গ্রিসের পথে ভারত? ব্যাঙ্কদের বিশ্বজোড়া স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা আজ অত্যন্ত জরুরি

0
841
নীলাঞ্জন দত্ত

বিড়ালরা কি বিন খায়? খায়, এটা প্রমাণ করার জন্যই সোফ্রোনিস উঠেপড়ে লেগেছেন। গ্রিসের রাজধানী, প্রাচীন ইউরোপীয় সভ্যতার ধাত্রীভূমি আথেন্সের বাসিন্দা এই প্রবীণ নাগরিকের আতিথ্য লাভ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। ওর বাড়ি গিয়ে থেকেছি যখন, দেখেছি, সে বাঙালির মতই মাছ খেতে ভালবাসে। অলিভ অয়েলে তার হাতের মাছ রান্না খেয়ে পরম তৃপ্তিও পেয়েছি। আর তার মতই তার পোষা বেড়ালদেরও একদিনও মাছ ছাড়া চলে না।

কিন্তু এখন আর সে দিন নেই। ভয়াবহ আর্থিক সঙ্কটে বার বার ভরাডুবি হতে হতে কোনও রকমে ভেসে থাকার চেষ্টা করছে গ্রিস। সে জন্য বার বার তাকে হাত পাততে হচ্ছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ান, ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক আর আমাদের অতি-চেনা সেই ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড বা আইএমএফ-এর কাছে। আর এই ত্রয়ীর কাছে কার্যত বাঁধা পড়তে হচ্ছে তাকে। তারা তো ঋণ দেওয়ার জন্য বসেই আছে। কিন্তু সেই ঋণের টাকা তারা যাতে সুদে-আসলে ফেরত পায়, সেদিকটাও তো তাদের দেখতে হবে? তাই তারা চাপিয়ে দিচ্ছে কঠিন শর্ত – সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় কমাও, ধার শোধের জন্য টাকা জমাও। এই শর্ত মানতে গিয়ে শ্রমিক থেকে শিক্ষক, সমস্ত খেটে-খাওয়া মানুষেরই নাভিশ্বাস তুলে দিচ্ছে সরকার।

এই জুন মাস থেকেই শুরু হয়েছে আর একটি ঋণচক্র। পাকে পাকে সে জড়িয়ে ধরছে গ্রিসকে। সবচেয়ে বেশি মুশকিলে পড়েছে সোফ্রোনিসের মত প্রবীণ নাগরিকেরা। কারণ ওইসব আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্কের আজব নিদান অনুযায়ী যে ‘আর্থিক শৃঙ্খলা’ চালু করা হচ্ছে এবং বার বার যা কঠোর থেকে কঠোরতর হচ্ছে, তার প্রথম চোটটাই গিয়ে পড়ছে তাদের পেনশনের ওপর। সাত বছরে এই নিয়ে ১২ বার পেনশন কমলো। ধরা যাক যে আগে ৮০০ ইউরো পেনশন পেত, এখন পাচ্ছে ৫৫০ ইউরো। এভাবে কমতে কমতে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে কে জানে? এখন মাছ কেনার পয়সা কোথায়? অর্ধেক দিন তো ভাত বা নুডলসের সঙ্গে বেকড বিন খেয়েই কাটাতে হচ্ছে। বোঝো এবার বেড়াল পোষার ঠেলা!

ব্যাঙ্কের গ্রাহক মাত্রেই জানেন, তারা কীভাবে আমাদের ওপর বিভিন্ন ধরনের শর্ত চাপিয়েই চলেছে আর নানা অছিলায় তাদের ‘পরিষেবা’ বাবদ দক্ষিণা বাড়িয়েই চলেছে।

ভাবছেন, এসব অনেক দূরের কথা? একটু নজর দিন, দেখবেন, আমাদের দেশেও কোনও এক অদৃশ্য অঙ্গুলীহেলনে এমনই এক ‘আর্থিক শৃঙ্খলা’ আনার কাজ শুরু হয়ে গেছে। আর তার প্রথম কোপটা পড়ছে তাঁদেরই ওপর, যারা চাকরি যাওয়া বা অবসর নেওয়ার পর যে সামান্য কিছু টাকা পেয়েছিলেন, তা সরকারি ক্ষুদ্র আমানত প্রকল্পে রেখে নিশ্চিন্তে একটু বেশি সুদ পাবেন এই ভরসায় কোনওরকমে শেষ কটা দিন কাটাচ্ছিলেন। ২০১৭র জানুয়ারি-মার্চ থেকে এপ্রিল-জুন কোয়ার্টারের মধ্যে এমন দশটি প্রকল্পে সুদের হার কীরকম ভাবে কমেছে, তা একবার দেখে নেওয়া যাক।

প্রকল্প জানুয়ারি-মার্চ
২০১৭
এপ্রিল-জুন
২০১৭
৫ বছরের রেকারিং ডিপোজিট ৭.৩০% ৭.২০%
কিষাণ বিকাশ পত্র ৭.৭০% ৭.৬০%
ন্যাশনাল সেভিংস সার্টিফিকেট ৮.০০% ৭.৯০%
পোস্ট অফিসে মেয়াদি জমা (১ বছর) ৭.০০% ৬.৯০%
পোস্ট অফিসে মেয়াদি জমা (২ বছর) ৭.১০% ৭.০০%
পোস্ট অফিসে মেয়াদি জমা (৪ বছর) ৭.৩০% ৭.২০%
পোস্ট অফিসে মেয়াদি জমা (৫ বছর) ৭.৮০% ৭.৭০%
পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড (পি পি এফ) ৮.০০% ৭.৯০%
প্রবীণ নাগরিকদের সঞ্চয় প্রকল্প ৮.৫০% ৮.৪০%
সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা ৮.৫০% ৮.৪০%

