achhe din.
ছবি সৌজন্যে উত্তরাঞ্চল টুডে।

দেবারুণ রায়

এসে গেছে অচ্ছে দিন। ২০১৪-র ভোটে মোদী যে ষোলো কলা পূর্ণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তার প্রায় পনেরো আনাই পূর্ণ। রাফাল নিয়ে রফা হলেই আরেক আনার খামতিটুকু ঘুচবে। আদালত জানতে চেয়েছে দাম। না জানালে কারণ-সহ হলফনামা চাই। সে আর কী এমন কথা। কিন্তু অচ্ছে দিন আসেনি আসেনি করে বিরোধীরা হৈচৈ ফেলে দিয়েছে। সরকার আর সরকারি দলও বেশ ডিফেন্সিভ খেলছে। ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়া থামিয়ে রীতিমতো কম্পমান ১৯-এর ভোটের কথা ভেবে। ভোট-ভাবনার জেরে একের পর এক ইস‍্যু তুলেই চলেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী  আর দলে তাঁর দক্ষিণহস্ত দুঁদে সভাপতি।ক্ষমতা হারানোর দুঃস্বপ্ন এতটাই পেয়ে বসেছে যে একটা ইস‍্যুতে দাঁড়াচ্ছেন না। ৫৬ ইঞ্চি ফুলিয়ে যে বলবেন, এই দেখো, এনেছি তোমার অচ্ছে দিন, তা-ও না। শুধু পরের পর ইস‍্যু। নিজেরা তো আঁকছেনই নিত্য নতুন অচ্ছে দিনের নকশা, সেই সঙ্গে বিরোধীরাও হাতে তুলে দিচ্ছে কিছু কিছু ইস‍্যু। কিন্তু কোনোটাতেই সেই জান নেই যাতে ভোট আপনাআপনি বাক্সে ঢুকে যাবে। না হলে উনিশের ভোটবন্দির পয়লা ধাপ ছিল নোটবন্দি। পায়ে পায়ে এল জিএসটি। বিধানসভা ভোট তো বেশ ভালোয় ভালোয় পেরোল। সাকুল‍্যে ২৩ রাজ্য এল বিজেপির হাতের মুঠোয়। এ যদি অচ্ছে দিন না হয়, তা হলে অচ্ছে দিন কোথায়?

প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন এবং শাহেনশাহ সভাপতি তাল ঠুকেছিলেন, আলবাত চোরাচালান, কালো টাকা, জঙ্গিহানা, জাল নোট সব বন্ধ হয়ে যাবে। এটাই তো অচ্ছে দিন। বিদেশের কালো টাকা দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। প্রত্যেক নাগরিকের পকেটে ঢুকবে নিদেনপক্ষে ১৫ লাখ। সে হবে স্বপ্নের দিন। শুধু কী তাই? প্রত‍্যেক বছর ২ কোটি বেকারের চাকরি হবে। এবং সত্তর বছরে যা যা হয়নি, শাসকরা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের রেকর্ড গড়েছে, সে সব অপূর্ণ আশার নিস্পত্তি হবে। আরও কত কী?

