chandrababu mamata mayawati
মায়াবতী, চন্দ্রবাবু ও মমতা। ছবি সৌজন্যে এশিয়ানেট নিউজ।
debarun roy
দেবারুণ রায়

অন্ধ্রের মুখ‍্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নায়ডু বিজেপি-বিরোধী জোটকে কিলার ইন্সটিংক্ট দিতে চাণক‍্যের চাল দিয়েছিলেন।  আসন্ন যুদ্ধের দিকে তাকিয়ে গত ৮ নভেম্বর চন্দ্রবাবু শত্রুর বিরুদ্ধে তূণীরে একটি মোক্ষম তির মজুত করে জোটের সম্ভাব্য সঙ্গীদের সংকেত দেন। এর জন্য বিরোধী কনক্লেভ, দিল্লি, কলকাতা, হায়দরাবাদে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনার বা চা-চক্রের দরকার হয়নি। এমনই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যার ফলে বিনা আয়োজনেই চায়পেচর্চা চলছে সারা দেশে। তূণীরের সেই তিরটি কোনো মতাদর্শ, ভাবধারা, আসন রফার সূত্র বা কমন মিনিমাম প্রোগ্রাম অর্থাৎ অভিন্ন ন‍্যূনতম কর্মসূচিও নয়। নেহাতই সাদামাটা সরকারি সিদ্ধান্ত। কিন্তু তার প্রচ্ছায়া সুদূরপ্রসারী। ৮ নভেম্বর চন্দ্রবাবুর সিদ্ধান্ত ছিল, সিবিআইকে দেওয়া রাজ‍্য সরকারের সাধারণ সম্মতি প্রত‍্যাহার করে নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, এখন থেকে অন্ধ্রপ্রদেশে কর্মরত কোনো কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীর বা সংস্থার বিরুদ্ধে সিবিআইকে তদন্তের জন্য খোলা অনুমতি দেওয়া থাকছে না। এমন কোনো প্রয়োজন হলে সিবিআইকে অনুমতি চাইতে হবে। রাজ‍্যের প্রশাসনিক বা পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে সিবিআই তদন্তের ঘটনা নতুন নয়। নতুন নয় দুর্নীতির অভিযোগও। সিবিআইকে দিয়ে বিরোধীদের বেগ দেওয়ার ইস‍্যু দিন দিন আলোচ‍্য বিষয় হয়ে উঠছে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে সিবিআইয়ের তদন্তে ঢালাও অনুমোদন প্রত‍্যাহার একটা তাৎপর্যের সিদ্ধান্ত। কেন্দ্রকেও সমঝে দেওয়া যে, আমরাও প্রত‍্যাঘাত করতে জানি। ফলে এই কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাটিকে নিয়ে ঘরে-বাইরে বেসামাল বিজেপি সরকারের সমস্যা বাড়ল। বিশেষ করে, সংশ্লিষ্ট সংস্থাটিই যখন ভেতর ভেতর দু’ পক্ষ নিয়ে বিবদমান।

আরও পড়ুন আসরে চন্দ্রবাবু, অশনিসংকেত বিজেপির

এক দিকে বর্মার ব্রিফ আর অন‍্য দিকে আস্থানার না। অধস্তনরা কোন দিকে যাবেন? বৃহস্পতিবার সবে অন্ধ্রের সিদ্ধান্তটি সে ভাবে জানাজানি হয়েছে। মুখ‍্যমন্ত্রী এটিকে নিয়ে  ঢ‍্যাঁড়া পেটাতেও যাননি। একেবারে বিনা ঢাকঢোল পিটিয়ে নিরীহ রুটিন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রাজ‍্য সচিবালয় রুটিনমাফিক তার তথ্য জানায় অন্যান্য রাজ‍্যকে।

সেই সূত্রেই বাংলার মুখ‍্যমন্ত্রীর গোচরে আসে ব়িষয়টি। ঘটনা বৃহস্পতিবার রাতের। সঙ্গে সঙ্গেই মনস্থ করেন মমতা। এবং শুক্রবার নেতাজি ইনডোরের দলীয় সভায় বলেন, চন্দ্রবাবু ঠিক করেছেন। তার পর নবান্নে ফিরে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আইন ও অন্যান্য বিষয় খতিয়ে দেখে অতীতের দেওয়া সাধারণ সম্মতি তুলে নেন। এ দিকে সোমবার বিকেলে নবান্নে মমতার সঙ্গে কথা বলতে আসছেন চন্দ্রবাবু।

এ বার বিজেপিকেও ভাবতে হবে, সিবিআই-জুজু দেখিয়ে একচ্ছত্র হতে গিয়ে তারা শেষ পর্যন্ত বিরোধীদের আরও বড়ো ও ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের রসদ জোগাচ্ছে না তো?

