birendra krishna bhadra
papiya mitra
পাপিয়া মিত্র

শরৎ-আকাশে যেমন হলুদ রোদের গন্ধ পাওয়া যায়, তেমনই এই সময় চার পাশে এক শারদপুরুষের উপস্থিতি অনুভব করা যায়। তিনি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। সেই কোন বুঝতে পারা সময়কাল থেকে দেখতে পাচ্ছি ধুতি-পাঞ্জাবি পরা গলায় উত্তরীয় জড়ানো, কপালে চন্দনের ফোঁটা-সহ কাঁচাপাকা ব্যাকব্রাশ করা চুল, তীক্ষ্ম নাক, মেদহীন লম্বা চেহারার মানুষটি যেন পাশেই আছেন। তিনিই সেই আগমনী পুরুষ বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র।

মহালয়া নিয়ে কিছু লেখা চাই। কী লেখা যায়? আছে তো অনেক কিছু। মনে পড়ে গেল বাংলা অ্যাকাডেমি সভাঘরে একটি অনুষ্ঠানের কথা। আকাশবাণী রিক্রিয়েশন ক্লাব আয়োজন করেছিল সেই অনুষ্ঠান। শারদপুরুষের জন্ম শতবার্ষিকী সে দিন।

আরও পড়ুন: বাণীকুমার ও মহালয়ার ভোরে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’

বাদলধারাকে পিছনে সরিয়ে ‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর’ – এক ভাব গম্ভীর আবাহনে কানায় কানায় পূর্ণ ঘর। প্রবীণদের জায়গা করে দেওয়ার জন্য সঞ্চালক দেবাশিস বসু বার বার অনুরোধ জানাচ্ছেন। এক নক্ষত্র-সমাবেশে ছিলেন প্রবীণ শিল্পী যূথিকা রায়, বাঁধন সেনগুপ্ত, অমিয় চট্টোপাধ্যায়, দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, সুনীত চক্রবর্তী, দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায়-সহ বহু মানুষ। ছিলেন কলকাতা বেতারের প্রবীণ ও অবসরপ্রাপ্ত বহু শিল্পী। শ্রোতাদের অনেকেই মাটিতে জায়গা করে নিয়েছেন।

সঞ্চালকের আবার অনুরোধে এক ঐতিহ্য ধরা দিল কারণ তিনিই আপামর বাঙালির ঘরের বীরেনদা। বাল্যবন্ধু বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায় আসতে পারেননি বলে একটি হাতচিঠি পাঠিয়েছিলেন, সেটিও পড়া হল।

সেই সন্ধ্যার স্মৃতি রোমন্থনে ভেসে উঠছে নানা ছবি। ৭ নম্বর রামধন মিত্র লেন (বাড়ি), ১ নম্বর গার্স্টিন প্লেস, চণ্ডীপাঠ, ধারাভাষ্য, নাট্য প্রযোজনা, ছদ্মনাম ‘মেঘদূত’, ‘শ্রীবিষ্ণুশর্মা’, ‘বিরূপাক্ষ’, সবিনয় নিবেদন, মহিলা মজলিস, মজদুর মণ্ডলীর আসর-সহ নানা টুকরো টুকরো শব্দ। বেতারের কথা দিয়ে শুরু করি।

রাতেই গঙ্গাস্নান সেরে গরদে নিজেকে মুড়ে ধ্যানস্থ হতেন চণ্ডীপাঠে। তখন যেন কেউ তাঁকে ভর করতেন। আবেগতাড়িত কণ্ঠে মন্ত্রোচ্চারণে চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ত জল। তিনি নিজের কাজের জায়গাটিকে মনে করতেন তীর্থভূমি আর কাজকে মনে করতেন পুজো। এই পুজো তাঁর আত্মার।

সময় ১৯৩৩, দুর্গাপুজোর ষষ্ঠী তিথি, ১ নম্বর গার্স্টিন প্লেসের ৮ নম্বর স্টুডিও চত্বরে ধূপধুনোর গন্ধ, ভিতরে ফুলের মালা দিয়ে সাজানো চার ধার। এ দিকে রাতগভীরে বেতারের গাড়ি রাজপথ দিয়ে আনতে ছুটেছে শিল্পীদের। এক সৌম্যকান্তি মানুষের দেখা মিলত সকলের আগে। রাতেই গঙ্গাস্নান সেরে গরদে নিজেকে মুড়ে ধ্যানস্থ হতেন চণ্ডীপাঠে। তখন যেন কেউ তাঁকে ভর করতেন। আবেগতাড়িত কণ্ঠে মন্ত্রোচ্চারণে চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ত জল। তিনি নিজের কাজের জায়গাটিকে মনে করতেন তীর্থভূমি আর কাজকে মনে করতেন পুজো। এই পুজো তাঁর আত্মার। নিজের কথায়, ‘আমি পাঠ করি না পুজো করি’।

