নগ্ন-অত্যচারে মৃত্যু বন্দিনির, সহবন্দিনিদের বিক্ষোভ, বার বার কেন শিরোনামে ভায়খলা জেল

1
464
নীলাঞ্জন দত্ত

মহারাষ্ট্রের ভায়খলা জেলে একটা ভয়ানক কাণ্ড ঘটে গেছে। ইন্দ্রাণী মুখার্জি নামে এক মহিলা, যিনি তাঁর মেয়ে শিনা বোরাকে খুন করার অভিযোগে বিচারাধীন অবস্থায় সেখানে আটক আছেন, তিনি নাকি ২০০ সহবন্দিনিকে খেপিয়ে তুলে তুমুল হট্টগোল শুরু করেছিলেন। তাঁর মামলা এমনিতেই ‘হাই সোসাইটি হোমিসাইড’ হিসেবে মিডিয়ায় খুব প্রচার পেয়েছিল। এখন তিনি আবার নতুন একটা ‘কেস খেয়ে গিয়েছেন’ বলে মিডিয়াও একটা নতুন ‘স্টোরি’ পেয়েছে।

ভায়খলা জেলের ‘স্টোরি’টা কিন্তু মোটেই নতুন নয়। আর ইন্দ্রাণী মুখার্জির মামলার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কও নেই। এ বারের ঘটনাটা কী ঘটেছিল, তা এখনও পুরোপুরি প্রকাশিত হয়নি। বন্দিনিরা দাবি তুলেছেন, এই জেলের ভেতরে কী ঘটে চলেছে তা জানার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা সাংবাদিকদের দিতে হবে। সকলেই বোঝেন যে তা নিতান্তই দুরাশা। বরং, ২৮ জুন যখন ইন্দ্রাণীকে আদালতে হাজির করা হল, তাঁকে সশস্ত্র পুলিশের ঘেরাটোপে সর্বক্ষণ ঢেকে রাখা এবং সাংবাদিকদের দূরে রাখতে পুলিশের অতি সক্রিয়তা থেকেই বোঝা যায় এ বিষয়ে কতটা খবর বাইরে আসতে দেওয়া হবে।

মঞ্জুলা শেট্যে।

যতটুকু খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা যথেষ্ট বিচলিত হওয়ার মতো, যদিও এখনও পর্যন্ত সংবাদমাধ্যম অথবা নাগরিক সমাজে তেমন কোনো আলোড়ন চোখে পড়ছে না। মঞ্জুলা শেট্যে নামে ৪১ বছর বয়সি এক প্রাক্তন শিক্ষিকা তাঁর ননদকে হত্যার অপরাধে ১৪ বছরের সাজা খাটছিলেন, যা এই অক্টোবরেই শেষ হত। কিন্তু তার আগেই, ২৩ জুন সকালে, বন্দিনিরা বরাদ্দ অনুযায়ী ডিম ও পাঁউরুটি পাচ্ছেন না, এই অভিযোগ করায় তাঁর সঙ্গে জেলারের বচসা বাধে। বন্দিনিদের অভিযোগ, জেল কর্তৃপক্ষের রেগে আগুন হয়ে ওঠার কারণ, এই অভিযোগের সূত্রে অনেক বড় দূর্নীতি ফাঁস হয়ে যেতে পারত। তাঁদের বক্তব্য অনুসারে, মঞ্জুলাকে জেলারের নির্দেশে কারারক্ষীরা উলঙ্গ করে মারতে থাকে এবং তাঁর যোনীতে লাঠি ঢুকিয়ে দেয়। অনেকক্ষণ রক্তক্ষরণের পর তাঁকে যখন বাইরের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, ডাক্তাররা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। ইন্দ্রাণী আদালতে বলেছেন, তিনি মঞ্জুলার গলায় শাড়ি দিয়ে ফাঁস দিতেও দেখেছেন। এর পরেই বন্দিনিরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং তাঁদেরও বেধড়ক ঠেঙানো হয়।

ভায়খলা জেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা দিতে যাচ্ছেন ইন্দ্রাণী।

লোক জানাজানি হয়ে যেতে আপাতত সরকার ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমেছে। অভিযুক্ত জেলকর্মীদের সাসপেন্ড করা হয়েছে, ইন্দ্রাণীকে আদালতে অভিযোগ জানাতেও দেওয়া হয়েছে, আর মহারাষ্ট্র পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ এই ঘটনা নিয়ে তদন্তও নাকি করছে।

