sambhu bhattacharya
payel samanta
পায়েল সামন্ত

এক সময় বাঙালির দুপুর ছিল ম্যাটিনি শোয়ে ভরপুর। মা-কাকিমাদের আঁচল ধরে সেই সব দুপুরে রুদ্ধশ্বাসে গেলা হত দুর্দান্ত সব বাংলা সিনেমা। ভক্ত প্রহ্লাদ, বিদ্যাপতি অতিক্রম করে বাংলা ছবি তখন মারপিট, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, গুন্ডামিতে সাবালকত্ব অর্জন করে ফেলে্ছে। ডাকাতি, পেশির জোর দেখিয়ে চাঁদা আদায়, জোর করে মহিলাদের তুলে নেওয়া, অকারণে হাঙ্গামা করে নায়কের সঙ্গে মারামারি— এ সমস্ত করেই বাংলা ছবির ভিলেন শম্ভু ভট্টাচার্য তখন বাড়ির মা-কাকিমাদের ত্রাস হয়ে উঠেছিলেন। সেই ভাবেই তাঁর সঙ্গে মোলাকাত হয়েছিল শৈশবে। অনেক দিন অবধি তাঁর নাম জানতাম ঘ্যাচাং ফু (ছবি ‘চারমূর্তি’)।

যুগটা পালটেছে। স্মার্টফোন আর ডিজিটাল দুনিয়ার দৌলতে বাঙালির হাতের মুঠোয় এখন সারা বিশ্ব। কিন্তু কাশীপুরের সরকারি আবাসনে ‘ঘ্যাচাং ফু’ ওরফে শম্ভু ভট্টাচার্যর একতলার বসার ঘরে এখনও রুপোলি পর্দার যুগ থমকে। সারা ঘর জুড়ে অগুনতি ফ্রেমে বাঁধানো ছবিতে নানা সাজে তিনি। কোনো ফ্রেমে তাঁর সঙ্গে ধর্মেন্দ্র তো কোনো ফ্রেমে তিনি প্রসেনজিৎ-এর সঙ্গে। দেওয়ালে উত্তমকুমারের হাস্যোজ্জ্বল ছবিতে মালাও ঝুলছে। রয়েছে তাঁর পাওয়া পুরস্কারের নমুনাও।

আরও পড়ুন: কী কী ছবি দেখবেন কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে: খবর অনলাইনের বাছাই

চোখে তখনও সেই ছ’ফুট লম্বা, পেশিবহুল শরীরের ছবি ভাসছিল। বাংলা সিনেমার সেই ডাকসাইটে গুন্ডাকে এখন ঠিক কেমন দেখতে? অশীতিপর বৃদ্ধ শম্ভুকে দেখে সন্দেহ হল, ইনিই কি সেই চম্বলদস্যু লাখন সিং? পেশির সেই শক্তিও নেই, নেই সেই সুঠাম, ঋজু ডনবৈঠক করা শরীর। লাঠিতে ভর করে হাঁটতে হয় তাঁকে, বসে থাকার পর কারও সাহায্য ছাড়া উঠতে পারেন না তিনি। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে আর বয়সের সঙ্গে লড়তে লড়তে তিনি হারিয়েছেন সব। তবে রয়ে গেছে সেই বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর, যা একবার শুনলে আজও মা-কাকিমারা যে শিহরিত হবেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। শুধু মা-কাকিমা কেন, আমিও কি কম শিহরিত হয়েছি? এই ৮৩ বছর বয়সেও সেই প্রথম ছবি ‘ছিন্নপত্র’র ডায়লগ অনর্গল বলে যাচ্ছেন।

‘সাগিনা মাহাতো’, ‘কলকাতা ৭১’, ‘সন্ন্যাসীরাজা’, ‘ধনরাজ তামাং’, ‘সব্যসাচী’, ‘অগ্নীশ্বর’, ‘চারমূর্তি’ — এমন কত জনপ্রিয় ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন। এখনও বলে দিতে পারেন সে সব কাজের অভিজ্ঞতা। শক্তি সামন্তের ‘অমানুষ’ ছবিতে যে উত্তমকুমারই তাঁকে রোলটা পাইয়ে দিয়েছিলেন সে কথা আজও বলতে ভালো লাগে।

