যন্ত্র থেকে বেরোনো কাগজ বাক্সে ফেলতে হলে ব্যালট পেপার কী দোষ করল

1

নীলাঞ্জন দত্ত: সবার আগে মায়াবতীই আওয়াজটা তুলেছিলেন। কিন্তু তখন তিনি সদ্য উত্তর প্রদেশের নির্বাচনে করুণ ভাবে হেরেছেন। তাই তাঁর কথা আর কে শোনে। ভোটযন্ত্রে কারচুপির জন্যই নাকি বিজেপি এমন তুমুল ভাবে জিতেছে, এই অভিযোগে তোলার জন্যে বরং তাঁকে নিয়ে মিডিয়ায়, বিশেষ করে ‘জাতীয়’ টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে, ব্যঙ্গবিদ্রুপ কম করা হয়নি। তার পর তাঁর ধুয়ো ধরলেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। তিনিও তখন পঞ্জাবের পরাজিত নায়ক, সুতরাং তাঁর কপালেও সেই বিদ্রুপই জুটল। কিন্তু কী ভাবে জানি অভিযোগটা থেকেই গেল। উত্তর প্রদেশে বিজেপি সরকার পুরোনো হয়ে যাওয়ার পরেও লোকসভা, রাজ্যসভায় তা নিয়ে তুলকালাম হচ্ছে। এর মধ্যে আবার সোনায় সোহাগা হল যখন মধ্যপ্রদেশে এক উপনির্বাচনের আগে ভোটযন্ত্র পরীক্ষা করতে গিয়ে প্রকাশ্যেই দেখা গেল, যে কোনও বোতাম টিপলেই বিজেপির পক্ষে ভোট পড়ে যাচ্ছে! আবার অভিযোগ উঠল ৯ এপ্রিলের উপনির্বাচনগুলিকে কেন্দ্র করে। রাজস্থানের ঢোলপুরে নাকি ভোটযন্ত্র গড়বড় করেছে।

নির্বাচন কমিশন অবশ্য সব অভিযোগ নস্যাৎ করে দিয়েছে। তার কর্তারা এবং বড়ো বড়ো মন্ত্রীরা বলেছেন, ভারতের ভোটযন্ত্রগুলি একবারে বিশ্বসেরা, তাতে কারচুপি হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। যদি কিছু গণ্ডগোল হয়েও থাকে, তা হয়েছে মানুষেরই ভুলে, যন্ত্রের ত্রুটি বা জালিয়াতির জন্য নয়। উপনির্বাচনের দিনেই কমিশন বিবৃতি দিয়ে বলল, এই মেশিনগুলো যারা বানায় এমনকি তারাও তাতে কোনো ‘কারচুপি’ করতে পারে না!

আজকাল আমরা বিভিন্ন বিষয়েই প্রযুক্তির ওপর শুধু নির্ভরশীল নয়, এতটা আস্থাশীল হয়ে পড়েছি যে, মানুষের থেকে যন্ত্রকেই বেশি বিশ্বাস করতে শিখছি। আর যন্ত্র যে মানুষই তৈরি করে, সুতরাং মানুষ তাকে চালাতেও যেমন পারে, চাইলে বেচাল করতেও পারে, এই কথাটাই ভুলে যাচ্ছি। আমাদের মতো দেশে, যেখানে ‘আধুনিক’ প্রযুক্তি একটু দেরি করে এসেছে, সেখানে এই প্রযুক্তি সম্পর্কে মুগ্ধতাও অনেক বেশি। তাবিজ-কবচের মতোই আমরা যন্ত্রেরও জাদুকরি ক্ষমতায় বিশ্বাস করি। এক উঠতি জ্যোতিষী বলছিলেন, একটা ল্যাপটপ কিনতে না পারলে তাঁর তেমন পসার জমছে না, কারণ হাতে ছকবিচার করার থেকে আজকাল কম্পিউটারে ছকবিচার করারই কদর বেশি। আবার দেখবেন, টাকাপয়সা হওয়ার বা পরীক্ষায় ভালো ফল করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যে ‘অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন’ উপকরণগুলি ঘরে রাখতে উপদেশ দেওয়া হচ্ছে, সেগুলিকেও ‘অমুক যন্ত্র’, ‘তমুক যন্ত্র’ বলা হয়।

যন্ত্রের ওপর এই রকম জাদুবিশ্বাস সবার নেই। তাই সারা পৃথিবীতেই ভোটযন্ত্র নিয়েও নানান প্রশ্ন উঠেই থাকে। যেমন কিছু দিন আগেই আমেরিকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অভিযোগ উঠেছিল, রাশিয়ান হ্যাকাররা ভোটযন্ত্রগুলো হ্যাক করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে বেশি ভোট টেনে এনেছে। এখনও এই সন্দেহের নিরসন হয়নি।

এ দেশেও ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম-এর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে যথেষ্ট সিরিয়াস কাজ হয়েছে। https://www.indianevm.com/ ওয়েবসাইটটা এক বার দেখুন, অবাক হয়ে যাবেন। ‘সিটিজেনস ফর ভেরিফায়েবিলিটি, ট্রান্সপারেনসি অ্যাকাউন্টেবিলিটি ইন ইলেকশনস’ (ভেটা) নামে একটা সংগঠন এই বিষয়ে সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ করছে। দেশ-বিদেশের বহু বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ, কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রমুখের সঙ্গেও তারা যোগাযোগ রেখে চলে এবং নতুন নতুন গবেষণা, ঘটনা ও বিতর্কের কথা তুলে ধরে।

