jerusalem
তপন মল্লিক চৌধুরী

জেরুজালেম নিয়ে পশ্চিম এশিয়া উত্তপ্ত হয়ে উঠছে প্রায় প্রতি দিনই। ইতিমধ্যে তুরস্কের ইস্তানবুলে ৫৭টি মুসলমান-প্রধান দেশের প্রধানরা জড়ো হন। প্যালেস্টাইনকে রাষ্ট্র ও পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য তাঁরা সারা বিশ্বের কাছে জোরদার দাবি তুলেছেন। এক দিকে ট্রাম্পের ঘোষণাকে তাঁরা যেমন অবৈধ বলেছেন, অন্য দিকে ওই অবৈধ ঘোষণাকে তাঁরা প্যালেস্টাইনের জনতার অধিকারের উপর আঘাত বলে মনে করছেন । কেবল তাই নয় এর ফলে পশ্চিম এশিয়ায় শান্তিপ্রক্রিয়া বিঘ্নিত হল বলে তাঁরা মনে করেন। তাঁদের হুঁশিয়ারির ফলে নতুন করে দুনিয়াব্যাপী সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দিলে তার দায় নিতে হবে আমেরিকাকেই। এই সব ঘোষণা যে মার্কিন সরকারকে চাপে ফেলার জন্য, সে ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ থাকে না। কিন্তু জেরুজালেম ঘিরে হিংসা ক্রমশই বাড়ছে।

জেরুজালেম ছিনিয়ে নেওয়ার ইতিহাস

জেরুজালেম নিয়ে সংঘাতের ইতিহাস আজকের নয় প্রায় হাজার বছরের তো বটেই। অন্তত তিনটি ধর্মের পবিত্রভূমি হিসাবে জেরুজালেম শাসকদের কাছে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ। ১০১৯ সালের ক্রুসেডে খ্রিস্টানরা জেরুজালেম দখল করে। দখল-বেদখলের সেই ইতিহাস ছিল যেমন লম্বা তেমনই রক্তক্ষয়ী। এর পর ১১৮৭ সালে প্রাচীন ইজিপ্ট-সিরিয়ার শাসক সালাদিন আইয়ুবি দখল করে নেন জেরুজালেম। মুসলমান শাসক সগৌরবেই জেরুজালেম শাসন করেন। কিন্তু এর পরও যুদ্ধ, বিদ্রোহতে জেরুজালেমের শাসনভার পালটেছে একাধিকবার। বদলেছে জেরুজালেমের ভাগ্য।

১৯ শতকে ইউরোপের অধিকার পেতে শুরু করে ইহুদিরা। বলা যেতে পারে তখন থেকেই মুসলমানদের দখলে থাকা জেরুজালেম হাতছাড়া হওয়ার গল্পের শুরু। ১৯০২ সালের মাঝামাঝি সময় প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার ইহুদির ঠিকানা হয় প্যালেস্টাইন। এর পরও পালাক্রমে কয়েক লাখ ইহুদি শরণার্থী আশ্রয় নেয় এই অঞ্চলে, যেটি এখন ইজরায়েল নামে পরিচিত। ১৯৪৮ সালে ইজরায়েল তাদের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এর পর থেকে আবার নতুন করে হিংসা-যুদ্ধ-বিগ্রহের ইতিহাসের শুরু। বিশেষ করে ১৯৪৮ সালের পরবর্তীতে ’৬৮ সালে অস্ত্রের জোরেই প্যালেস্টাইন-সহ জেরুজালেম দখল করে ইজরায়েল। প্রসঙ্গত বলা দরকার, ১৯৪৮ সালে ইজরায়েল-আরব যুদ্ধের পর জেরুজালেম জর্ডনের নিয়ন্ত্রণে আসে। উচ্ছেদ করা হয় সেখানে বসবাসকারী ইহুদি পরিবারগুলিকে। ১৯৬৭ সালে ছ’ দিনের নাটকীয় যুদ্ধের পর আবার অনেক কিছুই বদলে যায়। ছ’দিনের সেই যুদ্ধে নাটকীয় ভাবে ইজরায়েল শুধু আরব দেশগুলিকেই পরাজিত করেনি, তারা মিশরের কাছ থেকে গাজা তীর ও সিনাই উপত্যকাও দখল করে নেয়। ওই যুদ্ধের প্রভাব যে সূদুরপ্রসারী হয়েছিল সে কথা বলাই যায়, কারণ ওই একই সময়ে জর্ডনের কাছ থেকে ইজরায়েল দখল করে নেয় পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম। অর্থাৎ ওই সময়ে ইজরায়েল জেরুজালেমের বাকি অংশসহ পুরোনো শহর দখল করে নেয় এবং পশ্চিম অংশের সঙ্গে একত্রিত করে গোটা এলাকাটাকেই ইজরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করে ফেলে।

