nilanjan dutta
নীলাঞ্জন দত্ত

“আমি এমন একটা সমাজে বাস করতে চাই, যেখানে মানুষ জনপ্রিয় নয় এমন মতও প্রকাশ করতে পারবে, কারণ আমি জানি যে এ ভাবেই একটা সমাজ বিকশিত আর পরিণত হয়ে উঠতে পারে” — কথাগুলো কোনো মহাপুরুষের নয়। এ কথা বলেছিলেন বহু-বিতর্কিত ‘প্লেবয়’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক হিউ হেফনার, তাঁর ৮৫ বছরের জন্মদিন উপলক্ষে ‘সিবিএস লস এঞ্জেলেস’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে। ২৭ সেপ্টেম্বর, ৯১ বছর বয়সে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। এমন একটা সময়ে, যখন তাঁর সেই স্বপ্নের সমাজ সারা বিশ্বেই দূর থেকে আরও দূরে সরে যাচ্ছে।

হেফনারকে আমরা কী ভাবে মনে রাখব? যৌনতাকে হলদে মলাটের আড়াল থেকে টেনে বার করে এনে আর পাঁচটা সাময়িকপত্রের সঙ্গে খবরের কাগজের স্টলে দৃশ্যমান ভাবে তুলে ধরল পৃথিবীতে প্রথম যে পত্রিকা, তার রূপকার হিসেবে? ১৯৫০-এর দশকের গোড়ার দিকে এমন পত্রিকার কথা ভাবাটাই সত্যি এত দুঃসাহসের কাজ ছিল, যে কেবল তার জন্যেই তাঁকে স্মরণ করা যেতে পারে। মনে রাখবেন, সেই সময় আমেরিকাতেও কনডোমের বিজ্ঞাপন দেখলে অনেক লোক নাক সিটকোত। আজ এখানে নবরাত্রির সময় ‘নিরাপদ যৌনতা’র কথা তুলেছে বলে ম্যানফোর্স-এর হোর্ডিংগুলোতে যারা কালি মাখিয়ে দিচ্ছে, সেই সময় ওখানেও সে রকম লোকের অভাব ছিল না। সমকামিতা দূরে থাক, বিবাহিত দম্পতির মধ্যেও কী ধরনের যৌনক্রিয়া ‘অনুমোদিত’, তাও বাঁধা ছিল কঠোর সামাজিক ও আইনি অনুশাসনে। সে সবের বেড়াজাল ছিঁড়ে ফেলা সোজা কাজ নয়। কিন্তু তার থেকেও অনেক বড়ো কথা হল, তিনি ছিলেন মুক্তচিন্তা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে এবং বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে এক নিরলস কর্মী।

“খুব অল্প বয়স থেকেই আমি ভাবতাম যে সমাজে এমন কিছু জিনিস রয়েছে যা ঠিক নয়, এবং আমি হয়ত সেগুলোকে পালটাতে একটা অতি সামান্য ভূমিকা নিয়ে পারি” — ওই সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন হেফনার। যা-ই করুন না কেন, তার মধ্যে দিয়ে সারা জীবন তিনি চেষ্টা করে গেছেন এই ভূমিকা রাখতে। তিনি ছিলেন তখনকার দিনে হাতে গোনা শ্বেতাঙ্গদের এক জন, যিনি চামড়ার রঙের জন্য মানুষে-মানুষে কোনো তফাৎ করেননি। কালো মেয়েরা অনায়াসে ‘প্লেবয়’ পত্রিকায় মডেল তো হয়েছেই, তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘প্লেবয় ক্লাব’গুলিতে কৃষ্ণাঙ্গ কমেডিয়ানরা আকছার অভিনয় করেছে, যখন বেশির ভাগ জায়গায় তাদের স্টেজে ওঠাই বারণ ছিল। বলতে পারেন, এ-ও এক ব্যবসায়িক চাল। কিন্তু আবার সময়টা খেয়াল করবেন। তখন বর্ণবিদ্বেষ এতই প্রবল, যে এ রকম চাল চালতে গেলে বাজার থেকেই উঠে যাওয়ার ভয় ছিল – যেমন সম্প্রতি হিন্দি ছবিতে কিছু অভিনেতাকে নিলে ছবি দেখানোই না যেতে পারে বলে প্রযোজকরা ভয় পেয়েছেন। সেই সময় কেবল নিজের ক্লাবে কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেতাদের নেওয়া নয়, তাঁর কাছে ‘ফ্র্যাঞ্চাইস’ নিতে এসেছে যারা, তাদেরও স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন হেফনার, “এরা আমাদের ক্লাবের সদস্য, এদের কিন্তু বাদ দিলে চলবে না।”

এ ভাবেই তাঁর বন্ধু হয়ে ওঠেন মার্টিন লুথার কিং, জেসি জ্যাকসন-সহ সমতা আন্দোলনের বহু অগ্রণী সেনানী। মৃত্যর আগে মার্টিন লুথার কিং-এর শেষ সাক্ষাৎকার ‘প্লেবয়’তেই প্রকাশিত হয়েছিল। ঘাতকের হাতে কিং নিহত হওয়ার পর হেফনার আরও সক্রিয় ভাবে এই আন্দোলনে যোগ দেন। ‘পুশ’ আর ‘রেনবো কোয়ালিশন’-এর মতো সংগঠনগুলিকে তিনি বহু অর্থও তুলে দেন। একের পর এক ‘প্লেবয় জ্যাজ ফেস্টিভ্যাল’-এ সাদা-কালো নির্বিশেষে শিল্পীরা সুরের ঝঙ্কার তুলেছেন, আর তার টিকিট বিক্রির টাকায় আন্দোলনের তহবিল ভরে উঠেছে।

