how-we-really-are-just-think
chiranjib paul
চিরঞ্জীব পাল

পাঠক মি: ইন্ডিয়া দেখেছেন নিশ্চয়ই। নিশ্চয়ই দেখেছেন। টিভিতে তো বহুবার দিয়েছে। হাতে পরা একটি ঘড়ির মতো একটি যন্ত্রের বোতাম টিপলে সে উধাও হয়ে যায়। কেউ তাকে দেখতে পায় না। উধাও হয়ে সে শিক্ষা দেয় চালে কাঁকর মেশানো আড়তদারকে, নকল ওষুধের ব্যবসায়ীকে।

ভাবছেন হঠাৎ মিস্টার ইন্ডিয়ার কথা বলছি কেন? মিস্টার ইন্ডিয়ার ওই বোতাম টিপে উধাও হয়ে যাওয়ার বিষয়টাকেই ধরতে চাইছি। আপনি একজনকে দেখতে পাচ্ছেন না অথচ সে তার ইচ্ছেমতো কাজগুলো করে চলেছে। দেশ জুড়ে যে অঘোষিত জরুরি অবস্থা চলছে সেটা কতকটা ওই মিস্টার ইন্ডিয়ার মতো। আপনি দেখতে পাচ্ছেন না অথচ সে তার কাজ করে যাচ্ছে।

আপনি বলবেন কোথায় জরুরি অবস্থা চলছে। দিব্বি তো আছি। ঘাড়ের উপর পুলিশ মিলিটারির নিঃশ্বাস তো পড়ছে না। ভ্রূ কুঁচকে একটু ভেবে দেখুন।

এই যে শুক্রবার কাকভোরে সাংবাদিক বিনোদ ভার্মাকে গ্রেফতার করল ছত্তীসগঢ় সরকার। সেটা কি জরুরি অবস্থার বার্তা দিচ্ছে না?  মন্ত্রীর যৌন কেলেঙ্কারির থেকে বড়ো হয়ে দাঁড়াল সাংবাদিক কেন সেই কেলেঙ্কারির সিডি কাছে রেখেছিলেন! নাকি কারণ অন্য? তিনি কংগ্রেসের সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারের দায়িত্বে ছিলেন বলে? নাকি ছত্তীসগঢ়ে কেন সাংবাদিকরা কাজ করতে পারছেন না, এডিটরস গিল্ডের পক্ষ থেকে তা খতিয়ে দেখতে গিয়েছিলেন বলে? চোখ বুঁজলেই উত্তরটা পেয়ে যাবেন।

ওই যৌন কেলেঙ্কারির সিডি নাকি ভুয়ো। তা প্রমাণ করতে পূর্তমন্ত্রী রাজেশ মুনত যে কোনো সংস্থাকে দিয়ে তদন্তও চেয়েছেন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে। খুব ভালো। তা হলে বিনোদ ভার্মাকে গ্রেফতার করালেন কেন? ধরে নিলাম বিনোদ ভার্মা আপনাকে ভয় দেখিয়ে টাকা চাইছিলেন। প্রথম কথা আপনি যদি জড়িতই না হন তবে ভয় পেলেন কেন? ছত্তীসগঢ়ের রাজ্য কংগ্রেস সভাপতি ভুপেশ বাঘেল হিন্দুস্থান টাইমসের কাছে দাবি করেছেন, ওই যৌন কেলেঙ্কারির ক্লিপটি অনেক আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ পেয়েছে। তা হলে ভার্মা আর নতুন করে ওই ক্লিক প্রকাশ করে দেওয়ার ভয় দেখাবেন কী করে? সব ধোঁয়াশা।

তা ছাড়া কোনো সাংবাদিক কোনো রাজনৈতিক দলের মিডিয়া সেলের দায়িত্ব নিতেই পারেন। সেটা ভালোবেসে হোক বা পেশাদার হিসাবে। এতে তো কারও কিছু বলার নেই। সব রাজনৈতিক দলেরই থাকে।

আসলে একটু তলিয়ে ভাবলে বুঝতে পারবেন অঘোষিত জরুরি অবস্থা চলছে। জরুরি অবস্থা জারি করে প্রকাশ্যে এ সব কাজ করাটা চাপের, তাই এ ভাবে মিস্টার ইন্ডিয়ার মতো আড়ালে থেকে কণ্ঠরোধ করার প্রক্রিয়া জারি রয়েছে। সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশ খুন থেকে দিল্লিতে একাধিক ওয়েব সাংবাদিককে খুনের হুমকি, সবই এই প্রক্রিয়ার অঙ্গ।