আরও পড়ুন: মুসলমান বাদকদের নৈপুণ্যেেই জমে উঠেছিল মহিষাসুরমর্দিনী

‘মহিষাসুরমর্দিনী’ সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ হয়ে গেলেও পরে তিন-চার বছর অন্তর রেকর্ডিং হত। হয়তো দুপুরেই রেকর্ডিং হবে। তখনও দেখা যেত বীরেনদা স্নান সেরে গরদের ধুতি-পাঞ্জাবি পরে আসতেন। অবসরের পরেও তিনি মহালয়ার আগের রাতে আকাশবাণীতে এসে ড্রামা সেকশনের ঘরে একলাটি বসে থাকতেন। পরের দিন ভোরে সমাপ্তি ঘোষণা হলে পরে বাড়ি ফিরতেন। কতখানি অনুভব ছিল তাঁর। বলছিলেন তাঁর সহকর্মী ঘোষক মিহির বন্দ্যোপাধ্যায়।

১৯২৮ থেকে রেডিওর মস্ত দায় বয়ে নিয়ে বেড়িয়েছেন ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত। যেমন অসাধারণ নাটক প্রযোজনা করেছেন, তেমনই তাতে অভিনয় ও নাটকের গান রচনায় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।…এ হেন মানুষটি একধারে যেমন লেখক, গায়ক, অভিনেতা, বক্তা, অন্য দিকে ভদ্র, বিনয়ী, আত্মভোলা, রসিক ও নিরহংকারী। 

ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ের সদর দফতরে যোগ দিলেও অনায়াস যাতায়াত ছিল বেতারকেন্দ্রে। জমাটি আসরে নিজের কথা বলে আসর মাতিয়ে দিতেন। এই আসর থেকেই বেতারে নাটক করার সুযোগ পেয়ে গেলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। ওই বছরেই আগস্ট মাসে তাঁর পরিচালনায় ‘চিকিৎসা সংকট’ বলে একটি নাটক বেতারে সম্প্রচারিত হল। রচনা পরশুরামের, অভিনয় করলেন বাণীকুমার, পঙ্কজকুমার মল্লিক-সহ আরও অনেকে। সেই সময় ঘটল আরও এক যুগান্তকারী ঘটনা। তখন ভারতীয় প্রোগ্রামের অধিকর্তা ছিলেন নৃপেন্দ্রনাথ মজুমদার। তাঁর সহায়তায় বেতারে যোগ দেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র।

সেই ১৯২৮ থেকে রেডিওর মস্ত দায় বয়ে নিয়ে বেড়িয়েছেন ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত। যেমন অসাধারণ নাটক প্রযোজনা করেছেন, তেমনই তাতে অভিনয় ও নাটকের গান রচনায় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তাঁর প্রযোজনায় কে না অভিনয় করেছেন। অহীন্দ্র চৌধুরী, দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, সরযূবালাদেবী নিভাননীদেবী, মিস বীণাপানি, নরেশ মিত্র, শিশির ভাদুড়ী প্রমুখ। কার না নাটক বেতারস্থ হয়নি? গিরিশচন্দ্র ঘোষ, মাইকেল মধুসূদন, ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ, দীনবন্ধু মিত্র, শচীন সেনগুপ্ত-সহ আরও কত জনের। এ হেন মানুষটি একধারে যেমন লেখক, গায়ক, অভিনেতা, বক্তা, অন্য দিকে ভদ্র, বিনয়ী, আত্মভোলা, রসিক ও নিরহংকারী। কিন্তু বড় স্বাধীনচেতা মানুষটি কখনোই অনুগ্রহে থাকতেন না।

বিরূপাক্ষ নামের অন্তরালে সৃষ্টি করে গিয়েছেন কত রম্যরচনা। সময়োপযোগী কত নাটক লিখিয়ে নিয়েছেন তরূণ রায় তথা ধনঞ্জয় বৈরাগীর কাছ থেকে। সেই সব নাটকে বাস্তবের হাসি-কান্না-মান-অভিমানের কথা তুলে ধরে নাটকের গান রচনা করেন বহু। বেতারের শ্রোতা তৈরিতে অসীম ক্ষমতাবান ছিলেন। বলা যায়, তাঁর বেতারে যোগ দেওয়া থেকেই আকাশবাণীকে গৃহস্থের ভাঁড়ার ঘরের সঙ্গী করে তুলেছিলেন। এ কৃতিত্ব বড় কম নয়! কী পেলেন জীবনে? বেতারকেন্দ্র তাঁর অবসরের পরে কতটুকু মনে রেখেছে? কেন তাঁর ভীষণ অর্থকষ্ট ছিল? কে দেবে তার উত্তর?

1 মন্তব্য

  1. পুরুষ পুরুষ বলা কেন……। এতে বিষয়ের গুরুত্ব হালকা হয়…………………।।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন