গালিব ইসলাম:

শিশুর হাতে অস্ত্র — এ কোন বাংলার মুখ? ভয় ও ঘৃণার বাংলার?

সশস্ত্র শিশু!

এ কোন দেশ, এ কোন ভারত, এ কোন বাংলা? বিখ্যাত এক ধর্মপুরুষের জন্মদিনে শিশুর হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হল কেন? আইএস ইসলামি জঙ্গিরা শিশুদের হাতে কালাশনিকভ তুলে দিচ্ছে। সেটা বিদেশে। আর রামনবমীর দিন দেখা গেল বাংলার দুগ্ধপোষ্যদের হাতে নাঙ্গা তলোয়ার!

আরও দেখা গেছে। স্কুল-ইউনিফর্ম পরা ছাত্রীরা মিছিল করছে খাপখোলা তলোয়ার হাতে!

এ কোন বাংলা, এ কোন কলকাতা?

রামমাহাত্ম্য তো অস্ত্রমাহাত্যে পরিণত হচ্ছে! এ রাজ্যের বিজেপি নামক রাজনৈতিক দলের যিনি প্রধান ব্যক্তি তিনিও খাপমুক্ত ধারালো তরবারি, মাথায় গেরুয়া পাগড়ি, মিছিলে হাঁটছেন, বিবৃতি দিচ্ছেন! হয়তো এটা প্রতীকী। তবু তো প্রশ্ন তো জাগেই। রামনাম জপের বদলে বাংলা প্রত্যক্ষ করল এক সশস্ত্র, উদগ্র ঘৃণার বাংলা!

মড়ার মাথার খুলি নিয়ে আনন্দমার্গীরা একটা সময় কলকাতা দাপিয়েছে। অস্ত্রও ছিল। কিন্তু শিশু ছিল না। স্কুলপড়ুয়া বালিকার হাতে নাঙ্গা তলোয়ার ছিল না! কোনো ধ্বনির হুঙ্কার ছিল না!

কিন্তু রামনবমীর দিন যা হল তা নিয়ে জনগণের মনে কি প্রশ্ন আছে? না, তা আছে বলে মনে করেন না অনেকের মতো বিশিষ্ট চিন্তাবিদ শোভনলাল দত্তগুপ্ত। তাঁর উদ্বেগ, “জনগণের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে”। তাঁর প্রশ্ন : “এ রাজ্যে কি আরএসএস ক্রমেই মান্যতা পাচ্ছে?” ইতিহাসের শিক্ষক হরবংশ মুখিয়া এটাকে বামপন্থী ব্যর্থতা বলেই মনে করেন। এটা কি ঠিক, এ রাজ্যের কথা ধরলে দীর্ঘ সময় ধরে শাসনপর্ব চালিয়েও কোনো ভাবে চিন্তাকে প্রভাবিত করতেই পারেনি বামেরা?

ধর্মীয় শোভাযাত্রায় অস্ত্র প্রদর্শন কেন? মহরমের তাজিয়ার কথা উঠতে পারে। এ দিনও শোকজ্ঞাপন সশস্ত্রই হয়ে থাকে, যদিও এ শোক আত্মঘাতমূলক, স্বমুখী। ক্রোধের বদলে শোকের, বিলাপের আত্মসুর মহরমের মিছিল বাজলেও তবু নাঙ্গা তলোয়ার, শিকল, তাজা রক্ত প্রকাশ্যে ভীতি বা ফোবিয়াই তৈরি করে। একমাত্রিক সমাজ নয় এ দেশ। সুতরাং মহরমের মর্শিয়া প্রদর্শনও শেষমেশ ভীতির কারণও হয়ে ওঠে। একই ভাবে পঞ্জাবিদের ধর্মীয় মিছিলেও অস্ত্র রাখার ট্র্যাডিশন আছে। এ সব প্রথা ঐতিহ্যগত হলেও, কয়েক বছর ধরেই ধর্মীয় শোভাযাত্রায় অস্ত্রবহনের বিরুদ্ধে আপত্তি, সমালোচনা উঠছে।

একটা সময় মহরম উৎসব ছিল শাসক ইসলামের উৎসব। সেখানে শোকের আবহে অস্ত্রের আবির্ভাব ঘটেছিল শাসক ইসলামের কৌলিন্য জাহিরের পরিণতিতে। হাসান-হেসেনের করুণ মৃত্যুর ঘটনা শোকের কারণ হতে পারে, কিন্তু তার সঙ্গে অস্ত্র কি ভক্তিরসের আবাহন হতে পারে?

এ প্রশ্ন তো রাম জন্মোৎসবে অস্ত্র প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও সমান আসতে পারে। রাম তো আবহমান। এ দেশেই উত্তরপ্রদেশে গোরক্ষনাথের মুসলমান শিষ্য কোরআন এবং রামায়ণ একই শ্রদ্ধায় পাঠ করে থাকেন। রাম মহাকাব্যের নায়ক কিংবা মহাপুরুষ। কিন্তু তাঁর জন্ম-শোভাযাত্রায় নাঙ্গা ধারালো কোশমুক্ত অসির ঝনঝনা কেন?  এই আস্ফালনের উদ্দেশ্যই বা কী? স্বাভাবিক ভাবে উঠছে এই প্রশ্ন।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here