ভেটার সভাপতি জিভিএল নরসিংহ রাও, যিনি বর্তমানে ভারতীয় জনতা পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির মুখপাত্র এবং সুপরিচিত নির্বাচন বিশ্লেষক। ২০১০ সালে বিজেপির জাতীয় কর্মসমিতির সদস্য থাকাকালীনই তিনি ভোটযন্ত্র নিয়ে আস্ত একটি বই লিখে ফেলেন। বইটির শিরোনামেই তার বক্তব্য পরিষ্কার – ‘ডেমোক্র্যাসি অ্যাট রিস্ক! ক্যান উই ট্রাস্ট আওয়ার ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনস? (বিপন্ন গণতন্ত্র! বৈদ্যুতিন ভোটযন্ত্র কি বিশ্বাসযোগ্য?)’ পরিশ্রমসাধ্য গবেষণায় লেখক এই বইতে অজস্র তথ্য জোগাড় করে যুক্তিনিষ্ঠ তর্ক তুলেছেন ভোট মেশিনের নৈতিকতা, সাংবিধানিকতা, সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যারের নিরাপত্তা, ইত্যাদি, খুঁটিনাটি অনেক বিষয়ে। সারসংক্ষেপ করার কোনো মানে হয় না। আগ্রহীদের পুরো বইটাই পড়ে ফেলা উচিত। এখানে শুধু শেষের দিকের একটি অনুচ্ছেদ অনুবাদ করে দিচ্ছি।

ভারত হল এক সজীব গণতন্ত্র যেখানে একটি নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা, স্বাধীন ও নির্ভিক সংবাদমাধ্যম এবং সরব নাগরিক সমাজ রয়েছে, যা যে কোনো বিষয়ে জনস্বার্থের পক্ষে দ্রুত দাঁড়িয়ে যায়। ইভিএম আর নির্বাচন সংস্কারের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি যদি এখনও পর্যন্ত যথেষ্ট গুরুত্ব না পেয়ে থাকে, তবে তা হয়েছে মূলত জনমনে প্রযুক্তি সম্পর্কে একটা রহস্যের বাতাবরণ তৈরি হওয়া এবং প্রাসঙ্গিক সমস্ত তথ্য জনগণের ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখতে নির্বাচন কমিশনের দৃঢ় প্রতিজ্ঞার জন্য। (পৃঃ ১৯৪)

একটু আগে আমরা ঠিক এই কথাটাই বললাম না? জিভিএল-এর বইয়ের মুখবন্ধ লিখেছেন লালকৃষ্ণ আডবাণী। তাতে তিনি বলেছেন:

আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি এটা তাৎপর্যপূর্ণ যে জার্মানি, যা প্রযুক্তির দিক থেকে পৃথিবীর সব চেয়ে এগিয়ে থাকা দেশগুলির মধ্যে অন্যতম, ইভিএম সম্পর্কে এতই সতর্ক হয়ে পড়েছে যে তার ব্যবহার একেবারে নিষিদ্ধই করে দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহু রাজ্য নিয়ম করে দিয়েছে যে কাগজেও ছাপ পড়বে এমন ব্যবস্থা থাকলে তবেই ইভিএম ব্যবহার করা যেতে পারে। (পৃঃ ১১)

এই ব্যবস্থাটাকে বলে ‘ভোটার ভেরিফায়েড পেপার অডিট ট্রেইল’ বা ভিভিপ্যাট। আমাদের দেশেও সুপ্রিম কোর্ট এক বার ২০১৩-য়, আর এক বার ২০১৭-র জানুয়ারি মাসে ‘নির্বাচনে ১০০ শতাংশ স্বচ্ছতা আনার জন্য’ ভিভিপ্যাট চালু করার নির্দেশ দিয়েছে। চার বছর ধরে কমিশন বলে এসেছে, ‘ধাপে ধাপে’ এই ব্যবস্থা চালু করা হবে। এখনও খুব কম জায়গাতেই এমন মেশিনের দেখা মেলে। আবার এ রকম একটি যন্ত্র নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে মধ্যপ্রদেশে।

সে কথা ছেড়ে দিয়ে এই ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হলে কী হবে সেটাই বরং দেখা যাক। বোতাম টিপেই ভোট হচ্ছে, কিন্তু বোতাম টিপলে আসলে কোথায় ভোট পড়ছে তা যে হেতু ভোটার জানতে পারছেন না, তাই তার সঙ্গে একটা কাগজও বেরোচ্ছে। তাতে ভোটদাতা দেখে নিতে পারছেন তিনি যে প্রার্থীকে ভোট দিতে চেয়েছেন, তাঁর চিহ্নেই ছাপ পড়েছে কি না। সেই কাগজটা ভাঁজ করে ফেলেও দিচ্ছেন একটা ব্যালটবাক্সে, যাতে পরে দরকার হলে যন্ত্রে গোনা ভোটের সংখ্যার সঙ্গে কাগজের ছাপের সংখ্যা মিলিয়ে নেওয়া যায়। তা হলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? হাতে করে রাবার স্ট্যাম্পে কালি মাখিয়ে ব্যালট পেপারের ওপর ‘এই চিহ্নে ছাপ দিন’ করার বদলে যন্ত্রের বোতাম টিপে সেই কাগজে ছাপ ফেলা? ব্যস, স্বচ্ছতা এসে গেল?

এমন যুক্তি মেনে না নিয়ে কেউ যদি বলেন, তা হলে এত যন্ত্রের ভনিতা না করে সাধাসিধে ব্যালট পেপারটাকেই আবার ফিরিয়ে আনা হোক না কেন, তাঁর কথা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় কি? তাতে ভোটারদের ওপর চাপ তো যা রয়েছে তাই থাকবে, শুধু যন্ত্রের মায়ায় ‘স্বচ্ছতার’ রহস্যময় আবরণটা তৈরি হবে না।

1 মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here