Mamata and Modi
নরেন্দ্র মোদী এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফাইল ছবি
দেবারুণ রায়

দেশের প্রধানমন্ত্রী তিনি। যে তাঁকে ভোট দেয়নি তাঁরও প্রধানমন্ত্রী তিনিই। কখনও বা কোনো মতেই কোনো  একটা পার্টির প্রধানমন্ত্রী নন। আম ভারতবাসী এ কথা ভাবলেও তিনি কী ভাবেন, এই পৌনে পাঁচ বছরে কি তা স্পষ্ট করতে পেরেছেন?

খটকা এ নিয়েই। না হলে তিনি কেবলই মেরুর ভাবনা ভাববেন কেন? মেরুতে যদি ভাগ হয়ে যায় মানুষ, তা হলে ঐক্য, সংহতি, এ সবের কী হবে? জন্মলগ্নেই বিকলাঙ্গ বা অঙ্গহানি হয়েছে যার, সেই দেশমাতৃকার সন্তানকে কি বলে দিতে হবে স্বপ্নভঙ্গের জ্বালা কেমন? ধর্মের মেরুকরণ দিয়েই তো দেশভাগের মুখবন্ধ। বাহাত্তর বছর পরেও ফের সেই ভেদবমির দশায় ঠেলে দেওয়া হবে ‘বহুজন হিতায়’ আর ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’-এর প্রবক্তাদের? আরও এক বার? যার নিশ্চিত পরিণতি আরও একটা বিভাজন!

লালকেল্লায় আজাদ হিন্দের সর্বাধিনায়কের স্মৃতিচারণার আস্ফালনের ফাঁকে এক বারও মন টানে না সুভাষচন্দ্রের ‘কৌমি একতার’ নারা? আন্দামানে আস্ফালনের দ্বিতীয় অঙ্কেও মনে জাগে না আজাদ হিন্দের ‘ইত্তেহাদ, ইত্তেমাদ, কুরবানি’? বার বার “কংগ্রেস যা করেনি, বাহাত্তর বছর পর আমরা করছি” বলে আত্মপ্রসাদের ঢাক পেটানোর আগে কিংবা পরেও বিবেকের কাছে জবাব দিতে হয় না কেন যে, সত্যি সত্যিই এ দেশটাকে ফের ভাঙতে না দেওয়ার জন্যে আমরা কী কী করেছি আর অন্যেরা কী কী করেছে?

আরও পড়ুন বিজেপির বুনো ওল আর কংগ্রেসের বাঘা তেঁতুল: লংকাদহনে প্রিয়ঙ্কা

২০১৪-য় মোদীমোড়কে দেশে হিন্দুত্বের পুরোনো রাজনীতিই ঢাকঢোল পিটিয়ে ‘অচ্ছে দিন’ বলে পেশ করা হল। নির্বাচনে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোটের পুরোনো শরিকদের বেশির ভাগকেই প্রায় প্রায় শূন্যে এনে ‘মোদীত্ব’-কে পূর্ণ করে দিল দেশবাসী। মোদীর সঙ্গে গুজরাত থেকে এলেন শাহ। শোনালেন মোদীমন্ত্র ‘মেরুকরণ’। এক বার নয়। যত বার ভোট এল দেশে, প্রদেশে, পুরসভা, পঞ্চায়েতে, তত বারই। এতে ভোটে সুফল পেল শাসকদল। ফলে সব পেয়েছির নেশায় মেতে আরও এক বার একই মন্ত্র উচ্চারণ।

‘ঘর ঘর মোদী’ দিয়ে শুরু হয়েছিল বারাণসীর যাত্রা। সঙ্গে ছিল শাহের দাওয়াই, কসাইখানা আর শ্মশান-কবরের তুলনা-সহ গুচ্ছ গুচ্ছ জুমলা। আকাশে-বাতাসে এমন স্বপ্নের ছড়াছড়ি আগে কখনও কেউ দেখেনি। পৌনে পাঁচ বছর কেটেছে তার পর ‘সবকা সাথ…..বিকাশ’ ধারায়। এবং অন্তে ফের পাঁচের প্রহসন। দুয়ারে ফের ভোটের কড়া নাড়া। ২২ রাজ‍্যের বিজয়কেতন তো উড়ছেই। অহঙ্কারে মাটিতে আর পা পড়েনি যাঁদের, তাঁরাই এলইডি রথারূঢ় হয়ে আমআদমির মন জানতে মরিয়া।