অর্থাৎ কোনো সরকার জরুরি অবস্থা জারি করলে তাকে চিনতে পারবেন, দুষতে পারবেন। এই ভাবে অঘোষিত জরুরি অবস্থা থাকলে কোনো সরকারকে আপনি নির্দিষ্ট করে চিহ্নিত করতে পারবেন না, অথচ জরুরি অবস্থার রীতি রেওয়াজগুলো চোরাগোপ্তা চলতে থাকছে।

অদ্ভুত ভাবে শত্রুগুলোও পালটে যাচ্ছে। মূল্যবৃদ্ধি প্রধান শত্রু না হয়ে, প্রধান শত্রু হচ্ছে তাজমহল, টিপু সুলতান ইত্যাদি ইত্যাদি।

সোশ্যাল মিডিয়ার উপরও কড়া নজরদারি চলছে। সরকার বা প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিলেই ঘরে পুলিশ এসে কড়া নাড়বে। রাম রাম করতে করতে মরা মরা হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ পরিস্থিতি এমন জায়গা চলে গিয়েছে কেউ কারও সমালোচনা সহ্য করতে পারছে না। তা সরকার হোক বা ব্যক্তি কিংবা অন্য প্রতিষ্ঠান। সমালোচনা করল মানেই মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে ‘এ ব্যাটাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে হবে।’ একেবারে চরম ভাবনা। ঘুরিয়ে আমাদের চরিত্রের মধ্যেই জরুরি অবস্থার লক্ষণগুলি ঢুকে পড়ছে।

অথচ এমনটা তো হওয়ার ছিল না। সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিকাশ হওয়ার কথা ছিল গণতন্ত্রের। আরও মত প্রকাশের অধিকার, আরও শোনার অভ্যেস, এগুলির তো বিকাশ হওয়ার কথা ছিল। তা না হয়ে, কেউ যদি আমায় বলে, আপনার কাপড়ে তো চিটেগুড় লেগে রয়েছে, আমি সেটা পরিষ্কার না করে বা সে যদি মিথ্যে বলে থাকে তা প্রমাণ না করে তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা ঠুকে দেব।

অদ্ভুত ভাবে শত্রুগুলোও পালটে যাচ্ছে। মূল্যবৃদ্ধি প্রধান শত্রু না হয়ে, প্রধান শত্রু হচ্ছে তাজমহল, টিপু সুলতান ইত্যাদি ইত্যাদি। যাদের মূল্যবৃদ্ধি নামক শত্রুকে পায়ের তলায় দাবিয়ে রাখার কথা ছিল তারাই তার অবাধ বিকাশের সুযোগ করে দিয়ে অন্য শত্রু খুঁজে বেড়াচ্ছে। আর ক’দিন পর হয়তো একশো টাকার বাজার একশো গ্রামের ঠোঙায় ধরে যাবে। মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে কেউ জেহাদ ঘোষণা করছেন না।

আরও পড়ুন : সাধারণের টিউবওয়েল বন্ধ, কিন্তু মাটি থেকে জল তুলে ব্যবসা করতে বাধা নেই ব্যবসায়ীদের 

আইটি সেক্টরে ছাঁটাই চলছে। ব্যাঙ্কিং সেক্টরেও কর্মসংকোচন হচ্ছে। এ সব নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। খালি খেয়াল রাখতে হবে সব যেন সাফসুতরো থাকে। গরুরা যেন নিয়মিত ঘাস-বিচুলি পায়। মানুষ তার অসুস্থ বউকে কাঁধে করে নিয়ে গেলেও খেয়াল রাখতে হবে গরুর জন্য যেন অ্যাম্বুলেন্স থাকে।

ওই মিস্টার ইন্ডিয়া ছিলেন সু-মিস্টার ইন্ডিয়া। আর এই অদৃশ্য জরুরি অবস্থা হল কু-মিস্টার ইন্ডিয়া। সু-মিস্টার ইন্ডিয়া চালের আড়তদার,  নকল ওষুধের ব্যবসায়ীদের শাস্তি দিতেন। জানি না ওই পদ্ধতিতে আদৌ সমস্যার সমাধান হতে পারে কিনা। অদৃশ্য সু-মিস্টার ইন্ডিয়াকে দেখা যেত লাল রঙের কাচে। কু-মিস্টার ইন্ডিয়াকে দেখা যাবে কোনো রঙের কাচে? ‘কাল্টিভেট’ করতে হবে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here