arunava ghosh

মুসলমান ভোটাররা বিজেপি সম্বন্ধে ভীষণ ভীত। সাম্প্রতিক মহেশতলা বিধানসভার উপনির্বাচনের ফলাফল সে কথাই প্রমাণিত হল। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় বিভাজনকে যত বেশি সম্ভব কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলকে ‘ধর্মযুদ্ধ’ হিসাবে দেখতে গিয়ে মুসলমানদের সমর্থন তৃণমূলের দিকে চলে যাচ্ছে।

মহেশতলায় মুসলমান সম্প্রদায়ের অধিকাংশই শ্রমিক শ্রেণিভুক্ত। এঁরা অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করতেন। তাঁরাও বিজেপির হিন্দুত্ববাদের ভয়ে বামপন্থীদের ছেড়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভোট দিয়েছেন।

অন্য দিকে মমতার মুসলমান-প্রীতি ও তাদের ধর্মের ব্যাপারে উৎসাহিত করার জন্য মধ্যবিত্ত বাঙালি হিন্দু, যাঁরা কোনো দিন ধর্মের উপর নির্ভর করে ভোট দিতেন না (অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর নির্ভর করে ভোট দিতেন বামপন্থীদের), তাঁরাও এখন পালটা বা বিপরীত হিসাবে বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। ফলে আগামী দিনে ধীরে ধীরে পশ্চিমবঙ্গের জনগণ ধর্মের ভিত্তিতে আড়াআড়ি ভাগ হয়ে যেতে বসেছে। যেখানে রাজনৈতিক আদর্শ বা অর্থনৈতিক সংগ্রাম গৌণ হয়ে যাবে। এটা এ রাজ্যের ক্ষেত্রে ভয়ংকর।

পশ্চিমবঙ্গে মমতার সুবিধা হবে। কারণ ২৬ শতাংশ মুসলমান ভোট সম্পর্কে তিনি নিশ্চিন্ত। যার সঙ্গে আর কিছু সাধারণ ভোট পেলেই তিনিই ক্ষমতায় থেকে যাবেন।

রাজনীতিতে অশিক্ষিতদের ভিড় দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। এবং শিক্ষিত লোকের স্থান সংকুচিত হচ্ছে। ভারতবর্ষের ইতিহাস সম্পর্কে বিজেপির তরফে ইন্টারনেটে যে ধরনের প্রচার করা হচ্ছে, তা ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কবিহীন হলেও অসচেতন মানুষকে আকৃষ্ট করছে। হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করছে।

এতে পশ্চিমবঙ্গে মমতার সুবিধা হবে। কারণ ২৬ শতাংশ মুসলমান ভোট সম্পর্কে তিনি নিশ্চিন্ত। যার সঙ্গে আর কিছু সাধারণ ভোট পেলেই তিনিই ক্ষমতায় থেকে যাবেন। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সব থেকে বড়ো দুর্বলতা হল, এ রাজ্যে তাদের কোনো মাঝারি মাপের নেতা নেই, যাঁর এলাকাভিত্তিক পরিচিতি ও স্বীকৃতি আছে। একে বারে উঁচুতলার নেতার সঙ্গে নিচুতলার যোগাযোগ যে কারণে রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে ওই দল। আবার পশ্চিমবঙ্গের পরিচিত বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের ভাবমূর্তি বজায় রাখতে বিজেপির সঙ্গে নিজেদের জনসমক্ষে একাত্ম করতে চাইছে না। সব মিলিয়ে বিজেপির পক্ষে একা ভোটারদের এক তৃতীয়াংশকে কাছে টানা সম্ভব নয়, যার ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা দখলে দিকে তারা এগিয়ে যেতে পারবে।

অন্য দিকে সিপিএম ‘মরে’ গেলেও তার মুছে যাওয়া কোনো মতেই সম্ভব নয়। শুধু ভোটের নিরিখে নয়, জনসমর্থনের দিক থেকে সিপিএম বা বামপন্থীরা নিজেদের মিলিয়ে যাওয়াকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম। তৃণমূলকে সরাতে তাদের কিছু সমর্থক হয়তো বিজেপি-কে ভোট দিয়েছেন, কিন্তু বামপন্থীদের ভোটে বিজেপির থাবা বসলেও আদতে লাভ মমতার। সিপিএম-কংগ্রেস সম্ভাব্য জোটের ভোট বহু মুখে প্রবাহিত হবে, যা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হওয়ায় তৃণমূলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। ফলে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজেপির ‘ধর্মযুদ্ধের’ ডাকে আখেরে মমতার লাভ।

(লেখক কলকাতা হাইকোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী তথা প্রাক্তন বিধায়ক)

2 মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here