mohan bhagwat
মোহন ভাগবত। ছবি সৌজন্যে ফার্স্টপোস্ট।
দেবারুণ রায়

২০১৪-য় বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ধীর পদক্ষেপে এখন ভারতীয় রাজনীতির মূল রঙ্গমঞ্চে বিরাজমান আরএসএস। তারা চিরকালই বিজেপির চালিকাশক্তি। তারা বলে থাকে তাদের সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। তারা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। কিন্তু তারা স্বীকার না করলেও বিজেপির রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা, রণনীতি সব কিছুই ছকে দেয় আরএসএস। বিজেপি তাদের রাজনৈতিক শাখা। বিপুলায়তন সংঘ পরিবারের অসংখ্য শাখাপ্রশাখার মাথায় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ। এই সংগঠনের সরসংঘচালক মোহন ভাগবতই পরিবারের সব শাখাপ্রশাখার মতাদর্শ, বিচারধারা থেকে শুরু করে প্রতিটি পদক্ষেপের নিয়ন্তা। ভাগবত এবং তাঁর কয়েক জন সহযোগীই আর পাঁচটা শাখা সংগঠনের মতো বিজেপিরও রোডম্যাপ তৈরি করে দেন। প্রত‍্যেকটি জরুরি সিদ্ধান্ত তাঁদের অনুমোদন সাপেক্ষ। সেই সঙ্গে বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর পদে সংঘ যাঁকে তুলে ধরে তাঁর কথার যথেষ্টই মূল্য দিয়ে থাকে। অবশ্যই তিনি দলকে যত দিন জেতাতে পারেন তত দিনই তাঁর দাম। বাজপেয়ীর অসুস্থতার পর আডবাণীকে প্রধানমন্ত্রীর পদপ্রার্থী করেছিল সংঘ। কিন্তু মোদীকে এগিয়ে দিয়ে দলকে জেতাতে ব‍্যর্থ আডবাণীকে ব্রাত্য করে দেওয়া হয়। এই সঙ্গে সংঘেরই সূত্র অনুযায়ী মোদী বেশি বয়স্কদের মন্ত্রিসভার বাইরে রাখেন। সংঘ কীসে সন্তুষ্ট, তা মোদীর চেয়ে ভালো কেউ বোঝেন না। অতীতে সংঘ যেমন সব চেয়ে বেশি নির্ভরশীল ছিল আডবাণীর ওপর। জিন্নাহর মাজারে মাথা নোয়ানোর আগে পর্যন্ত। ক্রমশ আডবাণী চলে যেতে থাকেন বিস্মৃতির অতলে এবং পাদপ্রদীপের আলোয় আসতে থাকেন মোদী। তাই পরিকল্পনা মাফিকই ১৪ থেকে ১৮-র মধ্যে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় মঞ্চে হাজির আরএসএস

আরও পড়ুন কৈলাসে কেলেঙ্কারি: বিজেপির আন্ডারহ্যান্ড হাঁকালেন রাহুল, বল গেল গুজরাতে/১

এনডিএ জমানার মতোই সংঘের চালক চূড়ান্ত করেন জাতীয় জীবনের অ্যাজেন্ডা। সংঘের যে কোনো কর্মসূচি প্রচারের লক্ষ পাওয়ারের আলো। সোমবার এমনই একটি অনুষ্ঠানে হাজির হন ভাগবত। তিন দিনের পরিচর্চা শিবিরের সূচনা করতে গিয়ে তিনি নিখুঁত অঙ্কের মতো যে বক্তব্য পেশ করেন তাতে ফুটে ওঠে আগামীর উদ্বেগ। বিগত লোকসভা নির্বাচনের যে পটভূমি ছিল তা আমূল বদলে গিয়েছে চার বছর আগেই। তখন ১০ বছরের ক্ষমতাসীন মনমোহন সরকার সম্পর্কে মানুষের মোহমুক্তি হয়েছে আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি আর না‌না দুর্নীতির কারণে। তা ছাড়া দিল্লির পরীক্ষিত নেতাদের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে নতুন মোদীর ‘অচ্ছে দিনে’র স্বপ্নকে সত্যি ভেবেছিলেন দেশবাসী। সঙ্গে ছিল ষাট বছরের সরকারি দল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের কাছে আবেদন, কংগ্রেসমুক্ত ভারত গড়তে হবে‌। কালক্রমে এই স্লোগানের মায়াজাল ভেদ করে বেরিয়েছে মোদীর গত বারের ভোটাররা। এ বার মোদীর প্রতিশ্রুতি পূরণও তার ভোটারদের কাছে পরীক্ষার পালা। কংগ্রেসমুক্ত দেশ গড়ার ঠ‍্যালা বুঝতে পেরেছেন জনগণ। এখন তাই ঈশ্বর ভরসা। অর্থাৎ রামজি‌। সংঘ এ জন্য ‘অচ্ছে দিনে’র ছায়া থেকে মুক্ত হতে চায়। এমন অংক করতে উদ্যোগী হয়েছেন যাঁরা, তাঁদের মূল সূত্র লিখতে বলছেন ভাগবত। না, নেতা যে-ই হোন, জনগণকে শুধু বলতে বলছেন, দূরের কথা ভেবে জাতীয় ঐক্য সর্বোচ্চ জরুরি। তা ছাড়া মৌলিক বিষয়, হিন্দু ধর্মের মধ্যে জাতিভেদ রাখা চলবে না। তা হলে এই ছুতোয় মেরুকরণের তবলা বাঁধা অন্য সুরে। আগে এই ঐক্য নিশ্চিত হোক। ভাগবত পুরো ভাষণে একবারও কোনো সমস্যার কথা তোলেননি। শুধুমাত্র হিন্দু ঐক্য। না হলে উচ্চ-নীচ মেরুকরণ হলে মোদীমন্ত্র অনুযায়ী মেরুকরণ ভেস্তে যাবে। ধর্ম যদি মেরুর ভিত হয় তা হলেই হিন্দুত্ববাদীদের উল্লাস। কারণ হিন্দুরা অনেক ভাগ। কিন্তু রুপোলি রেখা হল হিন্দুরা ৩৩ কোটি দেবদেবীর পুজো করেন। গণতান্ত্রিকতায় অনবদ্য। একেশ্বরবাদী নন বেশির ভাগ। দেবতা বা গুরুই যদি এত হয়, তা হলেই বোঝা যায় যে দল কখনও একটা হতে পারে? সে জন্যই ঐক্যের ডাক।