কেন্দ্রকে দেওয়া এই সংকেতে অবশ্যই এক ঢিলে দুই পাখি মারলেন মমতা। সিবিআই আতঙ্ক থেকে পরিত্রাণের একটা পথ বেরোল। রাজ‍্যকে পাশ কাটিয়ে আর কিছু করা চলবে না, অন্তত যতক্ষণ না কেন্দ্র চলতি আইন সংশোধন করে। যদিও আইন পাশের গরিষ্ঠতা সরকারের আছে, কিন্তু এই আইন পালটাতে গেলে দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে দেওয়ার দায় আরও একবার নিতে হবে বিজেপিকে। যা ভোটের মুখে হবে বড়ো বিপজ্জনক। কারণ এই ইস‍্যুকে সামনে রেখে বিরোধী জোটের পরিধি আরও বাড়বে। যে সব আঞ্চলিক দল বিরোধী জোটের বাইরে রয়েছে তারাও শামিল হবে রাতারাতি। সুতরাং এ পথে এগিয়ে মোদীকে আরও চাপে ফেলা গেল। এ বার বিজেপিকেও ভাবতে হবে, সিবিআই-জুজু দেখিয়ে একচ্ছত্র হতে গিয়ে তারা শেষ পর্যন্ত বিরোধীদের আরও বড়ো ও ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের রসদ জোগাচ্ছে না তো? এবং, কে বলতে পারে অদূর ভবিষ্যতে কংগ্রেসকে রুখতে আঞ্চলিকদের সঙ্গে টানতে হবে না। এদের নিয়েই তো এনডিএ-র শুরু। এদের সাহচর্যেই তো ছ’ বছর ক্ষমতায় ছিল বিজেপি।

নিজের দল ও সমর্থনভূমি বাঁচাতে যে কোনো পথ বেছে নেওয়ার অধিকার স্বীকৃত। এবং সেই পথকে যুক্তিযুক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার উপায় তো আছে হাতের মধ্যেই। চন্দ্রবাবুর পথ নিয়ে চলার স্পষ্ট অর্থ বিরোধী জোটকে মজবুত করা। চন্দ্রবাবু যে উদ্দেশ্যে এই কূটনৈতিক অঙ্ক করলেন তার সঙ্গে সরাসরি মমতা জড়িত না হলেও ক্ষতি নেই। প্রত‍্যেক দলই ভিন্ন ভিন্ন কারণে জোটে আসতে পারে, কিন্তু জোট হলে তার মূল পরিণাম হবে পরিবর্তন। কেন্দ্রের ক্ষমতায়। ফলে সব বিরোধী দলেরই রাজনৈতিক সিদ্ধি।

আরও পড়ুন এসে গেছে অচ্ছে দিন, আম আদমি বুঝে নিন

চন্দ্রবাবু অবশ্য যে অঙ্ক করলেন তার লক্ষ্য হল বিরোধী জোটের হাতে ব্রহ্মাস্ত্র তুলে দেওয়া। এটা তখনই সম্ভব যখন কংগ্রেস ও তার সাধারণ জোটসঙ্গীদের সঙ্গে মায়াবতী ও অখিলেশও শামিল হবেন। এতে শুধু উত্তরপ্রদেশই নয়, দক্ষিণ ভারতও পরিবর্তনের ঝড় তুলবে। কারণ মায়াবতী সংখ‍্যার নিরিখে শুধু উত্তরপ্রদেশে বড়ো শক্তি হলেও ভারতের অন‍্যান‍্য রাজ‍্যে এমনকি দক্ষিণেও অন্তঃসলিলা। দলিত ভোটে ভালো প্রভাব পড়বে কর্নাটকে, অন্ধ্রেও, মায়াবতী জোটসঙ্গী হলে। এমনকি তামিলনাড়ুর স্ট‍্যালিনও পালানিস্বামির পতনের পথ প্রশস্ত করতে পারবেন। এমনই এক সন্ধিকালে সিবিআই হয়ে হয় উঠল ইস‍্যু যখন জোট ও ভোটের ভাগ‍্য স্থির হতে চলেছে চাণক্যনীতিতে। ‘সাম’, ‘দাম’ নিস্ফল হওয়ায় এ বার তোড়জোড় হচ্ছে ‘দণ্ড’ হাতে নিয়ে। বিরোধী দমনে মামলার মহৌষধ নতুন নয়। কেন্দ্রে ও রাজ‍্যে রাজ‍্যে এ নজির বেনজির নয়। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বলতে বলতে এখন বিজেপিও ওদেরই ছেঁড়া জুতোয় পা গলিয়েছে। সূতরাং পুরোনো রোগের দাওয়াইও পুরোনো। আক্রান্ত বিরোধীরা শুধু সাধারণ রাজনীতি দিয়ে এই খুড়োর কলের মোকাবিলা করবে কী করে? একা লড়ে কোণঠাসা তো হতেই হবে, সেই সঙ্গে জেলে গেলে সাজা হলে এক যুগ নির্বাসনে। তাই যে আতঙ্কে জোটের অঙ্ক গুলিয়ে দিচ্ছে শাসকদল, পালটা চালে তাকেই মারণাস্ত্র করার তোড় কৃষ্ণা-কাবেরী থেকে যমুনা-গঙ্গায়।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here