কেবল কিং নন, প্রতিবাদী গায়ক মাইলস ডেভিস, মুষ্টিযোদ্ধা মহম্মদ আলি, কমেডিয়ান স্যামি ডেভিস, লড়াকু নেতা ম্যালকম এক্স – সবারই সাক্ষাৎকার ছেপেছে ‘প্লেবয়’। তার সঙ্গে সঙ্গে জনসমক্ষে তুলে এনেছে অ্যালেক্স হেইলির মতো কৃষ্ণাঙ্গ সাংবাদিক ও লেখকদের। তার টেলিভিশন চ্যানেলে আসর মাতিয়েছেন ন্যাট কিং কোল-এর মতো গায়করা। কৃষ্ণাঙ্গ ছাড়াও ফিদেল কাস্ত্রো থেকে জন লেনন পর্যন্ত এমন সব ব্যক্তিত্ব খোলাখুলি কথা বলতে পেরেছেন ‘প্লেবয়’-এর পাতায়, যাঁরা কোনো ভাবেই মার্কিন শাসকদের সুনজরে ছিলেন না। প্রসঙ্গত, জওহরলাল নেহরুর একটা সাক্ষাৎকারও প্রকাশিত হয়েছিল অক্টোবর ১৯৬৩-র ‘প্লেবয়’তে, যদিও ভারত সরকার বলেছিল, এমন কোনো সাক্ষাৎকার নাকি দেওয়াই হয়নি।

সুসান ব্রাউনমিলারের মতো নারীবাদীরা এক সময় হেফনারের তীব্র সমালোচনা করেছেন, তিনি মেয়েদের পণ্য করে তুলেছেন বলে। কিন্তু তাঁকে নিয়ে বিতর্কের মীমাংসা হয়নি। আজ তিনি মারা যাওয়ার পরেও অ্যাম্বার অ্যাথির মতো নতুন প্রজন্মের নারীবাদী সাংবাদিককে টুইট করতে হয়, “হিউ হেফনারকে কি শয়তান বলব তিনি মেয়েদের পণ্য বানিয়েছেন বলে, না মহান বলব তিনি তাদের যৌনতার উদযাপন করেছেন বলে?”

প্লেবয় পত্রিকার প্রচ্ছদে প্রথম ভারতীয় নগ্ন মডেল হিসেবে জায়গা পেয়েছিলেন শার্লিন চোপড়া

যা-ই হোক, এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই যে, গর্ভপাতের অধিকার, সমকামিতা, পছন্দমতো সঙ্গী বেছে নেওয়া – সমস্ত বিষয়েই হেফনার তাঁর সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে প্রকাশ্যে প্রগতির পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং মৃত্যদণ্ডের বিরোধিতায় তাঁর অবস্থানও দ্বিধাহীন। দেশের বিভিন্ন জায়গার ‘রেপ ক্রাইসিস সেন্টার’ আর আমেরিকান সিভিল লিবার্টিস ইউনিয়ন-এর কাজকর্ম চালাতেও তিনি সাহায্য করতেন।

‘অশ্লীলতার দায়ে’ ১৯৫৫ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত একাধিক বার হেফনারকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে। আর প্রত্যেক বারই জবরদস্ত আইনি লড়াই লড়ে তিনি শুধু নিজেকে মামলা থেকে মুক্ত করে আনেননি, এই মামলাগুলিতে আদালতের প্রতিটি সিদ্ধান্তই স্বাধীনভাবে বলা-লেখার অধিকারকে এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে। এই অধিকাররক্ষার জন্য যাঁরা উল্লেখযোগ্য কাজ করছেন, তাঁদের জন্য ১৯৭৯ থেকে একটি পুরষ্কারও দিয়ে আসছে হিউ হেফনার ফাউন্ডেশন।

এই যে আবার নতুন করে দুনিয়া জুড়ে রক্ষণশীলদের কুচকাওয়াজ শুরু হয়েছে, হেফনারের বিশ্বাস ছিল, তা কখনোই স্থায়ী হবে না। ২০১৩ সালে তাঁর পত্রিকায় তিনি লিখেছিলেন, “এ হল এক পালাতে থাকা সেনাদলের শেষ যুদ্ধের চেষ্টা, যে সেনাদলে আছে সেই সব স্বনিয়োজিত নীতিবাগীশ যারা গত পাঁচ দশক ধরে একের পর এক হার স্বীকার করেছে। আমেরিকানরা এই ধর্মোন্মাদদের প্রত্যাখ্যান করেছে এবং যৌনতা শুধু বংশবৃদ্ধির জন্য, এই খ্রিস্টান দৃষ্টিভঙ্গি মেনে না নিয়ে নারীর অধিকার, জন্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং ব্যক্তিগত পরিসরের অধিকারকে রক্ষা করবার জন্য লড়াই করেছে।”

দীর্ঘ জীবন ধরে তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ে গেলেন হিউ হেফনার।

আরও পড়ুন : নিউটনের আত্মা, চরিত্র ও প্রশ্নেরা ভারতীয়, ইরানের নয় 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here