গান্ধী তো আমূল সমাজ পরিবর্তনের কথা বলেননি। তিনি স্থিতাবস্থার পক্ষে থেকেই সামন্ততান্ত্রিক প্রভুত্বকে প্রহার করেছেন।…  এতে পুঁজিবাদের কল‍্যাণ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় অন্তত ফিউডাল জাতপাত আর ধর্মীয় দাদাগিরির শিকরে কুঠারাঘাত করা সম্ভব হয়েছে।

সংঘ জানে, কংগ্রেসের নেতৃত্বে বিরোধী জোট হলে উড়ে যাবে তথাকথিত হিন্দুত্বের কর্মসূচি। তাই ঐক্যের নামে ধর্মভিত্তিক মেরু ভাগ করতে স্লোগান। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বহুত্বের। মৌলিক বিভাজনরেখা এখানেই‌। এই রেখার নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে চাই সামাজিক বা শ্রেণিভিত্তিক সংগ্রাম। এবং হিন্দুত্বের রাজনৈতিক আ্যজেন্ডা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা। ইতিহাস উহ‍্য রেখে তাই আলংকারিক আয়োজন। গান্ধী শুধু এই স্বচ্ছতার কথা বলেননি। বলেছেন অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার কথা। তাঁর আদর্শ গ্রাম শুধু শৌচালয়ে সীমাবদ্ধ নয়, খাদি এবং চরকা বিকল্প অর্থনীতির প্রতীক। সেই সঙ্গে রামধুন বহুত্ববাদী মননের মন্ত্র। গান্ধী তো আমূল সমাজ পরিবর্তনের কথা বলেননি। তিনি স্থিতাবস্থার পক্ষে থেকেই সামন্ততান্ত্রিক প্রভুত্বকে প্রহার করেছেন। দলিতদের আলোকিত করে শ্রেণিসংগ্রামের বাস্তবতার পাশে তাঁর শ্রেণিসমন্বয় এবং ট্রাস্টিশিপের মার্ক্সবাদ-বিরোধী তত্ত্বকে দাঁড় করাতে চেয়েছেন। এতে পুঁজিবাদের কল‍্যাণ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় অন্তত ফিউডাল জাতপাত আর ধর্মীয় দাদাগিরির শিকরে কুঠারাঘাত করা সম্ভব হয়েছে। ধর্ম নিয়ে যে দেশ টুকরো হয়েছে, স্বাধীনতার সত্তর বছর পরেও যে হতদরিদ্র অন্ধকারাচ্ছন্ন দেশের মূল আ্যজেন্ডা হিন্দু-মুসলমান, সেখানে আগে তো সভ‍্যতার শ্বাসপ্রশ্বাস চলুক, ধর্ম-জাতের পরিচিতি বিসর্জন দিয়ে মানুষের পরিচয় প্রতিষ্ঠা পাক, তার পরে না হয় বিপ্লব হবে। এই দেশের মাটির রসায়ন বুঝেই গান্ধী ধর্মীয় মৌলবাদের সর্বনাশের ব‍্যবস্থা করে গিয়েছেন। হয়তো জানতেন তাঁর মৃত্যুর সত্তর বছর পরেও সংসারত‍্যাগী সন্ন্যাসীর হাতে থাকবে মেরুকরণের রাজনীতির জড়িবুটি। এবং তিনি থাকবেন প্রশাসন ও দলের মাথায়। সে জন্যই গান্ধীর বীজমন্ত্র রাম।

