আয়কর: জমা দেওয়ার সময়সীমা এবং কর বাঁচানোর আইনি পথ

0
339

suman-basuসুমন বসু

(আয়কর বিশেষজ্ঞ)

মার্চ। আয়করদাতাদের কাছে বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাসটা এখন চলছে। উপার্জিত অর্থের কতটা কর দিতে হবে এবং কোথায় কতটা বিনিয়োগ করলে কর ছাড় মিলবে, আয়করদাতাদের এমন নানা চিন্তা দূর করার দায়িত্ব মূলত আয়কর বিশেষজ্ঞদেরই। সেই ব্যাপারে আপনাদের কিছু পরামর্শ দিতেই এই লেখা।

তবে মনে রাখবেন, আয়কর বিশেষজ্ঞদের সাহায্য না নিয়েও কিন্তু আপনি নিজের আয়কর রিটার্ন নিজেই দাখিল করতে পারেন। বিষয়টি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা এবং আত্মবিশ্বাস থাকলেই তা সম্ভব। অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হলে, আপনাকে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে https://incometaxindiaefiling.gov.in  ওয়েবসাইটে। 

এবার ঢুকে পড়া যাক মূল আলোচনায়:

অগ্রিম কর

২০১৬-১৭ অর্থবর্ষে যারা অগ্রিম কর দিচ্ছেন, তাঁদের শেষ কিস্তি দেওয়ার তারিখ ১৫ মার্চ। করের পরিমাণ ১০ হাজারের বেশি হলে অগ্রিম কর দেওয়া বাধ্যতামূলক। যদি অগ্রিম কর না দেন, তাহলে কিন্তু আয়কর রিটার্ন দেওয়ার সময়, আপনাকে সুদ সমেত আয়কর জমা দিতে হবে। যে সব প্রবীণ নাগরিক বেতন বা পেনসনভোগী কিংবা জমা টাকার সুদের ওপর জীবিকা নির্বাহ করেন, তাঁদের অগ্রিম কর দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। 

মার্চ মাসের মধ্যে যা যা করতে হবে

যে কোনো অর্থবর্ষের আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হয় সাধারণত পরবর্তী দু’টি অর্থবর্ষের মধ্যে। ২০১৪-১৫ অর্থবর্ষে যারা আয়করের আওতায় পড়েছেন এবং এখনও রিটার্ন দাখিল করেননি, তাঁরা অবশ্যই ৩১ মার্চের মধ্যে আয়কর রিটার্ন ফাইল করুন। নইলে সাধারণ নিয়মে আর করতে পারবেন না।

২০১৫-১৬ অর্থবর্ষে যারা আয়করের আওতায় পড়েছেন, তাঁরা ২০১৮ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে আয়কর রিটার্ন দিতে পারেন। কিন্তু চলতি বছরের ৩১ মার্চের মধ্যে যদি রিটার্ন দাখিল না করেন, তাহলে ২৭১(এফ) ধারায় পেনাল্টি ধার্য হতে পারে।

আয়কর আইনে এমন বেশ কিছু বিনিয়োগের সুযোগ আছে, যেগুলির মাধ্যমে আয়করে ছাড় মেলে। ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষে যারা আয়করের আওতায় থাকছেন, তাঁরা যদি আয়করে ছাড় পেতে চান, তাহলে যাবতীয় বিনিয়োগ ৩১ মার্চের মধ্যে করে ফেলতে হবে।

যে সব বিনিয়োগে আয়করে ছাড় মেলে

আগেই বললাম, আয়কর আইনে নানা ধরনের বিনিয়োগ আছে, যেগুলি করলে আয়করে ছাড় মেলে। মনে রাখতে হবে, মোট আয় থেকে এই সব বিনিয়োগগুলি বাদ দিয়ে যে আয় দাঁড়াবে, আয়কর নির্ধারিত হবে তার ওপর।

আসুন এবার দেখে নিই কোন কোন ধারায়, কোন কোন খাতে বিনিয়োগ করলে আয়কর বাঁচানো যাবে:

৮০ সি ধারা

এই ধারায় বিনিয়োগ করলে সর্বোচ্চ দেড় লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ওপর ছাড় মিলবে। কোন কোন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা যাবে দেখে নিন এক নজরে:

