mehbooba and modi
দেবারুণ রায়

অটলবিহারী বাজপেয়ী ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের দাবি শিকেয় তুলে রেখে ক্ষমতায় এসেছিলেন। কারণ ৩৭০ অনুচ্ছেদে কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা, অযোধ্যার বিতর্কিত জমিতে রামমন্দির নির্মাণ, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা কমন সিভিল কোডের মতো বিজেপির কোর ইস্যুগুলোকে আঁকড়ে থাকলে ’৯৮, ’৯৯ সালে কেন্দ্রে সরকার গড়া যেত না। বাস্তবতার চাপে প্রধানমন্ত্রীর পদে প্রথম স্বয়ংসেবককে বসানোর বৃহত্তর উদ্দেশ্যসাধনের জন্য তখন বিজেপির সব চেয়ে প্রভাবশালী ও সংঘের মনপসন্দ নেতা লালকৃষ্ণ আডবাণীকেও মেনে নিতে হয়েছিল কোর ইস্যুগুলোকে মুলতুবি রাখার বাজপেয়ী লাইন। যাকে গোবিন্দাচার্য বলেছিলেন মুখোশ।

অঙ্কে ভুল ছিল না। ওই অঙ্কেই ‘নরমপন্থী’ বাজপেয়ীকে সামনে রেখে ফারুক আবদুল্লা, ওমর আবদুল্লাকে এনডিএ-তে টেনে এনে বিজেপির ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা শুরু। বাজপেয়ীজির কাজ ফুরোল ২০০৪-এর পরাজয়ে। এবং আডবাণীকে খারিজ করল ভারতের জনগণ ২০০৯-এ। ১০ বছরের উদারপন্থী ইউপিএ শাসনের অবসানে সংঘের সিদ্ধান্ত ছিল কোর ইস্যুতে ফিরে যাওয়া। তাই আডবাণীকে দিয়েই নিয়ে আসা হল মোদীকে। ৩০ বছর পর মোদীর হাত ধরে এল নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা। বিজেপি একক শক্তিতে প্রথম গরিষ্ঠ হল লোকসভায়। তার পর থেকে ৩৭০, রামমন্দির, কমন সিভিল কোড নিয়ে ধাপে ধাপে এগোলেও চরম পদক্ষেপ নিলেন না মোদী। হিন্দু রাষ্ট্রের স্বপ্নের চেহারা কেমন হবে দেখাতে উত্তরপ্রদেশে আনা হল সন্ন্যাসী যোগীকে। যদিও এক দিকে যেমন গোরু নিয়ে নীরব থাকলেন গোয়ার মনোহর পররিকর, তেমনই উদারতার নিদর্শন হিসাবে মেহবুবার হাত ধরলেন মোদী। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, কংগ্রেসমুক্ত ভারত গড়ার স্বপ্ন সফল করতে বিজেপি-পিডিপির সরকার হয়ে উঠল তাঁর মাস্টার স্ট্রোক। কিন্তু কাশ্মীরে সরকার চালাতে গিয়ে গরিষ্ঠ মোদী সরকারকেও গিলে যেতে হল ৩৭০।

এ জিনিস অনন্তকাল চলে না। নির্বাচনোত্তর জোট আরেকটা নির্বাচনের আগে সময় থাকতে থাকতেই ভাঙতে হবে। না হলে একক শক্তি বাড়বে কী করে? কী করে পূর্ণতা পাবে মেরুকরণের তত্ত্ব? তাই মেহবুবা সরকার চালানোর পাশাপাশিই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ বললেন জম্মু-কাশ্মীরে স্থায়ী সমাধানের কথা। অপেক্ষাকৃত নরমপন্থী মুখ দিয়ে বলানো হল কোর ইস্যুর কথা। যথা সময়ে পদে এলেন বিপিন রাওয়াত। কাশ্মীরে সব দলের সর্বসম্মত পথ ছেড়ে বিজেপি আঁকড়ে থাকল কট্টরপন্থাকেই। আফজল গুরুর ফাঁসির যে সূত্রটি ছেড়ে গিয়েছিলেন মনমোহন, সেটিকেই হাতে তুলে নিলেন তাঁর উত্তরসূরি। আরও প্রসারিত হল সেই লাইন। এবং কাশ্মীরে পিডিপির এবং জম্মুতে বিজেপির জমি হারানোর হতাশা যখন এক বিন্দুতে মিলেছে, সেই মুহূর্তেই সুজাত বুখারির রক্তে ভেজা শ্রীনগরের রাজপথে পাথরপন্থী কাশ্মীরিদের কড়া বার্তা দিয়ে দলকে গাঁটছড়া ভাঙতে বললেন মোদী-শাহ।

এ বার ভোট হবে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের দাবিতে। এই দাবিতে মুখর হয়ে বিজেপি থাকবে এক মেরুতে একা। অন্য মেরুতে থাকবে কংগ্রেস, ন্যাশনাল কনফারেন্স, পিডিপি, সিপিএম, এমনকি হুরিয়ত সহ আরও আরও কট্টরপন্থী ইসলামিরা। মেরুকরণের এমন অস্ত্রে কাশ্মীরে যা-ই হোক, জম্মু নিরঙ্কুশ করার লক্ষ্য বিজেপির। আর একঘরে মেহবুবার পিডিপিকে দেখিয়ে কাশ্মীরে জনজোয়ারে ভাসার অ্যাজেন্ডায় আছেন ওমর আবদুল্লা। সমীকরণের জোরে অথবা তিন বছর কাশ্মীরে ম্লেচ্ছদের সঙ্গে ঘর করার দরুন বিজেপির সমর্থন ভেসে যাওয়ার তোড়ে জম্মুতে কংগ্রেস কি গুছিয়ে নিতে পারবে? আগামী কয়েক মাস রাজ্যপালের শাসন কী বার্তা দেবে জম্মুর গরিষ্ঠ জনতাকে, সে দিকেই লক্ষ্য থাকুক।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here