অথচ এই পৌনে পাঁচে এ সব সাত-পাঁচে থাকেননি। প্রধানমন্ত্রী তাঁর মনের কথা শুনিয়েছেন হপ্তাপিছু এক বার। মন জানার চেষ্টা করেননি। মনোলগে মেতেছেন। ডায়লগে যাননি। মঞ্চের ওপর থেকে বলেছেন। মাটিতে পা রেখে নেমে আসেননি সবার নীচে, সবার পিছে সবহারাদের মাঝে। এত লেখালেখি, এত সমালোচনা সত্ত্বেও একবার ভাবেননি, সাংবাদিক বৈঠক ‌ডেকে বিরোধী অস্ত্র ভোঁতা করে দিলে কেমন হয়, দেখাই যাক।

আরও পড়ুন ভু্লের পর ভুল পদক্ষেপ বিজেপির, অমৃতের ভাগ চান রাহুল

পুরো মাত্রায় আত্মবিশ্বাসী হলে কেন এমন হবে? আসলে মনোলগে মন্দ কথা শুনতে হয় না। ডায়লগ তা নয়। তাতে প্রশ্ন আছে কথার পিঠে। প্রশ্নই তোমার লাগাম। তুমি ইচ্ছেমতো স্টিয়ারিং ঘোরাতে অপারগ। যেমন প্রশ্ন উঠবে তেমনি উত্তর দিতে হবে। তাই ওই পাঠশালামুখো না হয়ে বরং মিডিয়া ম‍্যানেজমেন্টকেই শ্রেষ্ঠ পথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। প্রশ্ন জাগে, শ্রেষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী (অবশ্য এটা তাঁর মনোপলি নয়। এই ট্রেডে অনেক শর্মাই আছেন) হওয়ার সাধ যাঁর, যিনি কোন গুণে এমন তকমা পেতে চান তা দুর্বোধ্য, এবং স্তাবকরা যখন বলে তখন নীরব থাকেন। তাঁর কাছে প্রশ্ন, এতটা অপ্রতিভ হলে শ্রেষ্ঠ তো দূরে থাক, প্রধানমন্ত্রী হওয়া যায়?

আজ পর্যন্ত এমন কোনো প্রধানমন্ত্রী আসেননি যিনি পাঁচ বছরে স্বদেশে কোনো সাংবাদিক বৈঠক করেননি। দেশ এমন প্রধানমন্ত্রী পেল এই প্রথম এবং তিনি ৫৬ ইঞ্চির ছাতিও দেখালেন। রামদেবের ফেভারিট পিএম, ছাতির মাপটা একটা ব‍্যাপার। কিন্তু বুকের পাটা? সেটাই তো মোদ্দা দরকারি। পা থাকবে মাটিতে, আর মাথা ঠেকবে আকাশে। গ্রামের হৃদয় আর নগরের মস্তিষ্ক নিয়েই তো দেশকে নেতৃত্ব দেবেন ভারতাত্মার সুসন্তান। আখড়ার মল্লযোদ্ধা হবেন কেন তিনি? তাঁর আবেদনের সামনে আনত হবে আবালবৃদ্ধবনিতা।

নেহরুর মতো বহুমুখী মানুষে যদি মন না ওঠে তবে ভাবুন লালবাহাদুরকে। বুকের ছাতি নয়, পাটাই যে জরুরি, তার প্রমাণ তাঁর অপূর্ণ দু’ বছরের নেতৃত্ব। তবে এটা কালের গুণ। প্রধানমন্ত্রী একা নন, অনেক বিরোধীও আছেন। আছে অনেক বিরোধী নেতা পরিচালিত সরকারও। তা ছাড়া মেরুকরণের মজাটাই ওখানে। মেরুর দু’টো দিক। দু’ দিকেরই ফায়দা। সাংবিধানিক ভারসাম্য, ঔচিত‍্য, শোভনতাও যেখানে বিসর্জন দিতে বাধা নেই, সেখানে কীসের দুঃখ, কীসের দৈন‍্য, কীসের লজ্জা, কীসের ক্লেশ? এ-পাশে যেমন সিবিআই ও-পাশে তেমন সিআইডি। কেন্দ্রের পুলিশের পালটা রাজ‍্যের পুলিশ।

