pranab mukherjee in rss headquarters in nagpur
দেবারুণ রায়

ইন্দিরার নেতৃত্বে ভারতের রণনীতি সফল হয়েছিল ’৭১-এ স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, সংঘ পরিবার প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসাই করেছিল। অটলবিহারী বাজপেয়ী ইন্দিরাকে বলেছিলেন ‘দুর্গা। তার ন’ বছরের মাথায় বিজেপির জন্মলগ্নে ইন্দিরার প্রত্যাবর্তনের ইতিহাসেও আজ আর কোনো ধোঁয়াশা নেই। ঐতিহাসিক ইন্দ্রপতন হয়েছিল গ্বালিয়রে। গ্বালিয়রের মহারাজের কাছেই হেরেছিলেন বাজপেয়ী। লোকসভায় সমস্ত স্টলওয়ার্টকে বাদ দিয়ে মাত্র দু’ জন জিতেছিলেন বিজেপির। তার এক দশক পর ’৯১-তে নরসিংহ রাও প্রধানমন্ত্রী আর মনমোহন অর্থমন্ত্রী হিসেবে অর্থনৈতিক সংস্কার ও উদার নীতির আবাহন করলেন। মনমোহনের প্রথম বাজেটে অকুণ্ঠ সমর্থন দিল বিজেপি। তখন লোকসভার বিরোধী দলনেতা লালকৃষ্ণ আডবাণী আর দলের সব চেয়ে জনপ্রিয় নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ী যৌথ ভাবে স্বাগত জানালেন মনমোহনের বাজেটের সংস্করণীতে। তার পরই দ্রুত সরকারে প্রণবকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় নিয়ে এলেন নরসিংহ রাও। প্রথমে যোজনা কমিশনেরর ডেপুটি চেয়ারম্যান ও তার পর বাণিজ্যমন্ত্রী। কংগ্রেসের মূল সুর থেকে সরে আসতে থাকলেন রাও। নেহরুবাদী মিশ্র অর্থনীতি থেকে বেসরকারিকরণে জোর, জাতীয়করণের বিপরীতমুখী মোড় এবং বিদায়নীতি পর্যন্ত এগিয়ে গেলেন।

মারমুখী বামেদের বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে তখনও বিজেপি কিন্তু রাও সরকারের প্রতি বরাভয় মুদ্রায়। ‘বিদায়নীতির’ মতো বিষয় নিয়ে সারা দেশে শ্রমিক অসন্তোষ তীব্র হল। সংঘের শাখা-প্রশাখাতেও লাগল তার আঁচ। স্বদেশি জাগরণ মঞ্চের মতো সংঘ অনুমোদিত সংস্থা প্রায় বামেদের সুরেই শ্রমিক স্বার্থের দাবিতে উচ্চকিত হল। তবু আইএনটিইউসি-কে মানিয়ে নিয়ে কংগ্রেস সংস্কারে অবিচল থেকেছে। এবং বিএমএস কখনও বেসুরো গাইলেও শেষ পর্যন্ত বিজেপি তাকে বাগে এনেছে। এল বিতর্কিত ডাংকেল ড্রাফট এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তাবৎ শর্তের প্রসঙ্গ। ড. মুরলীমনোহর জোশি অনেকটাই র‍্যাডিকাল মনোভাব নিলেও বিজেপির সামগ্রিক নীতিতে তার ছায়া পড়ল না। বাণিজ্যমন্ত্রী প্রণববাবুকে তাঁর ডাংকেল খসড়ার সুবাদে বিরোধীরা তখন আংকেল নাম দিলেও তিনি সংসদে সিদ্ধিলাভ করলেন মূল বিরোধী দল বিজেপির নৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থনে। পরে এনডিএ সরকারের সময় একই ভাবে উদারনীতি ও অর্থনৈতিক সংস্কারের রথ অবাধে চালিয়ে যাওয়ার স্বার্থে বিরোধী নেতা প্রণব ও মনমোহনের নেতৃত্বে কংগ্রেস সরকারি প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। সেকুলার শিবিরের ফাটলের চেয়ে সংস্কারের একের পর এক স্তরকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যই ছিল কংগ্রেসের মূল চিন্তার বিষয়।narasimha rao and vajpayeeইতিহাসের এই অনতিদূরের পর্বগুলি স্মরণ করিয়ে দেওয়ার কারণ একটাই। তা হল, কট্টর রাজনৈতিক বিরোধিতা সত্ত্বেও কংগ্রেস নেতারা কখনোই সে অর্থে অচ্ছুৎ করেননি আরএসএস-কে। দু’ দু’ বার কংগ্রেস সরকারই এই সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও জাতীয় জীবনের বিভিন্ন মোড়ে তাদের শামিল করেছে। নেহরু জমানা থেকেই তার শুরু। এ ক্ষেত্রে ভারত-চিন যুদ্ধের পর ’৬৩ সাল উল্লেখযোগ্য। তার পর প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর জমানায় ’৬৫-এর ভারত-পাক যুদ্ধ। ইন্দিরা জমানায় ’৭১-এর ভারত-পাক যুদ্ধ ও বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম। এবং ’৮০-তে ইন্দিরার প্রত্যাবর্তন পর্ব, ওই দশকেরই শেষে অযোধ্যার শিলান্যাস ও মন্দিরের তালা খোলা এবং সব শেষে অর্থনৈতিক সংস্কারের পর্ব। যে হেতু সনিয়া প্রধানমন্ত্রী হননি, তাই সরকারের তরফে সমন্বয়ের কাজটি করেছেন মনমোহন ও প্রণব। অবশ্য বাজপেয়ী জমানায় বিরোধী নেত্রী হিসেবে সনিয়াই ছিলেন সমন্বয়ের কেন্দ্রে। যার উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত এপিজে আবদুল কালামকে রাষ্ট্রপতি করতে বিজেপি-কংগ্রেসের যৌথ উদ্যোগ। ভাওরাও দেওরস বা রজ্জু ভাইয়ার মতো প্রথম সারির সংঘ নেতারা ছাড়া সমন্বয়ের জমি প্রস্তুত করেছেন এমন অনেকেই নেপথ্যে থেকে গিয়েছেন। ’৮০-র পর থেকে ইউপিএ–১ জমানার একটি ব্যতিক্রম ছাড়া আর আগাগোড়া সবটা সময়ই হিন্দি হার্টল্যান্ডে জমি হারিয়েছে কংগ্রেস। ইতিহাস অপ্রিয় সত্যের কথা তুলে ধরলেও কংগ্রেসিরা কিন্তু নেতাদের ঘাড়ে দায় চাপাননি।