তদন্তে কী বেরোবে আমরা জানি না। তবে এইটুকু জানি যে, ভায়খলা জেলে বন্দিনিদের অসন্তোষ গত কয়েক বছরে একাধিক বার বিস্ফোরক অবস্থায় পৌঁছেছে এবং তার পরেও এর কোনো পরিবর্তন হয়নি। পাঠকদের মনে আছে কিনা জানি না, কিছু দিন আগেই কলকাতার আলিপুর মহিলা ‘সংশোধনাগারে’ নগ্ন-তল্লাশ নিয়ে রিপোর্ট করতে গিয়ে আমরা ভায়খলা জেলেরই একটি কাহিনি শুনিয়েছিলাম। এখানে আর একবার তা সংক্ষেপে বলছি।

১ এপ্রিল ২০১৫ ভায়খলা জেলের ওয়ার্ডের ভেতর সিসিটিভি লাগানো শুরু হয়। মেয়েরা এর প্রতিবাদ করেন। তাঁরা বলেন, এতে তাঁদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হবে। ওয়ার্ডের মধ্যেই তাঁদের পোশাক বদলাতে হয়। তা ছাড়া এই জেল চর্মরোগ আর গরমের জন্য বিখ্যাত, যার জন্য মাঝে মাঝে গায়ে পোশাক রাখাই দায় হয়ে ওঠে।

সেই সময় নাকি তাঁদের ‘খেপিয়েছিলেন’ এঞ্জেলা সোনটাক্কে নামে প্রাক্তন অধ্যাপিকা, এক ‘মাওবাদী’ বন্দিনি। আসলে তিনি আইজি (প্রিজন)-এর মূল সার্কুলারের একটা কপি জোগাড় করে দেখিয়ে দিয়েছিলেন, মেয়েদের ওয়ার্ডে ক্যামেরা বসানোর কোনো কথাই নেই। এই ‘অপরাধে’ তাঁকে নির্জন সেলে আটক করা হয়। সেখানে তিনি অনশন শুরু করেন। অবশেষে তাঁর স্বাস্থ্য খুব খারাপের দিকে যেতে আরম্ভ করলে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে একটা মীমাংসায় আসে।

এ বার আর একটু পিছিয়ে যাই। ৮ নভেম্বর ২০১৩। সকালের খাবার দেওয়ার সময় কী একটা সামান্য ব্যাপার নিয়ে কয়েক জন বাঙালি বন্দিনির সঙ্গে জেলকর্মীদের বচসা বাধল। ব্যাস, কারারক্ষীরা ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পেটাতে শুরু করে দিল। এই সব মেয়ে নাকি ‘বাংলাদেশী’ আর ‘বেআইনি অনুপ্রবেশকারী’। এদের মধ্যে এক জন তখন গর্ভবতী। এগিয়ে এলেন রাজনৈতিক বন্দি সুষমা হেমন্ত রামটেকে। “ওদের মারছো কেন?” এটা জিজ্ঞাসা করাটাই কাল হল তাঁর। কারণ ৩০ বছরের এই প্রাক্তন কম্পিউটার অপারেটার এমনিতেই একজন ‘বিপজ্জনক মাওবাদী’ বলে পরিচিত, যদিও ইতিমধ্যে বম্বে হাইকোর্ট তাঁর ওপরে লাগানো ইউএপিএ খারিজ করে দিয়েছে এবং তিনি জামিনে মুক্তি পাওয়ার অপেক্ষা করছেন। জেলার সহ কারারক্ষীরা তাঁকেও মারতে আরম্ভ করল। কয়েক জন আফ্রিকান বন্দিনি মাঝখানে এসে পড়ে তখনকার মতো তাঁকে বাঁচালেন।

এই সব কাণ্ড বার বার ভায়খলা জেলেই ঘটে কেন? কোন বার কে বন্দিনিদের খেপিয়েছে, সেটা বড়ো কথা নয়। প্রশ্ন হল, বার বার তাঁদের খেপে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় কেন? বার বার বন্দি নিপীড়নের অভিযোগ উঠলেও তা ধামাচাপা পড়ে যায় কেন?

