mamata, rahul amd amit
দেবারুণ রায়

চন্দ্রবাবু নায়ডুর মতো এনডিএ ছাড়ার প্রশ্ন নীতীশের আর নেই। তাঁর ছক আলাদা। পাকেচক্রে বিজেপি যদি আগামী ভোটে লোকসভায় নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা হারায় এবং তখন জোট আর গদি বাঁচাতে শরিকদের কাউকে প্রধানমন্ত্রী করার সূত্র যদি সামনে আসে, তেমনই এক কাল্পনিক অসম্ভবের লক্ষ্যে ঘুঁটি সাজানোর কথা ভাবছেন তিনি। আর তাঁর বিপরীত মেরুর মাথায় বসে জেলবন্দি লালু গোকুলে বাড়ছেন প্রতি দিন। তাঁর প্রদর্শিত পথেই এখন সারা দেশের বিরোধী জোট গড়ে উঠছে। গড়ে উঠছে অন্য মেরুকরণ, যাতে ধর্ম নেই, আছে বর্ণ। বর্ণ দিয়েই রাজনীতিতে ধর্মের জোয়ার রোখার বর্ণপরিচয়।

বিহারের জোটটা দৃষ্টান্ত হয়েই ছিল। সেই সঙ্গে এল কর্নাটক। তাৎক্ষণিক লাভের আশায় রাহুলের কৌলীন্য ছেড়ে কৃষকপুত্র কুমারস্বামীর দিকে হাত বাড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাকে লুফে নিয়েছে বিরোধীরা সবাই। কুমারের সঙ্গে মায়াবতীর জোট থাকায় এবং বাবা দেবগৌড়ার সঙ্গে ইয়েচুরি ও চন্দ্রবাবুর পুরোনো সখ্যের সুবাদে বেঙ্গালুরুর মঞ্চে জাতীয় জোটের চেহারা দেখা গেল। ’৯৭-তে অবিভক্ত জনতা দলের সভাপতি লালুকে সংগঠন ও রাজনৈতিক আখড়ায় হারাতে না পেরে সেই দলেরই প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়া চারা ঘোটালার মামলায় জড়িয়েছিলেন, তাঁর কাছেই জোটের পাঠ নিলেন ২০১৮-য়। এবং সে দিন মধ্যরাতে সিবিআই দফতরে বসে বিহারের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী লালুকে জেলে পোরার ব্যবস্থা করেছিলেন যে যোগীন্দর সিং তিনি প্রথমত ছিলেন দেবগৌড়ার প্রিয় কর্নাটক ক্যাডারের অফিসার। সিবিআই ডিরেক্টর হওয়া দেবগৌড়ারই আশীর্বাদে। এখানেই শেষ নয়। সেই যোগীন্দর সিং আবার অবসর নেওয়ার পর যোগ দিয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসে। তা ছাড়া যোগীন্দর পর্বে সিবিআইয়ের যুগ্ম অধিকর্তা উপেন বিশ্বাসই ছিলেন সেনার সাহায্যে লালুকে পটনায় গ্রেফতারের নায়ক। সে দিনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন সিপিআই নেতা ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত। আর উপেনের বীরত্বগাথা ছিল সিপিএমের মুখে মুখে।

সপ্তরথী পরিবৃত লালু ব্যক্তিগত ভাবে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরেও তাঁর দল সরকারে ছিল বেশ কিছু দিন। কিন্তু তার আগেই গদিচ্যুত হয়েছিলেন দেবগৌড়া। এবং বাংলার জ্যোতি বসু জমানার অত্যন্ত প্রিয় পাত্র উপেন বিশ্বাস অচিরেই যোগীন্দর সিংয়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে লালুপ্রসাদের আদ্যশ্রাদ্ধ করতে করতেই তৃণমূলে যোগ দেন ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় শোভা পান। রাজনীতির অকূলপাথারে পড়ে লালু-বিরোধিতা ছেড়ে সিপিএম-সহ বামেরা ফের কেঁচে গণ্ডূষ করেছে। এবং রাজনীতির রূপান্তরের পর উপেন বিশ্বাসের নেত্রীও এখন বিজেপি-বিরোধী রাজনীতির ও জোটের মহানায়ক লালুর পাশে।

তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন দেবগৌড়া জাতীয় রাজনীতির ছক কষেই কর্নাটকের মঞ্চে এমন এমন নেতাকে হাজির করলেন, যাঁদের সঙ্গে কর্নাটকের কোনো সংযোগই নেই। এই দিকটিতে আলোকপাত করতে ভোলেননি বিজেপির গণিতজ্ঞ সভাপতি অমিত শাহ। তিনি বলেছেন, মমতা কী করবেন কর্নাটকে, কিংবা রাহুল কী করবেন বাংলায়? কিন্তু এ তো কথার কথা। আসল অঙ্কটা তিনি কষে ফেলেছেন মনে মনে। সেটা ২০১৯-এর অঙ্ক। চলতি নাটকের শেষ অঙ্কও উনিশেই। লোকসভা ভোট। বেঙ্গালুরুর মঞ্চে হাজির রাহুল, অখিলেশ, দেবগৌড়া, মায়াবতী, চন্দ্রবাবু, ইয়েচুরি, অজিত (সিং) এবং মমতা যে মহাজোটের খসড়া তৈরি করে দিলেন তা নিঃসন্দেহে অন্য মেরুকরণের। বাংলা ছাড়া কার্যত সারা দেশেই অনগ্রসর-দলিত-সংখ্যালঘু এবং কিছু উচ্চ বর্ণের জোটের এই ট্রেলার নিঃসন্দেহে ধর্মীয় মেরুকরণের বিরুদ্ধে বিশল্যকরণী। এই অমোঘ দাওয়াই থেকে বাঁচতেই অমিত শাহর এই উপরোক্ত ক্ষেপণাস্ত্রটি। ওই অস্ত্র কত দূর কাজে লাগবে তা বলবে জোটের নেতাদের দূরদৃষ্টি। তবে এমন একটি মহাজোট নির্বাচন পূর্ববর্তী জোট হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করবে না। এর কারণ হয়ে জেগে আছে অন্তত তেলঙ্গানা, ওড়িশা আর বাংলা। এই তিন রাজ্যের শাসকরা অন্য দলকে কি একটাও আসন ছাড়বেন? এ কথা বুঝিয়ে দিয়েই কে চন্দ্রশেখর রাও ও নবীন পট্টনায়েক বেঙ্গালুরুর মঞ্চ বর্জন করেছেন। আর মমতা মঞ্চে উঠলেও প্রশ্ন জাগে বাংলায় কংগ্রেসকে ক’টা আসন ছাড়বেন? এবং তিনি আর সিপিএম একে অপরকে ছুঁয়ে ফেললে কত বার স্নান করবেন?

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here