ইজরায়েলি টানাপড়েন

দেখা যাচ্ছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই ইহুদি শরণার্থীদের আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে জর্ডন সংলগ্ন এলাকা। আর ১৯৪৮ সালে নিজেদের স্বাধীনতা দাবি করে তারা আশপাশের এলাকাগুলি দখল করতে শুরু করে। পাশাপাশি ইজরায়েল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ জেরুজালেমও মুসলমানদের কাছ থেকে দখল করে নেয়। জেরুজালেম-দখলদারির এই বিরোধই ইজরায়েলি-প্যালেস্টাইন সংকটের কেন্দ্রবিন্দু। তার পর থেকে দশকের পর দশক ধরে এই অঞ্চলে চলছে সংঘর্ষ আর ইজরায়েলি আগ্রাসনে লেখা হচ্ছে নিরীহ প্যালেস্তিনীয়দের রক্তপাতের ইতিহাস। প্রসঙ্গত উল্ল্রখ্য, ১৯৪৭ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের যে প্রস্তাবের ভিত্তিতে ঐতিহাসিক প্যালেস্টাইন ভেঙে এক দিকে ইহুদি রাষ্ট্র ইজরাইয়েল ও অন্য দিকে আরব প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত হয়, তাতে জেরুজালেমের জন্য স্বতন্ত্র আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।

israel and gaza strip১৯৬৭ সালের আরব-ইজরায়েল যুদ্ধের পর ইজরায়েল পূর্ব ও পশ্চিম জেরুজালেম দখল করে নেয় এবং একক ভাবে তা নিজের দেশের অন্তর্ভুক্তির কথা জানিয়ে দেয়। কিন্তু ওই অন্তর্ভুক্তি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কেউই প্রায় মেনে নেয় না। ১৯৯৩ সালে ইজরায়েল ও পিএলও স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তিতেও উভয়েই মেনে নেয় যে জেরুজালেম সমস্যাটি আলোচনাসাপেক্ষ। একই সম্মতি মেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ওই বছরেই হোয়াইট হাউস লনে, যখন শান্তিচুক্তিতে ইজরায়েলি নেতা আইজক রবিন এবং প্যালেস্তিনীয় নেতা ইয়াসির আরাফাত স্বাক্ষর করেন। এই পরিপ্রক্ষিতে সব কিছুই প্রায় ভণ্ডুল হতে চলেছে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একতরফা ঘোষণায়।

পবিত্রভূমি জেরুজালেম

জেরুজালেম এখন ইজরায়েলের হাতে থাকলেও তা প্যালেস্টাইনের ঐতিহাসিক শহর। প্রাচীনকাল থেকেই এই শহরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গভীর ধর্মীয় গুরুত্ব। একই সঙ্গে ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিমদের কাছে এই শহর পবিত্রভূমি হিসাবে স্বীকৃতি পেয়ে এসেছে। ধর্মীয় মর্যাদসম্পন্ন জেরুজালেমে রয়েছে পবিত্র রায়াতুল মুকাদ্দাস। ইহুদি ধর্মাবলম্বীরা এই শহরকে টেমপ্লেট মাউন্ট নামেও ডাকেন। জেরুজালেমে রয়েছে মুসলমানদের পবিত্র আল আকসা মসজিদ। মুসলিমদের বহু স্মৃতিবিজড়িত এই মসজিদে রয়েছে বহু নবী ও সাহারার কবর। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের কাছেও জেরুজালেমের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। তাঁদের বিশ্বাস, যিশুখ্রিস্ট বেথলেহেমে জন্মগ্রহণ করেন। বাইবেল অনুসারে বেথলেহেমের অবস্থান জেরুজালেমের দক্ষিণাংশে, জেরুজালেম শহর থেকে আজকের বেথলেহেম মাত্র ন’ কিমি দূরে। স্বভাবতই খ্রিস্টানদের কাছেও জেরুজালেম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া জেরুজালেমে রয়েছে ইহুদিদের পবিত্র ওয়েলিং ওয়াল। সুতরাং ধর্মীয় দিক থেকে জেরুজালেমের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুধাবন করেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শাসক এই শহরকে দখলে রাখার চেষ্টা চালিয়েছেন। ১৯৬৭-এর যুদ্ধের পর প্যালেস্তিনীয়দের শহর কেড়ে নেওয়ার পর থেকেই তারা ওই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এর উপর ট্রাম্পের অবিবেচিত ঘোষণায় পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে আরও জটিল। এ কথা ঠিক যে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির অন্যতম বাধা ইজরায়েল-প্যালেস্টাইন বিরোধ। ওই বিরোধ নিরসনে মিল্লাতে ইব্রাহিম অর্থাৎ ইসলাম-খ্রিস্ট ও ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সমঝোতা খুবই জরুরি। তার জন্য অবশ্য প্যালেস্টাইনে প্যালেস্তিনীয়দের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা হওয়া আবশ্যক। কিন্তু তার বদলে পবিত্র জেরুজালেম নগরীতে ইজরায়েলি আগ্রাসনের বৈধতা দেওয়া হলে পশ্চিম এশিয়া অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠবে।

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here