আরও পড়ুন কেরলে শবরীর প্রতীক্ষা বিজেপির, হিন্দু ভোট সিপিএমের কবজায়

কেন্দ্রে প্রথম বিজেপির একার সরকার সাড়ে চার বছর পার করল, কিন্তু ঘোষণায় বলা কর্মসূচির ধারেকাছেই গেল না সরকার, এমনকি দলও। রূপায়িত হতে লাগল ‘হিডন অ্যজেন্ডা’ বা গোপন কর্মসূচি। সরাসরি জড়িত নয় সরকার বা দল। সামনে থাকল অসংখ্য অপরিচিত মৌলবাদী হিন্দু সংগঠন। শহরে গ্রামে নিত্যনতুন সাইনবোর্ডের সংগঠন নানা কীর্তি করে বেড়াতে লাগল। এবং থানা-পুলিশের ভূমিকাতেই স্পষ্ট হল, তাদের খুঁটির জোর আছে। গো-তাণ্ডব চরমে উঠল। নতুন করে এল লাভ জিহাদ। এ-দিক ও-দিক ছুটপুট সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, সংঘর্ষ, সামাজিক নানা ফরমান জারি ও নীতিপুলিশির ঘটনা ঘটতে থাকল। উন্নয়নের নামে এল দাদাগিরি। এর সমান্তরাল অবস্থান সরকারের। কাশ্মীর-নীতির পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ‍্যে ভোটের ফলাফলে নিরঙ্কুশ না হয়েও সরকার গঠনের পুরোনো কংগ্রেসি কৌশল হাতে নিল বিজেপি। রাজ‍্যপাল নিয়োগের ক্ষেত্রে পুরোপুরিই সংঘং শরণম গচ্ছামি। উত্তরপ্রদেশের সরকার এনকাউন্টার নীতি নিয়ে বিরোধীদের সরব প্রতিবাদ আরও বুঝিয়ে দিল মানুষকে। কেন্দ্রের সরকারের সঙ্গে রিজার্ভ ব‍্যাংকেরও টানাপোড়েন শুরু হল। পরপর দুজন গভর্নরের সঙ্গে সংঘাতে জড়াল প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর দফতর। টাকার দাম নোজ ডাইভ দিচ্ছে ঘনঘন। নতুন টাকারও জালনোট মিলল। সীমান্তে লাগাতার পাক গোলাগুলি ও জঙ্গি অনুপ্রবেশের বিরামহীন ঘটনাবলি। এবং প্রায়শই কোনো না কোনো সরকার বা শাসকদলের কেউকেটাদের বিস্ফোরক মন্তব্য। এই পরিস্থিতিতে নতুন ইস‍্যু এল আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে লালকেল্লায় বছরে দ্বিতীয় বার মোদীর ভাষণ। শুরু করা হল নেতাজি-নেহরু বিতর্ক। তার পরই গুজরাতে পটেলের মূর্তি প্রতিষ্ঠার পর পটেল-নেহরু বিবাদপর্বের অবতারণা। এর আগেই গান্ধীকে নিয়ে আসা হয়েছে স্বচ্ছতা অভিযানকে উপলক্ষ্য করে। সব বিতর্কের মর্মবাণী একটিই। টার্গেট নেহরু। কারণ রঘুপতি রাঘব রাজা রাম যাঁর মন্ত্র, তাঁকে ছোঁয়া মুশকিল। বরং আধুনিক ভারতের রূপকার নেহরুই সংঘের টার্গেট হিসেবে মানানসই। এবং কংগ্রেস-মুক্ত ভারত গড়ার লক্ষ্যে এগোতে হলে নেহরুকেই সর্বাগ্রে ধূলিসাৎ করতে হবে। কিন্তু এতেও স্বস্তি নেই। তাই দিল্লির তালকাটোরা স্টেডিয়ামে বসেছে সাধু-পঞ্চায়েত। বিষয়, অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ শুরুর দিনক্ষণ। যোগী আদিত‍্যনাথ এতেও সন্তুষ্ট নন। তিনি সম্ভবত পটেলের চাইতেও লম্বা স্ট‍্যাচু বানাতে চান রামের। এ সবই অচ্ছে দিন ধরে রাখার লক্ষণ।

আরও পড়ুন মায়ার খেলায় মুখ বন্ধ বিজেপির, মেরুকরণের পালটা দাওয়াই জোটের

আমআদমির অচ্ছে দিন আসেনি। কিন্তু এসেছে যাদের আসার কথা, যাঁরা এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে অচ্ছে দিনের নাগাল পেয়েছেন। ২০১৪-র এই স্লোগানের কাঁধে চেপে যাঁরা প্রধানমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, মুখ‍্যমন্ত্রী এবং দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়েছেন। বিশ্ব পরিক্রমা করেছেন, করছেন দশলাখি পোশাক পরে। এ সবই অচ্ছে দিনের সাচ্চা ছবি। আর এ হেন পাত্র-মিত্র-অমাত‍্যদের অনুগ্রহ পেয়ে অচ্ছে দিন কিনে নিলেন যাঁরা?  ললিত আর মাল‍্য দিয়ে শুরু। নীরব আর মেহুল দিয়ে শেষ সে কথা বলা যাচ্ছে না। অচ্ছে দিনের অনেক সাচ্চা ভাগীদার দেশেই আছেন ও থাকবেন। কারণ তাঁরাই ভারতভাগ‍্যবিধাতা। তাঁদের এক জনের নাম নিয়ে একটু জলঘোলা হচ্ছে ইদানীং। তিনি রাফাল খ‍্যাত অনিল আম্বানি। অচ্ছে দিনের আগমার্কা মালিক।  

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here