আরও পড়ুন কৈলাসে কেলেঙ্কারি: বিজেপির আন্ডারহ্যাান্ড হাঁকালেন রাহুল, বল গেল গুজরাতে/২

পরিচর্চা শিবিরে দেশ ও দেশবাসীর সব সমস্যা উহ‍্য রেখে মোদীর স্বচ্ছতা নিয়ে সরব হয়েছেন সরকারের ফ্রেন্ড, ফিলজফার, গাইড ভাগবত। এটাও অনুমোদন বোঝায়। বোঝা যায়, গান্ধীর জন্মদিনে স্বচ্ছতার সূত্রপাত হলেও মোদীর সরকারি প্রকল্পের শিকড় কোথায়। আসলে আরএসএস যে রাষ্ট্রনায়কের কল্পনা করে এসেছে তাদের সেই স্বপ্নের রাষ্ট্রনায়ক হলেন নরেন্দ্র মোদী। রাজনীতিতে তাঁর অঙ্কুরোদগম সংঘের মাটিতে, তাদেরই আকাশের নীচে এবং তাদেরই জলবায়ুতে। মুখ‍্যমন্ত্রী ও ভোটক‍্যাচার হিসেবে তাঁর উত্থান ও আত্মপ্রকাশ সংঘের রোডম্যাপ অনুযায়ী এবং সংঘেরই ছত্রছায়ায়। অবশ্যই তিনি আডবাণীর মানসপুত্র। কিন্তু আডবাণীর ব্যক্তি-কাল্ট বা মাপ ও ব‍্যক্তিত্ব সংঘকে যে সংকটে ফেলেছে মোদীর  নেতৃত্বের সে সমস্যা নেই। তা ছাড়া বাজপেয়ী, আডবাণীর মতো রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবী নন মোদী। তিনি হার্ডকোর কর্মী-সংগঠক। কাজেই আনুগত্যের সমস্যা নেই‌। সর্বোপরি দলটাকে নিজের হাতে তৈরি করে আডবাণী দলনেতা হিসেবে যে স্থান পেয়েছেন, জননেতা বাজপেয়ীও তা পাননি। ফলে মতান্তরের ক্ষেত্রে দলে বিকল্পহীন বাজপেয়ীও বারবার যে ধরনের সমঝোতা করেছেন, আডবাণী তা করেননি। যদিও আডবাণীর সঙ্গে দলের মতান্তর হয়েছে মাত্র দু’বার। এক বার জিন্নাহ প্রসঙ্গে এবং দ্বিতীয় বার মোদীকে প্রধানমন্ত্রীর পদপ্রার্থী করা নিয়ে। এ দু’টি ইস‍্যু বাদ দিয়ে সব বিষয়েই অবশ্য আডবাণী মৌনতা দিয়ে নিজেকে মানিয়েছেন। কখনও মুখর হয়ে বিরোধীদের বার্তা দেননি। সে অবস্থানের দরুন তাঁর অর্জিত মর্যাদাকে কুর্নিশ না করে পথ নেই মোদী আ্যন্ড কোং-এর। অবশ্য সংঘের সর্বোচ্চ নেতা অনমনীয় দূরত্বে। আডবাণী উপপ্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাত সংঘ। রজ্জু ভাইয়া বা সুদর্শনের আমলে আজকের শীর্ষনেতা মোহন ভাগবত ছিলেন আডবাণীর নিজস্ব বৃত্তের অন্যতম অপরিহার্য নাম। অনুগামী বললে অবশ্যই অত‍্যুক্তি হয় না।

পরিচর্চা শিবিরে কিন্তু দেশদুনিয়ার কথা সে ভাবে এল না। যদি সামাজিক বা সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রমাণ করতে এ সব অনুচ্চারিত থাকে তা হলেও কিন্তু লাভ জিহাদ থেকে গো-তাণ্ডব পর্যন্ত জ্বালাময়ী ইস্যু জেগে থাকে। সংঘপ্রধান এ সবও এড়িয়ে যান। তাই স্বাভাবিক প্রশ্ন, সংঘের যাবতীয় শাখাপ্রশাখা কি কর্মেই বিশ্বাসী? কথায় নয়? নাকি এই ধরনের স্বৈর আচরণের সঙ্গে তাঁদের চাল-চরিত্র-চেহারার সংঘাত নেই? এই ধরনের আক্রমণকে সমর্থন করেন এমন লোক এ দেশে আছেন। সংখ্যায় তারা অবশ্যই গরিষ্ঠ নন। সংঘেরই মঞ্চ থেকে সংঘপ্রধান এ ধরনের অমানবিকতার বিরুদ্ধে বার্তা দেবেন, মানুষ তো তেমনটাই আশা করে। বিশেষ করে যারা সর্বে ভদ্রানি পশ‍্যন্তু বলে দিনরাত ভাষণ দেন সেই শাসকদের অভিভাবকের কাছে। এবং এত কাণ্ডের পর ভোটমুখো ভারতের ভাগ্যবিধাতারা যা সংকেত পাওয়ার পেয়ে গেলেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন