vajpayee and modi
বাজপেয়ী ও মোদী। ছবি সৌজন্যে মাই ভয়েস অন ওপইন্ডিয়া।
দেবারুণ রায়

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘকে ভারতের রাজনীতিতে যে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন অটলবিহারী বাজপেয়ী তার তুলনা নেই। শ্যামাপ্রসাদ বা দীনদয়ালের কাছে বিজেপি যতটা ঋণী তার চেয়ে অনেক বেশি ঋণ অটলের কাছে। সংঘের স্বপ্ন ও লক্ষ‍্যপূরণ সম্ভব হয়েছে বাজপেয়ীর জন্য। সংঘের স্বপ্ন ছিল ভারতীয় রাষ্ট্রব‍্যবস্থার শীর্ষে যে সব পদ আছে সে সব পদে স্বয়ংসেবক ও একই মতাদর্শের মানুষদের বসানো। সে কাজ শুরু হয়েছিল অটলকে দিয়ে। বিজেপির একক সরকার না হলেও সংঘের স্বয়ংসেবক বাজপেয়ী ছ’বছর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সাউথ ব্লকের শ্রেষ্ঠ আসন অলংকৃত করেছেন। ১৩ দিন বাদ দিয়ে বাকিটা সময় দেশের ভেতর নতুন ধরনের রাজনৈতিক মেরু তৈরি করেছেন। বাজপেয়ী ছাড়া যা সম্ভব ছিল না অন্য কোনো গেরুয়া নেতার পক্ষে। তাঁকে সামনে রেখেই সংঘ বিপরীত মেরুর শিবিরে থাবা বসাতে পেরেছে‌। বাংলা, ওডিশা, অসম, বিহার থেকে শুরু করে অন্ধ্র, তামিলনাড়ুর মতো ঊষর মাটিকেও হিন্দুত্বের জন্য উর্বর করে তূলেছে বিজেপি হয় সরাসরি অটলকে‌ সামনে রেখে, না হয় অটলজির লাইন মেনে। যেমন পরিস্থিতির বাধ্যতা বাংলায় মমতাকে বিজেপির কাছে টেনে আনলেও কেন্দ্রে বিজেপির নেতৃত্বে পর পর সরকার চালানো এবং রাজ‍্যে বিজেপির সঙ্গে জোটে যাওয়া হয়তো অকল্পনীয় হত যদি নেতা অটল না থাকতেন। ফলে কেন্দ্রে রেলমন্ত্রীর পদ যেমন রাজ্যে প্রভাব বিস্তার করতে বিরাট সাহায্য করেছে মমতাকে, তেমনি রাজ‍্যের দু’টি কঠিন সিট থেকে জিতে অটল সরকারের মন্ত্রী হওয়ার ফায়দা পেয়েছেন রাজ‍্যের দুই বিজেপি নেতা। মমতার বা তৃণমূলের সমর্থন ছাড়া যে তপন শিকদার বা জুলু মুখার্জি কখনও লোকসভায় নির্বাচিত হতেন না তা আগেই প্রমাণিত। তা ছাড়া রাজ‍্য রাজনীতিতে কংগ্রেস ভেঙে আসা তৃণমূলের প্রতিষ্ঠা এবং চিরশত্রু বাম ও কংগ্রেসের কার্যত বিলোপ বিজেপির কম লাভ নয়। অটলকে‌ সামনে রেখেই রাজ‍্যে রাজ‍্যে বিশেষত দুর্বল এলাকায় আঞ্চলিক দলগুলোকে দলে টানে সংঘ ও বিজেপি। না হলে বাংলার মমতার মতোই বিহারের নীতীশ, উত্তরপ্রদেশে মায়াবতী, ওডিশায় নবীন, অন্ধ্রে চন্দ্রবাবু, তামিলনাড়ুতে বিবদমান করুণানিধি, জয়ললিতা, ভাইকো পিএমকে, পঞ্জাবে বাদল এমনকি কাশ্মীরে ফারূকও অধরাই থেকে যেত।