মিটিং করে ঠিক হল, ৩০০ বন্দিনির মধ্যে যে ৬০ জনের বাচ্চা আছে, তাঁরা ছাড়া সবাই খাবার বয়কট করবেন, যতক্ষণ না কর্তৃপক্ষ ক্ষমা চাইছে। এই প্রতিরোধ ভাঙতে সন্ধেবেলা পুরুষ কারারক্ষী সহ এক বিশাল বাহিনী মেয়েদের জেলে ঢুকল এবং লাঠিপেটা শুরু করল। আক্রমণের বিশেষ লক্ষ্য হলেন সুষমা। তিনি সে দিন বাঁচতেন কিনা সন্দেহ। কিন্তু তাঁর জামাকাপড় ছিঁড়ে মারতে মারতে যখন তাঁকে আধমরা করে আনা হয়েছে, তখন আবার এগিয়ে এলেন সেই আফ্রিকান বন্দিনিরা। এবং তাঁদের মধ্যে একজন নিজের পোশাক খুলে ফেলে রক্ষীদের সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন। মহাশ্বেতা দেবীর ‘দ্রৌপদী’র কথা মনে পড়ছে? হ্যাঁ, ঠিক তাই ঘটল, পিছু হঠল বীরপুঙ্গবের দল। পরে, মহারাষ্ট্রের ‘কমিটি ফর ডেমক্র্যাটিক রাইটস’-এর তথ্যানুসন্ধানে এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। কিন্তু আর কিছু হয়নি।

এই সব কাণ্ড বার বার ভায়খলা জেলেই ঘটে কেন? কোন বার কে বন্দিনিদের খেপিয়েছে, সেটা বড়ো কথা নয়। প্রশ্ন হল, বার বার তাঁদের খেপে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় কেন? বার বার বন্দি নিপীড়নের অভিযোগ উঠলেও তা ধামাচাপা পড়ে যায় কেন? এ বার কি এর কোনও হিল্লে হবে?

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

1 মন্তব্য

  1. আমি এই লেখকের প্রবন্ধ বিগত কিছু দিন ধরে আগ্রহের সাথে পড়ছি। এত উচ্চমানের সাংবাদিকতা আজকের দিনে বিরল, অথবা সম্পূর্ণ অপসারিত। ভণিতা নেই, ভান নেই, বুদবুদ নেই, বাজার-বৃত্তি নেই, কোন ঘটনা বা প্রক্রিয়ার একেবারে মূলে পৌঁছে তার পরিষ্কার ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ব্যাখ্যা – ব্যাঙ্ক-রাজ, গরু-রাজ, জেল-রাজ, টেলিমিডিয়া-রাজ – সমস্ত লেখাতেই অনায়াস প্রতিস্পর্ধা ও পাণ্ডিত্য। স্বীকার করে নিচ্ছি, একটি অনলাইন খবরের ওয়েবসাইট-এ এইরাকম উচ্চমানের লেখা পরে প্রথমে বিস্মিত হলেও, পরে কৃতজ্ঞতাবোধ এসেছে এই ওয়েবসাইট-এর প্রতি। কেবল তথ্য ও বিশ্লেষণ নয়, গনতান্ত্রিক মূল্যবোধ-এর সঙ্গে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের যে ওতপ্রোত সম্পর্ক তা-ও এই লেখকের প্রবন্ধ-গুলিতে স্পষ্ট। পাঠক হিসেবে একটাই আর্জি, এই লেখকের লেখা আরও নিয়মিত, প্রতিদিন এই ওয়েবসাইট-এ স্থান পাক, এই লেখকের মেধা ও মনন ‘খবর অনলাইন’-এর সম্পাদকীয় এজেনডা-কে আরও বিস্তৃতভাবে প্রভাবিত করুক। আজকাল সোশ্যাল মিডিয়াতে বিশেষত যুবক যুবতীরা রাজনৈতিক চর্চা ও বিতণ্ডা করে থাকেন উচ্চগ্রামে, আপনারা এই লেখকের প্রবন্ধের মত বাছাই করা কিছু লেখা ফেসবুক ইত্যাদি-তে পোস্ট করতে পারেন, তাহলে খ্যাতি-প্রচার বাড়বে নিশ্চিত, আবার লোকশিক্ষাও হবে। শুভেচ্ছা রইল।

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here