আজ পর্যন্ত এমন কোনো প্রধানমন্ত্রী আসেননি যিনি পাঁচ বছরে স্বদেশে কোনো সাংবাদিক বৈঠক করেননি। দেশ এমন প্রধানমন্ত্রী পেল এই প্রথম এবং তিনি ৫৬ ইঞ্চির ছাতিও দেখালেন। রামদেবের ফেভারিট পিএম, ছাতির মাপটা একটা ব‍্যাপার। কিন্তু বুকের পাটা?

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তদন্ত পৌনে পাঁচ বছর ধরে ঢিমেতেতালা করার পর হঠাৎ অন্তিমকালে হরিনাম কীসের? কট্টর মোদীবিরোধী কংগ্রেস নেতা সোমেন মিত্র, অধীর চৌধুরী বা অরুণাভ ঘোষেরা বলছেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঘটনা, সিবিআইয়ের অপব্যবহার নিয়ে অভিযোগ অন্যত্র আছে বই-কি। কিন্তু সারদা তদন্তের সঙ্গে সে সবের সম্পর্ক নেই। বরং সিবিআইকে গত সাড়ে চার বা পৌনে পাঁচ বছরে এ নিয়ে কিছু করতে দেওয়া হয়নি কেন সেটাই প্রশ্ন। তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে তো সুপ্রিম কোর্ট। কংগ্রেসের আবেদনের ভিত্তিতে। সেই সঙ্গে সিপিএম নেতাও আইনজীবী হিসেবে আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

পশ্চিমবঙ্গের সারদা-মামলা নিয়ে রাজ‍্য প্রশাসন ও পুলিশের বিরুদ্ধে মোদীই স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ করছেন, এই বার্তাটি কেন্দ্রের শাসকদলের পক্ষে যথেষ্ট উপযোগী। এতে কেন্দ্রে ও রাজ‍্যে চাঙ্গা হবে হতাশাহত বিজেপি। দেখাতে পারবে, এই দেখো আমাদের ৫৬ ইঞ্চি ‘হয়কে নয়’ করতে পারেন। যিনি যত বড়ো নেতাই হন না কেন, তাঁর কাছে কোনো ক্ষমা নেই অন‍্যায়ের। কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে বিজেপি বা নরেন্দ্র মোদী এই ক‍্যারিশমা দেখাতে চান না। বরং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাঁর আইনমন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ প্রমাণ দিতে চান যে মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেই আদালত সিবিআইকে সারদা ইত্যাদি চিটফান্ড কেলেঙ্কারির তদন্তভার দিয়েছে। মোদী জিতে এসেছেন ২০১৪ সালের ১৪ মে। শপথ নিয়েছেন ২৬ মে। অথচ সুপ্রিম কোর্ট বাংলার পুলিশের কাছ থেকে সিবিআইয়ের হাতে সারদা মামলার তদন্তভার তুলে দিয়েছে ৯ মে। এ দিকে ২০১৩ সালে রাজীব কুমারের অধীনে এসআইটি হয়। কংগ্রেস ও বামেদের কয়েকজন সুপ্রিম কোর্টে যান।

মাত্র পাঁচ বছরের পুরোনো এই ইতিহাস তুলে ধরে আসন্ন ভোটের হাতছানি স্মরণে রেখে মোদীর মন্ত্রী প্রসাদ বারবার বোঝাতে চান, “বাকিরা তদন্তের কাজ না এগোলেও মোদী সরকার ছেড়ে দেবে না।” বাকিরা বলতে কারা? এখানে তাঁরা ছাড়া বাকি আর কে? বাকি মানেই তো ফাঁকি। ২০১৪-র ৯ মে সিবিআই তদন্তভার পেল কোর্টের কাছ থেকে। ১৪ মে জিতলেন মোদী। সুতরাং, কাকে দোষী করতে চান রবিশঙ্কর?

