্ত হলে, এই সব সমস্যার সমাধান হবে। একই আশার কথা শুনেছিলাম রোহিঙ্গাদের নিজমুখে, ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশের রাঙামাটিতে তাদের শরণার্থী শিবিরে গিয়ে।

কারও আশাই পূরণ হয়নি। বার্মার গণতন্ত্রীদেরও না, রোহিঙ্গা শরণার্থীদেরও না। সু চি ক্ষমতা পেয়েছেন, কিন্তু ক্ষমতার যুক্তিতেই মজে গেছেন। রোহিঙ্গা বিতাড়ন সমানেই চলেছে, তিনি টুঁ শব্দটি করেননি। রাষ্ট্রপুঞ্জ রোহিঙ্গাদের পৃথিবীর সব চেয়ে নিপীড়িত সংখ্যালঘু আখ্যা দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক চাপে বা যে কারণেই হোক, ২ অক্টোবর শেষ পর্যন্ত বার্মা সরকার বাংলাদেশে চলে আসা রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে। এই হতভাগ্য মানুষগুলোকে নিয়ে এর আগেও বেশ কয়েক বার এ রকম ফুটবল খেলা হয়েছে। তাড়া খেয়ে তারা পালিয়ে গেছে, আবার অনেকে ফিরে এসেছে – যতক্ষণ না আবার তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়। কয়েকশো বছর ধরে সে দেশে থাকলেও বার্মার শাসকরা চিরকালই তাদের ‘বাঙালি”’বলে খেদিয়ে এসেছে। এ বার আউং সান সু চি-র সরকারও তাদের ফেরত নেবে বলছে বটে, কিন্তু তাদের কেড়ে নেওয়া নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো আশ্বাস দেয়নি।

যা-ই হোক, রোহিঙ্গারা আবার হয়তো ফিরে যাবে। গিয়ে তাদের ভাঙা-পোড়া ঘরবাড়ি নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করবে। মেয়েদের শরীর আর মনে থেকে যাবে ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের স্মৃতি, অন্তত ২৫টা শরণার্থী শিবিরের ডাক্তাররা যার প্রমাণ পেয়েছেন।

কিন্তু আমাদের ভারতীয় সমাজে এ বারের ঘটনাবলি যে দাগ রেখে গেল, তা মুছবে কবে? বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থী এসেছে আর ভারতে চল্লিশ হাজারের মতো। ভারত সরকার এদের শরণার্থী বলেই স্বীকার করেনি, বলেছে এরা বেআইনি অনুপ্রবেশকারী এবং দেশের নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক। পশ্চিমবঙ্গ সরকার যদিও এখানকার বিভিন্ন হোমে থাকা রোহিঙ্গা শিশুদের ফেরৎ পাঠাতে অস্বীকার করেছে, তাকেও এদের রাষ্ট্রপুঞ্জের শরণার্থী কার্ড দেওয়ার কর্মসূচি বাতিল করতে হয়েছে – শোনা যায়, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দফতরের আপত্তিতে। পুজোর ঠিক আগে বিএসএফ এ রাজ্যের সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে ঘরে ঘরে রোহিঙ্গা খুঁজে বেড়াতে শুরু করল। আর বিজয়া দশমীর দিন আরএসএস প্রধান তাঁর ভাষণে বলে দিলেন, “রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে তাড়ানো হচ্ছে মূলত তাদের ধারাবাহিক ভাবে হিংসাত্মক ও অপরাধমূলক বিচ্ছিন্নতাবাদী কাজকর্মে জড়িত থাকার জন্য এবং সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে যোগসাজস থাকার জন্য।”

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রতি সংহতিতে কলকাতায় পথনাটক

বার্মা থেকে রোহিঙ্গা বিতাড়ন চলছে কয়েক দশক ধরে, তবে সেখানকার সরকার ইদানীং এই অভিযোগে বেশি করে তুলছে, হয়তো আজকের পৃথিবীতে কাউকে এই তকমা দিয়ে দিলেই তার সঙ্গে অমানবিক আচরণ করার ন্যায্যতা আদায় করা যায় বলেই। কিন্তু তারাও সেনা আর পুলিশের ওপর কয়েকটা ছোটোখাটো হামলার উদাহরণ ছাড়া বেশি কিছু দেখাতে পারেনি। সম্প্রতি সেখানকার সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হল যে তারা রাখাইন প্রদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের কিছু কবর খুঁজে পেয়েছে। কোনো কোনো ভারতীয় টিভি চ্যানেলও কয়েক দিন ধরে এই খবর প্রচার করে বলতে শুরু করল, “এই তো সন্ত্রাসের প্রমাণ পাওয়া গেছে।” কিন্তু তার পর সব চুপচাপ। এ খবর যাচাই করা দুঃসাধ্য। কারণ, আজ পর্যন্ত বার্মা সরকার বা সেনাবাহিনী ওই জায়গায় কোনো সংবাদমাধ্যম, ত্রাণকর্মী বা মানবাধিকার কর্মীকে ঢুকতেই দেয়নি।

কিন্তু এ সব ঘটনা যদি সত্যি বলে ধরেও নেওয়া যায়, তা দিয়ে কি লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষকে ভিটেমাটিছাড়া করাটা ঠিক হয়েছে বলা চলে? এই প্রশ্নটা, কেন জানি না, জোরের সঙ্গে উঠে আসছে না। বরং আমরা, যারা সে দিন বিমান ছিনতাইয়ের মতো ভয়ংকর কাজ করা সত্ত্বেও সোয়ে মিন্টদের সন্ত্রাসী বলিনি যে হেতু তারা গণতন্ত্রের জন্য লড়ছে, আজ কত সহজেই মেনে নিচ্ছি যে রোহিঙ্গারা সবাই উগ্রবাদী, আমাদের দেশের পক্ষে বিপজ্জনক, এমনকি পাকিস্তানের চর!

সে দিন এই পশ্চিমবঙ্গের এপিডিআর, দিল্লির পিইউডিআর-এর মতো যে সমস্ত মানবাধিকার সংগঠন ওই বার্মিজ ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছিল, তাদের আর যাই হোক, দেশদ্রোহিতার অভিযোগ শুনতে হয়নি। আর এখন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বক্তৃতা দিয়ে বললেন, যে মানবাধিকার সংগঠনগুলো রোহিঙ্গাদের শরণার্থী হিসেবে গণ্য করার দাবি তুলছে, তাদের ‘ভারতীয়দের স্বার্থ’ আর ‘ভারতীয়ত্ব’র কথা আগে ভাবতে হবে।

ভারত সরকার কাকে শরণার্থী বলে স্বীকৃতি দেবে অথবা দেবে না, তা সে ইচ্ছেমতো ঠিক করতে পারে, তার কোনো আন্তর্জাতিক রীতিনীতি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা নেই। কারণ রাষ্ট্রপুঞ্জের ১৯৫১ সালের ‘রেফিউজি কনভেনশন’ বা ১৯৬৭ সালের ‘রেফিউজি প্রটোকল’-এ এই দেশ আজ পর্যন্ত সই করেনি। কিন্তু ‘ভারতীয়ত্ব’ কী বলে? কোথায় গেল উপনিষদের আহ্বান – ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’?

তা হলে কি আমাদের মূল্যবোধই পালটে যাচ্ছে? ‘রোহিঙ্গা সমস্যা’ আমাদের এই গভীরতর সমস্যার সামনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here