.
অন্যদিকে, ব্যাঙ্কের গ্রাহক মাত্রেই জানেন, তারা কীভাবে আমাদের ওপর বিভিন্ন ধরনের শর্ত চাপিয়েই চলেছে আর নানা অছিলায় তাদের ‘পরিষেবা’ বাবদ দক্ষিণা বাড়িয়েই চলেছে। আমাদের জমা টাকা নিয়ে ব্যবসা করে তারা যে লাভ করছে তার ভাগ বাবদ আমাদের প্রাপ্য সুদ বাড়ানোর নাম নেই, উলটে এখন নিজেদের টাকা এটিএম থেকে তিন বারের বেশি তুলতে গেলেও তার জন্যে গুনাগার দিতে হচ্ছে। স্টেট ব্যাঙ্ক তো আমাদের বাধ্যই করলো কমপক্ষে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত সবসময় জমা রাখতে, না হলেই ‘জরিমানা’ হবে। অথচ, কয়েকজন শিল্পপতির শোধ না দেওয়া ধারের পরিমাণ কবেই তিন লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যার অন্তত তিন ভাগের এক ভাগ ব্যাঙ্করা ‘তামাদি’ বলে কার্যত মকুব করে দিয়েছে।

একদিকে আমাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাদের ব্যবসা করে মুনাফা করার জন্য সহজে “ঋণ” পাওয়ার রাস্তা করে দিচ্ছে, অন্যদিকে আমাদের ওপরেই “আর্থিক শৃঙ্খলার” নামে একের পর এক কঠিন শর্ত চাপিয়ে দিচ্ছে।

এইভাবে ব্যাঙ্কগুলো আমাদের মাথায় চেপে বসছে। গ্রিসের ক্ষেত্রে যেরকম একটা গোটা দেশের ওপর জবরদস্তি করছে আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্কগুলো, আমাদের এখানে সমগ্র জনগণের সঙ্গে তেমনই আচরণ করছে নিজেদেরই দেশের ব্যাঙ্করা। এতে ভুক্তভোগীর সংখ্যা যে নেহাত কম নয়, তা অনুমান করা যায় এ বিষয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নরকে উদ্দেশ্য করে একটি অনলাইন পিটিশনের পেছনে জনসমর্থন দেখে। এই পিটিশনের উদ্যোক্তা অর্থনৈতিক সাংবাদিক সুচেতা দালাল ও দেবাশিস বসু প্রতিষ্ঠিত ‘মানিলাইফ ফাউন্ডেশন’। ইতিমধ্যেই এই পিটিশনে স্বাক্ষরকারীর সংখ্যা ২,১৩,০০০ ছাড়িয়ে গিয়ে ‘ব্যাঙ্ক সে বাচাও’ এক আন্দোলনের রূপ নিয়েছে।

আরও পড়ুন: লকার থেকে কিছু হারালে ব্যাঙ্কের দায় নেই: রিজার্ভ ব্যাঙ্ক

ব্যাঙ্কদের বিশ্বজোড়া স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা আজ সাধারণ মানুষের বাঁচার জন্যেই জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সফলভাবে তা করতে গেলে এরা কেন এমন করছে, এদের উদ্দেশ্যটা কী, জোরটাই বা কোথায়, এসব ভাল করে বোঝা দরকার। এ বিষয়ে সাহায্য করবার মত একটি বইয়ের ভারতীয় সংস্করণও একেবারে ঠিক সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। বইটির নাম ‘ব্যাঙ্কোক্র্যাসি’ বা ব্যাঙ্কতন্ত্র (আকার বুকস, দিল্লি, ২০১৭, ৫৯৫ টাকা)। লিখেছেন বেলজিয়ান অর্থনীতিবিদ এরিক তুস্যাঁ। এর উদ্যোগে তৈরি ‘কমিটি ফর দা ক্যানসেলেশন অভ থার্ড ওয়ার্ল্ড ডেট’ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির ঋণ মকুবের জন্য দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এই নিয়ে তুস্যাঁ কয়েক বছর আগে কলকাতাতেও সভা করে গেছেন।

সারা পৃথিবী থেকে চয়ন করা বিপুল তথ্যভাণ্ডার আর তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণের সাহায্যে লেখক দেখিয়েছেন, কীভাবে ব্যাঙ্কগুলো সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পুঁজিপতিদের কাছে সম্পদ হস্তান্তরের এক মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে আমাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাদের ব্যবসা করে মুনাফা করার জন্য সহজে “ঋণ” পাওয়ার রাস্তা করে দিচ্ছে, অন্যদিকে আমাদের ওপরেই “আর্থিক শৃঙ্খলার” নামে একের পর এক কঠিন শর্ত চাপিয়ে দিচ্ছে। এই কাজ তারা দেশের ভেতরেও করছে, আবার আন্তর্জাতিক স্তরেও করছে।

রিজার্ভ ব্যাঙ্কের এর আগের গভর্নর রঘুরাম রাজন এই ব্যবস্থাটাকেই বলেছিলেন, “রিস্কলেস ক্যাপিটালিজম” বা ঝুঁকিহীন পুঁজিবাদ। আমরা সবাই জানি, সত্যি কথাটা বলে ফেলার জন্য তাঁকে আর ওই পদে রাখার ঝুঁকি নেয়নি শাসকরা।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here