  • জিপিএফ
  • পিপিএফ
  • এনএসসি
  • ব্যাঙ্ক বা পোস্ট অফিসে ৫ বছরের ট্যাক্স সেভিংস টার্ম ডিপোজিট
  • কন্যা সন্তান থাকলে সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা
  • জীবন বিমা
  • মিউচুয়াল ফান্ড (যেগুলি ইকুইটি লিঙ্কড সেভিংস স্কিমের অন্তর্ভূক্ত)
  • সিনিয়র সিটিজেনস সেভিংস স্কিম
  • গৃহঋণ শোধের আসল অংশটুকু
  • বাচ্চাদের স্কুলের টিউশন ফি (সর্বাধিক দু’টি সন্তান) ইত্যাদি

বাড়তি আরও ৫০হাজার টাকা বিনিয়োগের ওপর ছাড় পেতে হলে, টাকা রাখতে হবে ন্যাশনাল পেনশন স্কিমে

৮০ডি ধারা

এই ধারায় ছাড় পেতে হলে বিনিয়োগ করতে হবে স্বাস্থ্য বিমায়। ব্যক্তিগত কিংবা স্ত্রী/স্বামী ও নির্ভরশীল সন্তানের একসঙ্গে স্বাস্থ্য বিমা করলে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর কর ছাড় মিলতে পারে।

সঙ্গে যদি বাবা-মায়ের জন্যও স্বাস্থ্য বিমা করান, তাহলে এর সঙ্গে যুক্ত হবে আরও ২৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকার ওপর কর ছাড় পাবেন।

বাবা-মা যদি প্রবীণ নাগরিক হন, তাহলে ওই ২৫ হাজার টাকাটা বেড়ে হয়ে যাবে ৩০ হাজার। অর্থাৎ আপনি কর ছাড় পাবেন ২৫ যোগ ৩০, মোট সর্বোচ্চ ৫৫হাজার টাকার ওপর।

আর আপনি যদি নিজেই প্রবীণ নাগরিক হন, তাহলে নিজের বা নিজের পরিবারের স্বাস্থ্য বিমা করে আপনি ৩০ হাজার টাকার ওপর কর ছাড় পাবেন। যদি আপনার বাবা-মা জীবিত থাকেন এবং আপনি তাঁদের স্বাস্থ্য বিমা করিয়ে থাকেন, তাহলে কর ছাড়ের পরিমাণ হবে ৩০ যোগ ৩০, মোট সর্বোচ্চ ৬০ হাজার টাকার ওপর।

৮০জি ধারা

এই ধারায় কর ছাড়ের সুযোগ রয়েছে অনুদানের ওপর। বিভিন্ন সরকারি তহবিল বা অসরকারি সংগঠনে অনুদানের ওপর এই কর ছাড় মেলে। তবে যত টাকা অনুদান দেবেন, সবটাই হিসেবে ধরা হবে না। মোট আয়ের ১০% পর্যন্ত এই ধারায় কর ছাড়ের সুযোগ মিলবে। অর্থাৎ কেউ যদি ৫০ হাজার টাকা অনুদান দেন এবং তাঁর মোট আয় যদি ৩ লক্ষ টাকা হয়, সেক্ষেত্রে তিনি সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকার ওপর আয়কর ছাড়ের সুবিধা পেতে পারেন। 

এই বিষয়ে আর একটা কথা জানিয়ে রাখা ভাল, কোন তহবিলে অনুদান দিচ্ছেন, সেই অনুযায়ী কোথাও ১০০% কোথাও ৫০% পর্যন্ত অনুদানের ওপরে আয়কর ছাড়ের সুবিধা মিলবে। 

৮০টিটিএ ধারা

এই ধারায় শুধুমাত্র সেভিংস অ্যাকাউন্টের সুদ বাবদ সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর আয়কর ছাড় মেলে।

২৪বি ধারা

গৃহঋণ শোধের ক্ষেত্রে আপনি যে পরিমাণ সুদ পরিশোধ করেছেন, সেই অর্থের সর্বোচ্চ ২ লক্ষ টাকার ওপর আয়করে ছাড় মিলবে।

৮৭এ ধারা 

যাদের করযোগ্য আয় ৫ লক্ষের মধ্যে, তাঁরা আয়করের ওপর সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিশেষ ছাড় পেতে পারেন।

সাধারণত অধিকাংশ বিনিয়োগকারী যে সব ধারাতে বিনিয়োগ করে কর ছাড়ের সুবিধা নেন, আমি সেই সব পরিচিত ধারাগুলি নিয়েই আলোচনা করলাম।

তবে আর কি। জেনে ফেললেন তো সব। হাতে সময় আর বেশি নেই। চটপট সেরে ফেলুন বিনিয়োগ। 

 

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here