সুদীপ চোঙদার

প্রশান্ত ভট্টাচার্য

“খুব জানতে ইচ্ছে করছে সুদীপ চোঙদারের মৃত্যু নিয়ে সংসদীয় বামরা কোনও বিবৃতি দিয়েছে কিনা!” ফেসবুকে নিজের ওয়ালে এই পোস্ট করেছেন আমার বন্ধুজন সৌমিত্র দস্তিদার। অফবিট তথ্যচিত্রনির্মাতা হিসেবে ওঁর একটা পরিচিতি গড়ে উঠেছে। ‘আগুনখেকো’ অনেক ‘বিপ্লবী’র সঙ্গে ওঁর সাক্ষাৎ হয়েছে। তবে সৌমিত্রর এই অহিংস জিজ্ঞাসাটি কিন্তু অনেক প্রশ্ন জাগিয়ে দিচ্ছে।

গত শুক্রবার দুপুরে এম আর বাঙ্গুর হাসপাতালে মৃত্যু হয় জেলবন্দি মাওবাদী নেতা সুদীপ চোঙদার তথা কাঞ্চনের। হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়, প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারের আধিকারিকরা গত ৪ ফেব্রুয়ারি তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করেন। জেল সূত্রে খবর, জেলের মধ্যেই তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

সরকারি ভাবে বলা হচ্ছে, চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে সুদীপের। কিন্তু সুদীপের স্বজন-বন্ধু এবং রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের অভিযোগ, কার্যত বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু হয়েছে তাঁর। মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগ, জেল কর্তৃপক্ষের অবহেলাতেই মৃত্যু হয়েছে এই মাওবাদী নেতার।

২০১০ সালে শিলদা ইএফআর ক্যাম্পে হামলার মামলায় অন্যতম অভিযুক্ত সাতচল্লিশের সুদীপকে সেই বছরেরই ৩ ডিসেম্বর কলকাতা ময়দান থেকে গ্রেফতার করা হয়। সেই থেকে তিনি জেলেই ছিলেন। ২০০৮ সালে সিপিআই (মাওবাদী) দলের রাজ্য সম্পাদক হিমাদ্রি সেন রায় ওরফে সোমেন গ্রেফতার হওয়ার পর সুদীপ চোঙদার ওই পদে আসেন। গড়বেতার বাসিন্দা সুদীপ চোঙদার লালগড় আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন।

সুদীপ চোঙদাররা তো মরবেই কেননা, ওরা আগুনের পাখি। ওদের এই আগুন নিয়ে খেলার (!) স্বপ্ন দেখানোর কারিগরও তো মরেছিলেন পুলিশের হেফাজতে। ওদের বিপ্লবের আরেক ফেরিওয়ালা মরেছিলেন ভোর ভোর ময়দানে, পুলিশের গুলিতে। ওরা তো তবু আগ্নেয় সত্তরের বারুদের গন্ধমেশানো জলবায়ুতে শহিদ হয়েছেন। আর এই সে দিন রাষ্ট্রীয় বন্দুকের গুলিতে মারা গেলেন সুদীপ চোঙদারদের পাশে থেকে মদত করা নেতা কোটেশ্বর রাও ওরফে কিষাণজি।

ভুল পথ? ভুল মতাদর্শ? জানি না। রাষ্ট্র যা বলে, তা গরিব কৃষক আর খেটেখাওয়া শ্রমিকের পরিপন্থী, এই তীব্র জীবনবোধ নিয়ে সুদীপদের অন্তহীন পথচলা। পণ্য হয়ে ওঠা বিপন্ন-বাচাল আধার কার্ড বুকে জাপটে নাগরিক জীবনটা ডিজিটাল হয়ে শোভে দশ ফুট বাই দশ ফুট গৃহকোণে। তবু ছেলে যায় বনে। গড়বেতা থেকে। করিমপুর থেকে। খড়দহ থেকে। আর মরে যায়! কার তাতে কী এসে গেল? এই বইমেলা, এই শহর, এই রাজ্য, এই জনস্রোত, এই লাল ব্রিগেড, এই ধরনা, কার কী এসে গেল? আমরা তো অবিচল আপন আপন ধান্দায়।

[আরও পড়ুন: মোদী ঠিকই বলছেন, তাঁকে ভয় পাওয়ার মতো একাধিক কারণ রয়েছে ]

মাও জে দং বলেছিলেন, ‘পৃথিবী তোমাদের এবং আমাদেরও, কিন্তু অবশেষে তোমাদেরই। তোমরা যুবক, সজীব ও প্রাণশক্তিতে উচ্ছল, জীবনের স্ফুটনোন্মুখ অবস্থায়, সকালবেলার ৮-৯টার সূর্যের মতো। তোমাদের উপরেই আশা রাখি।” কিন্তু কীসের আশা! যুবকেরা সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা সেক্টর ফাইভে বা নিউটাউনে কাটায়! বেঁচে থাকার রসায়নে। তারই মধ্যে কোনো কোনো সুদীপ চোঙদার অন্য পথে চলে যান।

বাম আমলে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে তৃণমূল আমলে জেলবন্দি অবস্থায় হাসপাতালে মারা গেলেন সুদীপ! আমরা, সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্টরা কনভেনশন করব, ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার মোড়ে পথসভা করব, ডেপুটেশন দেব কারামন্ত্রীর কাছে। কিন্তু আসছে বছর আবার হবে! আবার কোনো সুদীপের ইন্তেকাল হবে, এমনি ভাবে।

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত, এর সঙ্গে খবর অনলাইনের কোনো সম্পর্ক নেই)

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here