এখনকার মেগা সিরিয়াল দেখেন? কী মনে হয়? খানিক ভেবে খবর অনলাইনকে ‘সন্ন্যাসী রাজা’র নিতাই বললেন, “আগেকার দিনের তাবড় তাবড় শিল্পীদের অভিনয় দেখেছি তো! এখন সব কিছুই তাই কৃত্রিম বলে মনে হয়।”

drwaing room of sambhu bhattacharya
নিজের অভিনীত চরিত্রগুলির ছবিতে সাজানো ঘর।

শক্তি সামন্ত, পীযূষ বসু, তপন সিংহ, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ খ্যাতনামা পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করার আগেই তিনি নাট্যকার ও অভিনেতা উৎপল দত্তের সংস্পর্শে এসেছিলেন। শম্ভুবাবু উৎপল দত্তের প্রায় ৮-১০টা নাটকে চুটিয়ে অভিনয় করেছেন। এ ছাড়াও মঞ্চে তাঁকে পাওয়া গিয়েছে জহর রায়, অমর বোস বা রবি ঘোষদের নাটকে। বলতে বলতে উদ্ভাসিত হয়ে আসে তাঁর চোখ-মুখ। আশৈশব তিনি বাগবাজারের ছেলে, এলাকায় পড়াশোনার থেকে মারদাঙ্গাতেই বিখ্যাত ছিলেন। তার পরে নাটক আর সিনেমায় উত্তরোত্তর জড়িয়ে পড়া।

আর উত্তমকুমার? এই প্রসঙ্গ উঠলেই বিহ্বল হয়ে পড়েন শম্ভু ভট্টাচার্য। বাঙালির মহানায়কের সঙ্গে ছিল তাঁর আবেগের সম্পর্ক — ‘দাদা’। দূরে আউটডোর থাকলে পরিচালককে বলে উত্তমকুমার একসঙ্গে প্লেনের টিকিট কাটতে বা পাশাপাশি হোটেল বুক করতে বলতেন। মহানায়কের এতটাই নাকি ভরসা ছিল শম্ভুর উপর! দেওয়ালে টাঙানো ‘সন্ন্যাসীরাজা’র সাজে উত্তমকুমারের এনলার্জড করা ছবিটার দিকে তাকিয়ে সেই শম্ভু ভট্টাচার্য বললেন, “সুপ্রিয়া দেবীর মেয়ের বিয়েতে দাদা কন্যাসম্প্রদান করবেন বলে ঠিক করেছিলেন। গণ্ডগোলের আশঙ্কা ছিল খুব। আমাকে ডাকলেন তিনি। বললেন, আমি চাই প্রোটেকশনের দায়িত্ব নাও তুমি। আমি ময়রা স্ট্রিটের চৌহদ্দিতে কয়েকটা ছেলে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। পরের দিন বর-কনে চলে যাওয়া পর্যন্ত আমরা ছিলাম। দাদা মাঝেমাঝে এসে আমাদের খাওয়াদাওয়ার খোঁজ নিয়ে যেতেন।”

বেশ কয়েকটা হিন্দি ছবিও তো করেছেন? তা হলে পাকাপাকি ভাবে বম্বেতে আরও কাজ করলেন না কেন? ঝাপসা চোখে অতীতের দিকে ফিরে তাকাতে শম্ভুবাবুর এখনও কোনো কষ্ট হয় না। নিঃসঙ্গ জীবনে এই স্মৃতিগুলোই তাঁর বাঁচার রসদ। হাসিমুখে বললেন, “হিন্দিতে অমানুষ, লালকুঠি আর কহতে হ্যায় মুঝকো রাজা করেছি। আসলে সেন্ট্রাল গর্ভমেন্টের চাকরি আর বাগবাজার ছেড়ে দূরে থাকাটা মুশকিল ছিল। তা ছাড়া হিন্দি ভাষাটাতেও স্বচ্ছন্দ ছিলাম না। তাই হিন্দি ছবিতে বেশি কাজ করা হয়নি।”

হিন্দি-বাংলা মিলিয়ে দেড়শোর উপর ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন। ২০০৩ সাল নাগাদ ভারত-বাংলাদেশ প্রযোজনায় ‘চুড়িওয়ালা’ নামের একটি ছবিতে শেষ অভিনয় করেছেন। তার পর অভিনয়ে ছেদ। বাংলা ছবির লেঠেল সর্দার, মস্তান শম্ভু এখন ইজিচেয়ারে ঠাঁই নিয়েছেন। বার্ধক্য, অসুখে হারিয়ে গিয়েছে স্বাস্থ্যরূপ সম্পদ। কিন্তু মন সরে আসতে পারেননি রুপোলি পর্দার মায়া থেকে। কাউকে সামনে পেলেই তাঁর লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের অনর্গল রিল চালু হয়ে যায়। তখন মনেই হবে না ইনিই সেই ঘ্যাচাং ফু। আমারও মনে হয়নি। শুধু মনে হল, ডাক্তার-ওষুধ এড়িয়ে আরও অনেক দিন ভালো থাকুন ঘ্যাচাং ফু, থুড়ি, শম্ভু ভট্টাচার্য।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here