কালাম যখন রাষ্ট্রপতি তখনই সনিয়াকে প্রধানমন্ত্রী করার উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। ওই সময়েই গুজরাতের রঙ্গমঞ্চে এসেছে বিতর্কিত পর্ব। যা নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী সরব হলেও রাষ্ট্রপতি কালাম নীরব ছিলেন। তা সত্ত্বেও বিজেপি প্রস্তাবিত এবং কংগ্রেস সমর্থিত রাষ্ট্রপতি কালামকে নিয়ে কখনও মুখ খোলেননি কংগ্রেস নেতারা। তা হলে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকা প্রাক্তন রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে প্রশ্ন তোলার নৈতিক অধিকার থাকে কী করে?manmohan singh, apj abdul kalamতা ছাড়া সংঘ কি এই ২০১৮-য় শুধু নাগপুরের সদর দফতরের চৌহদ্দিতেই সীমাবদ্ধ? রাষ্ট্রপতি ভবন, সাউথ ব্লক, নর্থ ব্লক থেকে শুরু করে ২২টি রাজ্যের সর্বত্র এবং সমস্ত রাজ্যের রাজভবনগুলিতে কি সংঘের স্বয়ংসেবক কিংবা আস্থাভাজনরা বিরাজমান নন? যেমন কলকাতা রাজভবনে সংঘের স্বয়ংস্ববক কেশরীনাথ। বাংলার রাজ্যপাল কি বিধানসভায় দাঁড়িয়ে ‘মাই গভর্নমেন্ট’ বলে সরকারি কর্মসূচির ফিরিস্তি দেন না? সর্বোপরি তিরিশ বছর পর লোকসভায় প্রথম নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা এল যাঁর নেতৃত্বে সেই সংঘ-প্রচারক ও স্বয়ংসেবক নরেন্দ্র মোদীর সরকারের মাথায়ই তো ছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। ভারতীয় সংসদীয় গণতন্ত্রের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে মিশে যাওয়া রথী-মহারথীরাই সংঘের শাখা-প্রশাখা। যাঁরা বছরে এক বার গুরুদক্ষিণা দেন সংঘ দফতরে গিয়ে। এঁদেরই ‘দ্বৈত সদস্যপদ’ নিয়ে ১৯৭৮-৭৯-তে আপত্তি ওঠায় জনতা পার্টি ভেঙে গিয়েছিল। সংঘের সদস্যপদ না ছেড়ে প্রাক্তন জনসংঘীরা পার্টি ছেড়েছিলেন। গড়েছিলেন বিজেপি। তাই নাগপুর যখন শুধু নাগপুরেই সীমাবদ্ধ নেই তখন পরিবারতন্ত্রের গণ্ডি ছেড়ে বেরিয়ে ছুঁৎমার্গী রাজনৈতিক বামুনদের চাণক্যের শরণ নিতে হবে বই-কি!

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here