আরও পড়ুন মোদীর বিকল্প খুঁজতে কর্পোরেটের হাত, সংঘের জলমাপা শুরু গড়কড়ি ঘুঁটিতে

আসলে স্বীকার করতে চান না, কংগ্রেস-মুক্ত ভারত গড়ার মূল লক্ষ‍্য মাথায় রেখে সমস্ত আঞ্চলিক দলকে ‘পোটেনশিয়াল অ্যালাই’ অর্থাৎ এক কথায় শিকার ভেবে সন্তর্পণে তাদের দিকে জলপাই শাখার অর্ঘ্য নিয়ে হাত বাড়াচ্ছিল বিজেপি। শ‍্যাম না কূল – কাকে রাখবে তা ঠাহর করতে পারেনি সাউথ ব্লকের গোলকধাঁধায়। দুর্নীতিরই রূপান্তর নীতিতে। রামনামে পাপনাশ। তাই এক হাতে জুজু আর অন্য হাতে সন্ধি। সন্ধি করলে কালের গর্ভে তলিয়ে যাবে ফাইল। না হলে ভুবনেশ্বর কিংবা রাঁচি। এটা কোনো নতুন খেলা নয়। বিজেপি এ খেলার স্রষ্টাও নয়।

শাসকের হাতে ব্রহ্মাস্ত্র রাখার চল সত্তরের দশকে। এমনকি যুক্তফ্রন্টের প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়াও এই ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করেছেন এবং শিকার হয়েছেন লালুপ্রসাদ। সিবিআইয়ের তৎকালীন অধিকর্তা যোগীন্দর সিং কর্নাটক ক‍্যাডারের অফিসার। দেবগৌড়ার ঘনিষ্ঠ। ছুটির দিনে মধ্য রাতে দফতর খুলে হাজির হয়েছিলেন যোগীন্দর। সক্রিয় ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তার পর যুগ্ম অধিকর্তা উপেন বিশ্বাস পটনায় মুখ‍্যমন্ত্রী লালুকে গ্রেফতার করলেন। সেনা নামল বিহারের রাজধানীতে তেমন প্ররোচনা ছাড়াই। লালুকে ভিলেন বানিয়ে কবিতা লিখলেন উপেনবাবু। বাংলার কাগজে কাগজে ছাপা হল। বাঙালির হিরো উপেনকে নিয়ে তখন গদগদ বামফ্রন্ট। একটা নির্বাচনে লালু একা। সবাই তাঁর বিরুদ্ধে। এমনকি সিপিএমও।

পরে সেই ক্ষণস্থায়ী লাইন শুধরে নিল সিপিএম। যদিও লালুবিরোধী জমায়েত সেরে রাতের ট্রেনে ফেরার পথে ফরওয়ার্ড ব্লকের সর্বত‍্যাগী নেতা চিত্ত বসুর মৃত্যু ভ্রান্ত পথের প্রতীক হয়ে রইল। সিপিএম লালুর পাশে ফিরল। এবং কবি ও পুলিশকর্তা উপেন গেলেন নতুন দল তৃণমূলে। একই দলে শামিল হলেন যোগীন্দর সিং। নয়ের দশকের শেষের সে দিন পেরোতে না পেরোতেই মেরুকরণ প্রখর হতে শুরু করল। রাজনীতিবিদদের মধ্যে যাঁদের অন্ন-জল-বায়ু-বিনোদন শুধুই রাজনীতি, তাঁরা ভোটের সূত্রে উচ্চাশার অমিল অঙ্ক মেলাতে চান। মেরুকরণের উৎসেও সেই ভোট। মেরু যদি নিছক রাজনীতি হয় তা হলে সমস্যা নেই। কিন্তু সম্প্রদায়ের মেরু দেশের মেরুদণ্ড বিরোধী। সংবিধানের পক্ষে সর্বনাশা। মন্দিরের পক্ষে যারা রাজনীতি করে তারাই মসজিদের রাজনীতিকে তোল্লা দেয়। ফলে নীতিহীন মেরুকরণে দু’ পক্ষেরই লাভ। এই বন্দোবস্ত আইনের শাসন, দুর্নীতি দমন, সমাজের প্রগতি, উন্নয়নের ধার ধারে না।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here