আরও পড়ুন এক দিন অটল, তো আর এক দিন বিহারী, এই ভাবমূর্তিই ছিল তাঁর বৈশিষ্ট্য

বাজপেয়ীর ক‍্যারিশমাতেই সংঘের জালে পড়ছিলেন অসাম্প্রদায়িক নেতারা। রাষ্ট্রপতির পদে কালামকে পেয়ে কংগ্রেসকে সমর্থনে বাধ্য করা ও বামেদের কোণঠাসা করার লক্ষ্যেও সংঘ সফল হয়েছিল শুধুমাত্র অটলের গুণে  তিনিই সংঘের ভিত। তাঁর রণনীতিই আজও সাফল্য দিচ্ছে বিজেপিকে। এই নীতিতে ভর করেই নীতীশকে ফেরানো, নবীন-ঘনিষ্ঠতা, মেহবুবার সরকার গড়া এবং অসম, ত্রিপুরায় পরিবর্তনের  দামামা বাজানো। সংঘের একনিষ্ঠ প্রচারকের প্রথম জীবন থেকে এই আশ্রমের প্রতি গভীর আনুগত্য প্রমাণ করেছেন অটল বারবার। ক্ষীণকণ্ঠে কখনও কোনো ভিন্নমত ব‍্যক্ত করলেও সিদ্ধান্ত হয়ে গেলে দলের অনুগত সৈনিক। রামমন্দির, গুজরাত-দাঙ্গা থেকে শুরু করে পাকিস্তানের যুদ্ধ, সব কিছুতেই দল ও সংঘের  ম‍্যানডেটই মেনেছেন শেষ পর্যন্ত। আর তাঁকে দিয়ে সব চেয়ে বেশি লক্ষ্যপূরণ হবে বুঝে নানা বিষয়েই তাঁকে ছাড় দিয়েছে সংঘ।

আরও পড়ুন অটলবিহারী বাজপেয়ী – ফিরে দেখা

সংঘেরই গোবিন্দজি এই কারণেই বলেছিলেন, উনি মুখোশ। আডবাণীর হাতে মূল ক্ষমতা তো ছিলই। অটল যখন প্রধানমন্ত্রী তখনও দলের সর্বময় কর্তা আডবাণী। অটল এটা মেনে নিয়েই চলতেন। ১৫ আগস্ট তাঁর লালকেল্লার ভাষণও চূড়ান্ত করতেন আডবাণী। সুধীন্দ্র কুলকার্নি ভাষণের বিষয়বস্তু লিখে দিয়ে আসতেন আডবাণীর সচিব দীপক চোপড়ার হাতে। আডবাণীর অনুমোদন হলে তা ফেরত যেত পিএমওতে। সংঘের ইচ্ছে ছিল, অটল কিছু দিন সরকার চালানোর পর তাঁকে রাষ্ট্রপতি করা হবে। প্রধানমন্ত্রী হবেন আডবাণী‌। কারণ বিজেপি ও সংঘ জানত, আডবাণী এলেও শরিকরা সরকার ছাড়বে না। যদিও এই খেলার আঁচ পেয়ে অটল পালটা চাল চেলেছিলেন‌। এক বার তিনি বিদেশ থেকে ফেরার পর তাঁর বাড়িতে দল ও সংঘের নেতারা হাজির হন। সংবর্ধনার মাধ্যমে বিদায়ের আভাস পেয়ে বক্তৃতাশেষে বাজপেয়ী ঘোষণা করলেন, টায়ার নহি, রিটায়ার নহি, আডবাণীজিকে নেতৃত্ব মে চুনাও কি ঔর প্রস্থান।” বলে দিলেন, অবসর নেওয়াতে চাইলে ভোটে যাব। তবে সংঘের নেতৃত্বকে চ‍্যালেঞ্জ নয়। আডবাণীর নেতৃত্বেই ভোটে যাব। এর পর সংঘ আর এগোয়নি। কিন্তু আজীবন ভোটে তাঁর মুখোশ যে ভাবে ব‍্যবহার করেছে বিজেপি, মৃত্যুর পরেও তা কাজে লাগানোর রণনীতি ছকে ফেলেছেন মোদীর নির্দেশে অমিত শাহ। যার শুরু শুক্রবারই শোকযাত্রায় মোদীর পা মেলানোয়। কিন্তু সমস্যা হল, মোদীর গুজরাত-ঘেরা রাজনীতি দিল্লিতে তাঁকে বিচ্ছিন্ন করেছে দলেই‌। আডবাণীও মেরুর অপর দিকে। অটলের উত্তরসূরি হিসেবে কে তুলে ধরবে তাঁকে? অটল বেঁচে থাকলেও প্রচারে বিবৃতি দেওয়াও হত না। তবু নাছোড় মোদী অটলজির অচেনা শাহকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটবেন আরও। আডবাণীর আদলে নিজের কঠিন মুখে অটলের নরম মুখোশ পরবেন। এবং গো-সন্ত্রাস থেকে কাশ্মীরের ঘটনায় মুখোশ খুলে গেলে কাকে দিয়ে আড়াল করবেন? নতুন এনডিএ কি আর পুরোনো বন্ধুদের পাবে?  নীতীশ, নবীন, মেহবুবা, কেসিআরের পর আর কোনো চেনা মুখ ভাবছেন?  অটলজি বেঁচে থাকলে এবং সক্রিয় থাকলে কি তাঁকে সামনে রেখে ফেরানো যেত আগের এনডিএ? সে সময়ও তো আপনার গুরু আডবাণী ছিলেন দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। আপনি ছিলেন গুজরাতে। দাঙ্গার পরেও তো চিড় ধরেনি মোর্চায়। জীবিতের চেয়ে প্রয়াত অটল আরও উপযোগী। তা হলে মুখোশ তো এখনও শক্তিশালী।

 

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন